ওস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁ । আগ্রা ঘরানা । শিল্পী জীবনী

উস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁ ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অনন্য কণ্ঠশিল্পী এবং আগ্রা–আত্রৌলি ঘরানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। তাঁকে প্রায়ই “আগ্রা ঘরানার শেষ মহান কণ্ঠশিল্পী” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। গভীর nom-tom আলাপ, শক্তিশালী লয়জ্ঞান, দৃঢ় স্বরপ্রক্ষেপণ এবং দুর্লভ রাগ পরিবেশনের দক্ষতায় তিনি ভারতীয় খেয়াল গায়কির ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন।

ওস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁ

 

ওস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁ

 

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

শরাফত হুসেন খাঁর জন্ম ১ জুলাই ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে, ভারতের উত্তর প্রদেশের আত্রৌলি নামক এক ছোট শহরে। এই আত্রৌলি শহরই পরবর্তীতে আত্রৌলি ঘরানার জন্মস্থান হিসেবে সঙ্গীত ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।

  • পিতা: লিয়াকত হুসেন খাঁ
    তিনি ছিলেন জয়পুর রাজদরবারের একজন প্রখ্যাত দরবারি সঙ্গীতজ্ঞ।

  • মাতা: আল্লা রাখি বেগম

  • মাতামহ: মেহবুব খাঁ (দরস পিয়া)
    তিনিও আত্রৌলি ঘরানার একজন বিশিষ্ট শিল্পী ছিলেন।

শরাফত হুসেন খাঁর পৈতৃক বংশধারা সরাসরি গিয়ে মেলে আত্রৌলি ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা উস্তাদ ইনায়েত হুসেন খাঁ (১৮৪৫–১৯৩৬)-এর সঙ্গে। অন্যদিকে, মাতৃকুলের মাধ্যমে তিনি যুক্ত ছিলেন রাঙ্গিলে ঘরানার সঙ্গে, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রমজান খাঁ (১৭৫৯–১৮০৬)। এই দ্বৈত বংশধারা তাঁর সঙ্গীতচিন্তাকে বহুমাত্রিক ও গভীর করে তোলে।

ওস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁ

শৈশব ও সঙ্গীতের প্রতি প্রবণতা

শরাফত হুসেন খাঁর সঙ্গীত শিক্ষা শুরু হয় খুব অল্প বয়সেই। তাঁর পিতা লিয়াকত হুসেন খাঁ শিশুকাল থেকেই তাঁকে কঠোরভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম দিতে শুরু করেন। খুব দ্রুতই তাঁর কণ্ঠে স্বরশুদ্ধতা, রাগধারণ ক্ষমতা ও লয়ের প্রতি স্বাভাবিক দক্ষতা লক্ষ্য করা যায়।

মাত্র ৮ বছর বয়সে তাঁর অসাধারণ প্রতিভা দৃষ্টি আকর্ষণ করে আগ্রা ঘরানার কিংবদন্তি শিল্পী উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ (১৮৮০–১৯৫০)-এর। ফৈয়াজ খাঁ ছিলেন শরাফত হুসেন খাঁর মামা এবং আগ্রা ঘরানার তৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী। তাঁর কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় তিনি শরাফতকে নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে গ্রহণ করেন।

ফৈয়াজ খাঁ শরাফত হুসেন খাঁকে দত্তক নেন এবং তাঁকে নিয়ে যান বরোদা (বর্তমান ভাদোদরা) শহরে। এখানেই শুরু হয় শরাফত হুসেন খাঁর প্রকৃত গুরু-শিষ্য পরম্পরাভিত্তিক কঠোর তালিম।

ওস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁ

ফৈয়াজ খাঁর তত্ত্বাবধানে তালিম

বরোদায় উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর সরাসরি তত্ত্বাবধানে শরাফত হুসেন খাঁ আগ্রা ঘরানার গভীর ও বিশুদ্ধ রীতিতে প্রশিক্ষিত হন। কিশোর বয়সেই তিনি গুরু সঙ্গে মঞ্চে ওঠার সুযোগ পান।

প্রায় ১৩ বছর বয়সে, ফৈয়াজ খাঁ তাঁকে নিজের পরে মঞ্চে গান পরিবেশন করার সুযোগ দেন—যেখানে শরাফত গুরু যেখানে থামতেন, সেখান থেকেই গান এগিয়ে নিতেন। শ্রোতা ও সঙ্গীতবোদ্ধারা বিস্মিত হন তাঁর পরিণত কণ্ঠ ও দৃঢ় রাগপ্রয়োগ দেখে।

এই সময়ে তিনি বহু অনুষ্ঠানে ফৈয়াজ খাঁর সঙ্গে তানপুরা সহযোগী হিসেবেও অংশ নেন, যা তাঁকে মঞ্চশৃঙ্খলা ও গুরুসঙ্গীতের সূক্ষ্মতা গভীরভাবে অনুধাবন করতে সাহায্য করে।

অনেক সমালোচকের মতে, এই সময়েই স্পষ্ট হয়ে যায়—শরাফত হুসেন খাঁ ভবিষ্যতে আগ্রা ঘরানার অন্যতম প্রধান বাহক হবেন, যদিও জীবদ্দশায় তিনি তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি পুরোপুরি পাননি।

ওস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁ

ফৈয়াজ খাঁর মৃত্যুর পর তালিম ও উত্তরাধিকার

উস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁর জীবনে এক গভীর মোড় আসে ১৯৫০ সালে, যখন তাঁর গুরু ও দত্তক পিতা উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ পরলোকগমন করেন। তখন শরাফত হুসেন খাঁর বয়স মাত্র ২০ বছর। এত অল্প বয়সে গুরু হারালেও তাঁর সংগীতচর্চা থেমে থাকেনি; বরং আগ্রা ঘরানার উত্তরাধিকার বহনের দায়িত্ব আরও গভীরভাবে তাঁর উপর বর্তায়।

ফৈয়াজ খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সঙ্গীত শিক্ষা ও অভিভাবকত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাঁর আরেক মামা, উস্তাদ আতা হুসেন খাঁ। আতা হুসেন খাঁ ছিলেন আগ্রা ঘরানার একজন বিশুদ্ধ ধারার প্রতিনিধি এবং তিনি শরাফতকে আগ্রা ঘরানার কঠোর গায়কি, লয়কেন্দ্রিকতা ও বলিষ্ঠ স্বরপ্রক্ষেপণের উপর আরও সুসংহত প্রশিক্ষণ দেন।

পরবর্তীকালে শরাফত হুসেন খাঁর বিবাহ হয় আগ্রা ঘরানার আরেক মহান শিল্পী উস্তাদ বিলায়েত হুসেন খাঁর কন্যার সঙ্গে। এই সূত্রে বিলায়েত হুসেন খাঁ তাঁর শ্বশুর ও গুরু হন এবং জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে শরাফত হুসেন খাঁর সংগীতশিক্ষা ও শিল্পীসত্তা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তিন ঘরানার সম্মিলিত ফসল

শরাফত হুসেন খাঁ ছিলেন বিরল এক শিল্পী, যিনি প্রকৃত অর্থে তিনটি ঘরানার সম্মিলিত ঐতিহ্যের ফসল

  1. আগ্রা ঘরানা
    – শক্তিশালী nom-tom আলাপ
    – বোল-আলাপ ও বোল-তানের ব্যবহার
    – দৃঢ় লয়বোধ ও তানকারির জোর

  2. আত্রৌলি ঘরানা
    – জটিল ও বিরল রাগ পরিবেশনের ক্ষমতা
    – রাগের কাঠামোয় গভীরতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক নির্মাণ
    – রাগ যেমন: জয়জয়বন্তী, মালতী বসন্ত, রামকালি ইত্যাদি

  3. রাঙ্গিলে ঘরানা (মাতৃকুলের প্রভাব)
    – স্বরবিন্যাসে সূক্ষ্ম আবেগ
    – লয়ের সঙ্গে গায়কির স্বাভাবিক প্রবাহ
    – মাধুর্য ও শক্তির ভারসাম্য

এই তিন ধারার সম্মিলনে শরাফত হুসেন খাঁর গায়কিতে এক অনন্য ভারসাম্য সৃষ্টি হয়—যেখানে ছিল শক্তি, গভীরতা ও শাস্ত্রীয় শুদ্ধতা।

গায়কির বৈশিষ্ট্য

শরাফত হুসেন খাঁর গায়কি ছিল অত্যন্ত গম্ভীর, প্রভাবশালী ও শাস্ত্রনিষ্ঠ। তাঁর গায়কির কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য—

  • দীর্ঘ ও রাজসিক nom-tom আলাপ
  • দৃঢ় ও পরিমিত লয় প্রয়োগ
  • জটিল তানকারি, কিন্তু কখনোই প্রদর্শনমূলক নয়
  • রাগের স্বরূপ অটুট রেখে বিস্তার করার ক্ষমতা
  • খেয়াল গায়কিতে শক্ত কাঠামো ও নাটকীয় আবহ

তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন খেয়াল ধারায়, তবে পাশাপাশি ঠুমরি ও কিছু হালকা শাস্ত্রীয় ধারাতেও তাঁর দখল ছিল।

বিরল রাগে দক্ষতা

আত্রৌলি ঘরানার ঐতিহ্য অনুযায়ী শরাফত হুসেন খাঁ বহু দুর্লভ ও জটিল রাগ পরিবেশন করতেন, যেগুলো সাধারণ শিল্পীদের জন্য সহজ নয়। এই রাগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • রাগ জয়জয়বন্তী
  • রাগ মালতী বসন্ত
  • রাগ রামকালি
  • রাগ দরবারি কানাড়া
  • রাগ তোড়ি ও ভৈরব আঙ্গিক

এই রাগগুলিতে তাঁর পরিবেশন ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগের অপূর্ব সমন্বয়।

মঞ্চজীবন ও সংগীত পরিবেশনা

উস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁর মঞ্চজীবন ছিল সংযত কিন্তু গভীর প্রভাববিস্তারকারী। তিনি কখনোই অতিরিক্ত প্রচার বা জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটেননি। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, শাস্ত্রীয় সংগীতের গাম্ভীর্য ও শুদ্ধতাই শিল্পীর প্রকৃত পরিচয়। তাঁর পরিবেশনায় সবসময় লক্ষ্য করা যেত এক ধরনের রাজসিক স্থিরতা ও আত্মমগ্নতা।

মঞ্চে উঠে তিনি ধীরে ধীরে রাগের পরিসর নির্মাণ করতেন। তাঁর দীর্ঘ আলাপ ও nom-tom অংশ শ্রোতাকে ধৈর্য ধরে শোনার আহ্বান জানাত। দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য হালকা বা প্রদর্শনমূলক তানের আশ্রয় তিনি সচেতনভাবে এড়িয়ে চলতেন। ফলে তাঁর শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন মূলত রসিক, পণ্ডিত ও শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীর অনুরাগীরা।

ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংগীত সম্মেলন ও দরবারে তিনি পরিবেশন করেছেন। তাঁর কণ্ঠে আগ্রা–আত্রৌলি ঘরানার রাগ উপস্থাপনা শ্রোতাদের কাছে ছিল এক বিরল অভিজ্ঞতা।

অল ইন্ডিয়া রেডিও ও দূরদর্শনে ভূমিকা

শরাফত হুসেন খাঁ ছিলেন অল ইন্ডিয়া রেডিও (AIR)-এর একজন টপ-গ্রেডেড শিল্পী। রেডিওর মাধ্যমে তাঁর সংগীত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়। সেই সময়ে অল ইন্ডিয়া রেডিওর কঠোর মানদণ্ডে টপ গ্রেড পাওয়া মানেই ছিল শিল্পীর শাস্ত্রীয় দক্ষতার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।

পরবর্তীকালে তিনি দূরদর্শন (Doordarshan)-এর নিয়মিত শিল্পী হিসেবেও সংগীত পরিবেশন করেন। টেলিভিশনের মাধ্যমে তাঁর গায়কি নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছেও পরিচিত হয়। যদিও তাঁর পরিবেশনার সংখ্যা সীমিত ছিল, তবুও প্রতিটি পরিবেশনাই ছিল গভীরভাবে স্মরণীয়।

সমকালীনদের দৃষ্টিতে শরাফত হুসেন খাঁ

সমকালীন শিল্পী ও সংগীতবোদ্ধাদের কাছে শরাফত হুসেন খাঁ ছিলেন এক গুরুগম্ভীর, শাস্ত্রনিষ্ঠ ও আত্মমর্যাদাশীল শিল্পী। তাঁকে নিয়ে প্রায়ই বলা হতো—

“তিনি গান করতেন নিজের জন্য এবং ঘরানার জন্য, জনতুষ্টির জন্য নয়।”

অনেক সংগীত সমালোচক মনে করেন, তাঁর প্রতিভা ও কণ্ঠশক্তি অনুযায়ী তিনি জীবদ্দশায় যে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা ছিল, তা পুরোপুরি পাননি। এর অন্যতম কারণ ছিল তাঁর সীমিত রেকর্ডিং, কম গণমাধ্যম উপস্থিতি এবং নিজেকে প্রচারের প্রতি অনাগ্রহ।

তবুও রসিক মহলে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত। অনেকেই তাঁকে ফৈয়াজ খাঁর প্রকৃত উত্তরসূরি হিসেবে গণ্য করেন—যিনি আগ্রা ঘরানার গায়কিকে শেষবারের মতো তার পূর্ণ রাজকীয় রূপে উপস্থাপন করেছিলেন।

“শেষ মহান আগ্রা শিল্পী”

শরাফত হুসেন খাঁকে প্রায়ই বলা হয় “The last great singer of the Agra Gharana”। এর কারণ, তাঁর পরবর্তী প্রজন্মে আগ্রা ঘরানার বিশুদ্ধ, শক্তিশালী nom-tom ও বোল-প্রধান গায়কি খুব কম শিল্পীর কণ্ঠে পূর্ণরূপে পাওয়া গেছে।

তিনি এমন এক সময়ে সংগীতচর্চা করেছেন, যখন শাস্ত্রীয় সংগীত ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক ও জনপ্রিয় ধারার চাপে পরিবর্তিত হচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে তিনি ঘরানার মূল আদর্শ আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করেন, যা তাঁকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রদান করে।

শিষ্যবৃন্দ ও উত্তরাধিকার

উস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁ খুব বেশি সংখ্যক শিষ্য গড়ে তোলেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, শাস্ত্রীয় সংগীত শেখানো মানে কেবল কণ্ঠে সুর বসানো নয়, বরং দীর্ঘ সাধনা, চরিত্রগঠন এবং ঘরানার আদর্শ আত্মস্থ করানো। তাই তিনি বেছে বেছে অল্পসংখ্যক যোগ্য শিষ্যকেই তালিম দিতেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য শিষ্যদের মধ্যে রয়েছেন—

  • শওকত হুসেন খাঁ — তাঁর পুত্র, যিনি বাবার কাছ থেকেই আগ্রা–আত্রৌলি ঘরানার তালিম গ্রহণ করেন
  • পূর্ণিমা সেন — বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী, যিনি তাঁর কাছে খেয়াল ও রাগসংগীতের গভীর শিক্ষা লাভ করেন

এই শিষ্যদের মাধ্যমে শরাফত হুসেন খাঁর গায়কির ধারা সীমিত পরিসরে হলেও পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে।

পুরস্কার ও সম্মাননা

শরাফত হুসেন খাঁ জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর ভারতীয় রাষ্ট্র ও সংগীত প্রতিষ্ঠানসমূহের পক্ষ থেকে নানা গুরুত্বপূর্ণ সম্মান লাভ করেন। এগুলো তাঁর শাস্ত্রীয় দক্ষতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্বীকৃতি।

  • তানসেন পুরস্কার
  • পদ্মশ্রী পুরস্কার (১৯৮৩) — ভারতের রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে প্রদানকৃত
  • সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৫) — মৃত্যুর পর প্রাপ্ত

এছাড়া তাঁকে উত্তর প্রদেশ পারফর্মিং আর্টস একাডেমি-র অনারারি ফেলো হিসেবে সম্মানিত করা হয়।

মৃত্যু

উস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁ ৭ জুলাই ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৫৫ বছর। তাঁর অকালপ্রয়াণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি ছিল। অনেকেই মনে করেন, তিনি আরও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলে আগ্রা ঘরানার ঐতিহ্য আরও সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারত।

স্থায়ী উত্তরাধিকার ও মূল্যায়ন

শরাফত হুসেন খাঁ আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর—

  • বিশুদ্ধ আগ্রা–আত্রৌলি ঘরানার গায়কি
  • রাজসিক nom-tom আলাপ
  • দৃঢ় লয়বোধ ও শাস্ত্রনিষ্ঠ রাগব্যাখ্যা
  • বিরল রাগে দক্ষতা

রেকর্ডিং সংখ্যা কম হলেও, তাঁর বিদ্যমান রেকর্ডিংগুলো আজও সংগীত শিক্ষার্থী ও রসিকদের কাছে অমূল্য সম্পদ। আধুনিক সময়ে আগ্রা–আত্রৌলি ধারার যেসব শিল্পীর গায়কিতে লয়ের গভীরতা ও গম্ভীর স্বরপ্রক্ষেপণ লক্ষ্য করা যায়, সেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শরাফত হুসেন খাঁর প্রভাব অনুভূত হয়।

তিনি ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি জনপ্রিয়তার চেয়ে পরম্পরা ও শুদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। এই কারণেই তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে একটি গম্ভীর, মর্যাদাসম্পন্ন ও স্থায়ী নাম

ওস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁ

উস্তাদ শরাফত হুসেন খাঁ কেবল একজন মহান কণ্ঠশিল্পীই নন, তিনি ছিলেন আগ্রা–আত্রৌলি ঘরানার এক জীবন্ত সেতু—যার মাধ্যমে উনিশ শতকের ধ্রুপদি ঐতিহ্য বিংশ শতাব্দীতে এসে পৌঁছেছে। তাঁর জীবন ও সাধনা প্রমাণ করে, শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রকৃত মহত্ত্ব আসে নীরব সাধনা ও শুদ্ধতার মধ্য দিয়ে।