‘বিগ বস ২০’-এ নিজের স্বভাব, ব্যক্তিত্ব ও নানা কর্মকাণ্ডের কারণে আলোচনায় রয়েছেন কাজী তৌকীর। রিয়েলিটি শোতে তার উপস্থিতি আবারও দর্শকদের মনে করিয়ে দিয়েছে ২০০৫ সালের জনপ্রিয় গানের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান ‘ফেম গুরুকুল’-এর কথা। ওই অনুষ্ঠান থেকেই রাতারাতি পরিচিতি পেয়েছিলেন কাজী। একই অনুষ্ঠানের প্রতিযোগী ছিলেন অর্জিৎ সিংও। যদিও সেরা পাঁচে জায়গা করে নিতে পারেননি তিনি, পরবর্তী সময়ে সংগীতজগতে তার উত্থান হয়ে ওঠে এক অসাধারণ সাফল্যের গল্প।
দুই দশক পরও কাজী ও অর্জিৎ সিংয়ের বন্ধুত্ব অটুট রয়েছে। অর্জিৎ সাধারণত নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব বেশি কথা বলেন না। তবে পুরোনো বন্ধু কাজী ‘বিগ বস’-এ প্রবেশ করার পর তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, কাজীও বিভিন্ন সময় অর্জিৎ সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির কথা বলেছেন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে কাজী জানান, ‘ফেম গুরুকুল’-এর সময় থেকেই তাদের বন্ধুত্বের শুরু। সেই সময় মাত্র ১৭ বছর বয়সী অর্জিৎ একবার অনুষ্ঠানে আবেগপ্রবণ হয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন। তখন কাজী তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। এমনকি অর্জিৎকে বাঁচাতে ভোটও দিয়েছিলেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পুরোনো একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কাজী অর্জিৎকে বলছেন, ‘কেঁদো না, সাহস হারিয়ো না। শক্ত থাকো।’ তিনি আরও বলেন, শুধু পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নয়, ভোট দেওয়ার আগে তিনি সবকিছু বিবেচনা করবেন। অর্জিৎ পরবর্তী পর্বে গেলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারেন বলেও মন্তব্য করেছিলেন কাজী।
‘ফেম গুরুকুল’-এর পর অর্জিৎ সিং অংশ নেন সনি টিভির আরেকটি রিয়েলিটি শো ‘দুস কা দুস’-এ। কাজী জানান, অনুষ্ঠানটি খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি। ‘ইন্ডিয়ান আইডল’ ও ‘ফেম গুরুকুল’-এর প্রতিযোগীদের নিয়ে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে বিজয়ী হিসেবে অর্জিৎ সিং ১০ লাখ রুপি পুরস্কার পান।
কাজীর ভাষ্য অনুযায়ী, পুরস্কারের অর্থ পাওয়ার পর অর্জিৎ তাকে একাধিকবার ফোন করেছিলেন। পরে দেখা হলে অর্জিৎ জানান, ওই অর্থ দিয়ে তিনি স্টুডিও তৈরির সরঞ্জাম কিনেছেন। তখনই কাজীর ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের বড় একটি ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
কাজী বলেন, অর্জিৎ তাকে বলেছিলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেমন মাইকেল জ্যাকসনের মতো বড় পপ তারকা রয়েছেন, তেমনই ভারতে কাজীও একজন বড় পপ তারকা হয়ে উঠতে পারেন। এমনকি অর্জিৎ তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে তার মধ্যে সেই সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে তখন কাজী অর্জিৎয়ের কথাকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। অভিনয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অর্জিৎ তাকে বারবার বোঝালেও কাজী নিজের অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। অর্জিৎ নাকি তাকে বলেছিলেন, তিনি মজা করছেন না এবং কাজীর মধ্যে সত্যিই বড় কিছু করার সম্ভাবনা দেখছেন।
পরবর্তী সময়ে অর্জিৎ নিজের ক্যারিয়ারে দ্রুত এগিয়ে যান। কাজী জানান, একপর্যায়ে অর্জিৎ তাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাজের সুযোগও দিয়েছিলেন। কিন্তু তখনও অভিনয় নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন তিনি।
অর্জিৎয়ের সাফল্য নিয়ে কাজীর কোনো আক্ষেপ নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি। বরং দুজনকে নিয়ে মানুষ প্রায়ই তুলনা করলেও বন্ধুর সাফল্যে তিনি আনন্দিত। কাজীর ভাষায়, অর্জিৎ যে জায়গায় পৌঁছেছেন, সেটি দেখে তার কোনো ধরনের ঈর্ষা হয় না।
বিশেষ করে ‘তুম হি হো’ গানটি অর্জিৎয়ের ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন এনেছিল বলে মনে করেন কাজী। তিনি জানান, এক রাতে এমটিভিতে গানটি শুনে সঙ্গে সঙ্গেই কণ্ঠটি চিনতে পেরেছিলেন। এরপর অর্জিৎকে ফোন করে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কাজী তাকে বলেছিলেন, তিনি এখন তারকা হয়ে গেছেন এবং এই গান তার জীবন বদলে দেবে।
কাজীর বর্ণনা অনুযায়ী, অর্জিৎ তখনও বিষয়টির ব্যাপকতা পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। এরপর সাক্ষাৎকার, প্রচার ও একের পর এক গান নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে তাদের দেখা করাও সম্ভব হয়নি। ধীরে ধীরে সেই অর্জিৎই ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীতে পরিণত হন।
অর্জিৎয়ের সংগীত শেখার প্রাথমিক সময়ের কথাও স্মরণ করেছেন কাজী। তার ভাষ্য, সংগীতের প্রোগ্রামিং ও প্রযুক্তিগত দিক বোঝার জন্য অর্জিৎ সুরকার প্রীতমের সঙ্গে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেছিলেন। ফলে শুধু গায়ক হিসেবে নয়, সংগীতের কারিগরি দিক সম্পর্কেও তার যথেষ্ট জ্ঞান তৈরি হয়েছিল।
বন্ধুর বিপুল জনপ্রিয়তার পরও তার ব্যক্তিত্বে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি বলে মনে করেন কাজী। তিনি অর্জিৎয়ের সরল জীবনযাপন এবং খ্যাতির প্রতি নির্লিপ্ত থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। এত বড় তারকা হওয়ার পরও অর্জিৎকে স্কুটি চালাতে, চপ্পল ও ট্র্যাক প্যান্ট পরে চলাফেরা করতে দেখা যায় বলে জানান তিনি। মানুষের কী মত, তা নিয়ে অর্জিৎ খুব একটা ভাবেন না বলেও মন্তব্য করেন কাজী।
প্রায় ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের বন্ধুত্বে সেই পুরোনো আন্তরিকতা রয়েছে। ‘বিগ বস ২০’-এ কাজীর অংশগ্রহণের খবর প্রকাশের পর অর্জিৎ নিজের এক্স অ্যাকাউন্ট ‘WhoAmI’ থেকে বন্ধুকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি লিখেছিলেন, কাজী সেখানে থাকায় জীবনে প্রথমবার ‘বিগ বস’ দেখতে হবে।
শৈশব-কৈশোরের সেই বন্ধুত্ব, পরস্পরের প্রতি আস্থা এবং একজনের অন্যজনের সম্ভাবনা চিনে নেওয়ার গল্পটি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কাজী যখন অভিনয়ের স্বপ্নে ব্যস্ত ছিলেন, তখন অর্জিৎ তার মধ্যে যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন, সময়ের সঙ্গে তার নিজের সংগীতজীবনই যেন সেই দূরদর্শিতার প্রমাণ হয়ে উঠেছে।














