দাদরা হল হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের এক মনোমুগ্ধকর উপশাস্ত্রীয় ধারা, যা তার কোমলতা, আবেগঘন উপস্থাপনা এবং সহজাত সুরমাধুর্যের জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত। এটি একদিকে যেমন শাস্ত্রীয় সংগীতের কাঠামোর প্রতি বিশ্বস্ত, তেমনই অপরদিকে লোকসংগীতের প্রাণপ্রাচুর্যও বহন করে। আগ্রা ও বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের সঙ্গে এই ধারাটির ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে দাদরার রীতি গড়ে ওঠে এবং বিকশিত হয়।
তাল ও সংগীত কাঠামো
প্রচলিতভাবে, দাদরা রচনাগুলি দাদরা তাল-এ (ছয় মাত্রার ছন্দে) পরিবেশিত হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি কেহরবা (আট মাত্রার ছন্দ) প্রভৃতি হালকা তাল-এও পরিবেশিত হতে শুরু করে, যা এই ধারাটিকে আরও প্রাণবন্ত ও শ্রোতা-বান্ধব করে তোলে।
এই ছন্দগত নমনীয়তা দাদরার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, যা একে একদিকে সহজলভ্য করে তোলে আবার অপরদিকে দেয় সংগীতশৈলীর বহুমাত্রিকতা।
ভাষাগত বৈচিত্র্য ও কাব্যিকতা
দাদরার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল এর দ্বৈতভাষিক কাঠামো। সাধারণত গানের স্থিতি বা প্রারম্ভিক অংশটি ব্রজ ভাষায় রচিত হয়—যা কৃষ্ণভক্তি ও লোককবিতার জন্য প্রসিদ্ধ। অপরদিকে অন্তরা বা দ্বিতীয় অংশটি অনেকসময় উর্দু ভাষায় গাওয়া হয়, যা গানে এক ধরনের রোমান্টিকতা ও গভীরতা নিয়ে আসে।
এই ভাষাগত মিশ্রণ ভারতীয় সংগীতের সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের প্রতিচ্ছবি। দাদরার কাব্যিক বিষয়বস্তুতে সাধারণত প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতা ফুটে ওঠে, যা সহজ ভাষায় হলেও আবেগঘন ও স্পর্শকাতর।
গায়নরীতি ও অনুভব প্রকাশ
দাদরা মূলত আবেগময় গায়নশৈলী। যেখানে খেয়াল বা ধ্রুপদ ধারা জটিল অলঙ্করণ ও তান-কায়দায় সমৃদ্ধ, সেখানে দাদরা মূলত শব্দ ও অর্থপ্রকাশে গুরুত্ব দেয়। শিল্পীরা সাধারণত কথোপকথনমূলক ভঙ্গিতে গানে আবেগ ফুটিয়ে তোলেন।
সহযোগী বাদ্যযন্ত্র হিসেবে থাকে হারমোনিয়াম, তবলা এবং মাঝে মাঝে সারঙ্গি, যেগুলি কণ্ঠসঙ্গীতের সঙ্গে সূক্ষ্মভাবে সঙ্গত করে।
ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা
বেগম আখতার, শোভা গুর্তু, ও গিরিজা দেবী প্রমুখ শিল্পীরা দাদরার ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁদের অপূর্ব পরিবেশনায়। ঠুমরি পরিবেশনার মধ্যেও দাদরা প্রায়শই অন্তর্ভুক্ত হয়, একটি অতিরিক্ত রস বা পরিবর্তন আনার জন্য।
আজকের দিনে দাদরা সেই সমস্ত সঙ্গীতরসিকের কাছে প্রিয়, যারা শাস্ত্রীয় সংগীতের ভাবগম্ভীরতা এবং লোকগানের প্রাণশক্তি—উভয়কেই ভালোবাসেন। এর সরলতাই একে মহিমাময় করে তুলেছে।
দাদরা হলো হিন্দুস্তানি সংগীতের এক কোমল, কাব্যিক ও হৃদয়গ্রাহী রূপ, যেখানে ভাষা, সুর এবং অনুভব একত্রিত হয়ে তৈরি করে এক অনবদ্য সংগীত-অভিজ্ঞতা। দাদরা আমাদের শেখায়, সংগীত কেবল শাস্ত্র বা কারিগরি চর্চা নয়—এটি হৃদয়ের ভাষা।
লেখক:
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
উপদেষ্টা, সঙ্গীত গুরুকুল

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।













