নেমেসিসের ২৫ বছরের রক যাত্রা

ঢাকার আন্ডারগ্রাউন্ড রক সংগীতের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে ছিল অনিশ্চয়তা, সীমিত সুযোগ এবং প্রবল সংগ্রামের এক ধারাবাহিক চিত্র। রুফটপ কনসার্ট, ধার করা বাদ্যযন্ত্র, পুড়িয়ে ফেলা সিডি এবং মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গানের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল এক প্রজন্মের বিকল্প সংগীত সংস্কৃতি। এই বাস্তবতার ভেতরেই ১৯৯৯ সালের গ্রীষ্মে কয়েকজন সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা তরুণের উদ্যোগে জন্ম নেয় একটি ব্যান্ড—নেমেসিস। শুরুতে তাদের ছিল না কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা, ছিল শুধু গভীর সংগীতপ্রেম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং সৃজনশীলতার প্রতি নিষ্ঠা। সময়ের সঙ্গে সেই ছোট উদ্যোগই আজ বাংলাদেশের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ও প্রভাবশালী রক ব্যান্ডে পরিণত হয়েছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে সাবের, রিশাদ মাহের খান এবং ইয়াওয়ার মেহবুবকে নিয়ে ব্যান্ডটির যাত্রা শুরু হয়। পরে মাহের তার ভাই সাবিনকে বেস গিটারিস্ট হিসেবে যুক্ত করেন। ১৯৯৯ সালের নববর্ষে একটি ছাদভিত্তিক অনুষ্ঠানে তাদের প্রথম মঞ্চায়ন হয়, যা ছিল খুবই সাধারণ কিন্তু ঐতিহাসিক সূচনা। পরবর্তী সময়ে জোহাদ রেজা চৌধুরীর যুক্ত হওয়ায় ব্যান্ডটি আরও সুসংগঠিত রূপ পায়। ২০০০ সালের দিকে একাধিক সদস্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নেমেসিস পূর্ণাঙ্গ দল হিসেবে গড়ে ওঠে।

শুরুর বছরগুলোতে তারা ঢাকার আন্ডারগ্রাউন্ড সার্কিটে কভার গান পরিবেশন করে পরিচিতি লাভ করে। তবে ২০০১ সাল থেকে তারা মৌলিক গান তৈরিতে মনোযোগী হয়। ২০০৩ সালে মিশ্র অ্যালবাম “অগন্তুক দুই”-তে “অবচেতন” গানটি তাদের প্রথম বড় সাফল্য এনে দেয়, যা শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এর পরই জি-সিরিজের সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়, যা ব্যান্ডটির পেশাদার যাত্রাকে আরও সুসংহত করে।

২০০৫ সালে প্রকাশিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম “অন্বেষণ” নেমেসিসকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে। এই অ্যালবামে নগর জীবনের অস্থিরতা, তরুণদের মানসিক সংকট এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি গভীরভাবে ফুটে ওঠে। “দুশ্চিন্তা”, “জয়ধ্বনি” এবং “মৃত্যুছায়া” গানগুলো বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

নিচের টেবিলে নেমেসিসের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

বছরগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
১৯৯৯নেমেসিসের সূচনা
২০০৩“অবচেতন” প্রকাশ
২০০৫প্রথম অ্যালবাম “অন্বেষণ” প্রকাশ
২০১১“তৃতীয় যাত্রা” প্রকাশ
২০১৮ড্রামারের শারীরিক অসুস্থতা
২০২৫“ভিআইপি” অ্যালবাম প্রকাশ

২০১১ সালে প্রকাশিত “তৃতীয় যাত্রা” ব্যান্ডের সাউন্ডে নতুন মাত্রা যোগ করে। বিশেষ করে “কবে” গানটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং সমালোচকদের কাছ থেকেও প্রশংসা অর্জন করে। এই অ্যালবামের মাধ্যমে নেমেসিস তাদের সংগীতধারায় আরও পরিণত ও পরীক্ষামূলক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করে।

২০১২ সালের পর ব্যান্ডে একাধিক সদস্য পরিবর্তন ঘটে, যা তাদের যাত্রায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ব্যক্তিগত কারণে মাহের ও ওমায়র ব্যান্ড ছাড়লেও নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নেমেসিস তাদের সংগীতধারা অব্যাহত রাখে। ২০১৮ সালে ড্রামার ডিওর হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া ব্যান্ডটির জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। পরবর্তীতে জেফ্রি অবিজিত ঘোষ যুক্ত হয়ে তাদের মঞ্চে ফেরার পথ সুগম করেন।

২০২৫ সালে দীর্ঘ বিরতির পর প্রকাশিত “ভিআইপি” অ্যালবামকে নেমেসিসের সবচেয়ে পরিণত কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অ্যালবামে জীবনের বাস্তবতা, হতাশা এবং সামাজিক টানাপোড়েন আরও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। “ঘোর” এবং “ভাঙা আয়না” গান দুটি শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ আলোচনার জন্ম দেয়।

বর্তমানে নেমেসিস নিয়মিতভাবে দেশজুড়ে কনসার্ট ও ট্যুরে অংশ নিচ্ছে। তাদের ২৫ বছরের যাত্রা শুধুমাত্র একটি ব্যান্ডের ইতিহাস নয়, বরং বাংলাদেশের রক সংগীতের বিকাশ, পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।