বাপ্পা মজুমদার । বাঙালি সঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার এবং সুরকার

বাংলাদেশের আধুনিক অডিও ও ব্যান্ড মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির বিবর্তন নিয়ে কথা বলতে গেলে একটি নাম অবধারিতভাবে চলে আসে—বাপ্পা মজুমদার। গত তিন দশক ধরে তিনি এদেশের শ্রোতাদের কখনো উপহার দিয়েছেন নিখুঁত মেলোডির রোমান্টিক গান, কখনো ব্যান্ডের চেনা বৃত্তের বাইরে গিয়ে কর্ড প্রোগ্রেসনের এক নতুন জাদু, আবার কখনো নিভৃতে তৈরি করেছেন অন্য কোনো নতুন শিল্পীর ক্যারিয়ারের সেরা গানটি। শ্রোতাদের কাছে তিনি পরম শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় শুধুই ‘বাপ্পাদা’। পারিবারিক সূত্রে তাঁর নাম শুভাশীষ মজুমদার বাপ্পা হলেও, বাংলা গানের ভুবনে তিনি আসলে এক ক্লান্তিহীন সুর-বিপ্লবের নাম।

বাপ্পা মজুমদার । বাঙালি সঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার এবং সুরকার

বাপ্পা মজুমদার
বাপ্পা মজুমদার

শিকড়ের টানে: শৈশব ও সঙ্গীতের অবধারিত হাতেখড়ি

বাপ্পা মজুমদারের জন্ম ১৯৭২ সালে, এক খাঁটি এবং আপাদমস্তক সঙ্গীতমগ্ন পরিবারে। তাঁর পিতা ওস্তাদ বারীণ মজুমদার ছিলেন এই উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতবিশারদ এবং এদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গীত শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ। অন্যদিকে তাঁর মা ইলা মজুমদারও ছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক গুণী শিল্পী।

এমন এক কড়া শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আবহে বেড়ে ওঠার কারণে গানের প্রথম পাঠ নিতে বাপ্পাকে কখনো বাড়ির বাইরে পা রাখতে হয়নি। ঘরের বাতাসেই দিন-রাত ভাসত রাগ-রাগিণীর সুর। পরবর্তীকালে বাবার গড়ে তোলা ‘মণিহার সঙ্গীত একাডেমী’ থেকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ওপর পাঁচ বছরের একটি দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক কোর্স সফলভাবে শেষ করেন তিনি।

তবে ক্ল্যাসিকাল গান নিয়ে বাপ্পাদার নিজস্ব একটা গভীর বিনয় ও পরিমিতিবোধ কাজ করে। তিনি নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন:

“আমি মনে করি না ক্লাসিকাল গানের এই প্রশিক্ষণ আমার জন্য পর্যাপ্ত ছিল, আর তাই হয়তো সাহস করে এই ধারার গান গাওয়ার ভেতর নিজেকে পুরোপুরি ডুবিয়ে রাখতে পারি না।”

মজার ব্যাপার হলো, গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার অনেক আগে বাপ্পা মূলত একজন গিটারিস্ট হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিনগুলোতে তিনি দেশের বহু নামী-দামী এবং কিংবদন্তি শিল্পীদের সাথে ব্যাক-আপ গিটারিস্ট হিসেবে স্টেজ ও স্টুডিওতে কাজ করেছেন। গিটারের এই ছয়টি তারের সাথে তাঁর যে মিতালি, সেটাই পরবর্তীকালে তাঁর তৈরি করা গানের মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট এবং সাউন্ড ডিজাইনকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা ও আধুনিক করে তুলেছিল।

ব্যান্ড ‘দলছুট’ এবং সঞ্জীব চৌধুরী: এক ঐতিহাসিক যুগলবন্দি

বাপ্পা মজুমদারের মিউজিক্যাল লাইফের কথা বলতে গেলে ‘দলছুট’ ব্যান্ডের প্রসঙ্গ ছাড়া সেই গল্প একেবারেই অসম্পূর্ণ। গতানুগতিক পপ বা রক ব্যান্ডের চেনা বৃত্তের বাইরে গিয়ে সমসাময়িক নাগরিক জীবনের কথা, দ্রোহ, আর এক অদ্ভুত আন্তরিকতায় ভরা গান নিয়ে তরুণদের মাঝে ঝড় তুলেছিল এই ব্যান্ড।

১৯৯৬ সালের দিকে বাপ্পা মজুমদার এবং প্রখ্যাত ফিচারিস্ট, সাংবাদিক ও চারণ কবি সঞ্জীব চৌধুরী মিলে গড়ে তুলেছিলেন এই ঐতিহাসিক দল। সঞ্জীব চৌধুরীর ক্ষুরধার ও দার্শনিক লিরিক, আর বাপ্পা মজুমদারের মেলোডিয়াস সুরের যে যুগলবন্দি—তা বাংলা ব্যান্ড মিউজিককে এক নতুন ভাষা দিয়েছিল। ২০০৭ সালে সঞ্জীব চৌধুরীর অকাল মৃত্যুর পর বাপ্পা মজুমদার ভেঙে না পড়ে, পরম যত্নে নিজের কাঁধে তুলে নেন ‘দলছুট’-এর হাল। প্রিয় বন্ধুর স্মৃতি আর ব্যান্ডের সেই সিগনেচার সাউন্ডকে আজও তিনি পরম মমতায় বাঁচিয়ে রেখেছেন স্টেজ থেকে স্টেজে।

ব্যান্ড কিংবা নিজের একক অ্যালবামের বাইরেও তিনি এদেশের অডিও ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সেরা একজন কম্পোজার। অন্য অনেক গুণী এবং তরুণ শিল্পীদের জন্য তিনি অসংখ্য কালজয়ী গান তৈরি করেছেন, যা অনেক শিল্পীর মিউজিক্যাল ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে।

অ্যালবাম ও জনপ্রিয় গানের খতিয়ান

১৯৯৫ সালে বাপ্পা মজুমদারের প্রথম একক অ্যালবাম ‘তখন ভোর বেলা’ প্রকাশের মাধ্যমে গায়ক হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক ও পেশাদার যাত্রা শুরু হয়। প্রথম অ্যালবামেই তিনি জানান দিয়েছিলেন, তিনি লম্বা রেসের ঘোড়া। এরপর থেকে এযাবৎ তিনি নয়টি সফল স্টুডিও অ্যালবাম শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন এবং প্রায় ২০০-এর বেশি মিশ্র ও অন্যান্য অ্যালবামের সঙ্গীত পরিচালনা, মিক্সিং ও মাস্টারিংয়ের কাজ করেছেন।

২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া তাঁর সপ্তম একক অ্যালবাম ‘দিন বাড়ি যায়’ এবং ২০০৮ সালের ‘সূর্যস্নানে চল’ আধুনিক বাংলা গানের জগতে দুটি মস্ত বড় মাইলফলক। মূলত নিখুঁত মেলোডি, অ্যাকোস্টিক গিটারের পরিমিত ব্যবহার আর মায়াবী কণ্ঠের কারণে বাপ্পা মজুমদার শ্রোতাদের মনের মণিকোঠায় আলাদা একটা সাম্রাজ্য গড়ে নিয়েছেন।

পর্দার ওপারের মানুষটি: নিভৃতচারী ও টেক-স্যাভি

ব্যগত জীবনে ২০০৮ সালের ২১ মার্চ বাপ্পা মজুমদার বিয়ে করেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় মডেল, টেলিভিশন অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী মেহবুবা মাহনূর চাঁদনীকে (যদিও পরবর্তীকালে তাঁদের বৈবাহিক জীবনে বিচ্ছেদ ঘটে এবং বাপ্পা মজুমদার অভিনেত্রী তানিয়া হোসাইনের সাথে নতুন করে সংসার সাজান)।

গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের চটকদার লাইমলাইটের বাইরে বাপ্পা মজুমদার ভীষণ রকমের নিভৃতচারী এবং প্রযুক্তি-আসক্ত (টেক-স্যাভি) একজন মানুষ। গানের মানুষ হলেও কম্পিউটারের খুঁটিনাটি, গেম খেলা আর নতুন নতুন আধুনিক মিউজিক ও সাউন্ড সফটওয়্যার নিয়ে নিজের স্টুডিওর ল্যাবরেটরিতে মেতে থাকতে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন। কোনো নতুন সফটওয়্যার বা প্লাগ-ইনস বাজারে এলে তা দিয়ে কীভাবে গানের সাউন্ডকে আরও গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে নেওয়া যায়—এই পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেই কাটে তাঁর দিনের বেশির ভাগ সময়।

বাপ্পা মজুমদার
বাপ্পা মজুমদার

বাপ্পা মজুমদার কেবল একটি নাম নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। এদেশের অডিও ইন্ডাস্ট্রির সুসময় থেকে শুরু করে পাইরেসির অন্ধকার যুগ, এবং আজকের ডিজিটাল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের যুগ—সব কটি সময়কে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং নিজেকে প্রতিবার সময়ের সাথে সাথে নতুন করে ভেঙেছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ পথচলায় একটি জিনিস তিনি কখনো হাতছাড়া হতে দেননি—তা হলো গানের আত্মিক গভীরতা ও মেলোডি। যতদিন বাংলা গান থাকবে, বাপ্পাদার এই সুরের মায়াজাল বাঙালিকে ঠিক এভাবেই আচ্ছন্ন করে রাখবে।

Leave a Comment