সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই জুন ২০২২, ৪:৫০ পিএম
বাংলা লোকসংগীত ও আধ্যাত্মিক ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও কালজয়ী সৃষ্টি হলো ‘ভবে আসা যাওয়া যে যন্ত্রণা’। দেহতত্ত্ব ও বৈরাগ্য ঘরানার এই বিখ্যাত গানটির রচয়িতা হলেন শ্রীহট্ট বা সিলেট অঞ্চলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক কবি, বৈষ্ণব বাউল ও ধামাইল গানের প্রবর্তক রাধারমণ দত্ত। জাগতিক মোহমুক্তি এবং মানবজীবনের অন্তিম সত্যকে কেন্দ্র করে রচিত এই গানটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলার বাউল ও লোকসংগীত শিল্পীদের কণ্ঠে গীত হয়ে আসছে।
এই কালজয়ী গানের স্রষ্টা রাধারমণ দত্তের পারিবারিক ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ অনুসারে, তাঁর পূর্বপুরুষগণ সপ্তম শতকে মিথিলা থেকে সিলেট অঞ্চলে এসেছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁর বংশধরেরা জগন্নাথপুর রাজ্যের কেশবপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। রাধারমণের পিতা রাধামাধব দত্ত ছিলেন সংস্কৃত ভাষার এক প্রথিতযশা পণ্ডিত এবং মহাকবি জয়দেবের ‘গীত গোবিন্দ’ কাব্যের সার্থক অনুবাদক। পিতার এই সাহিত্যিক গুণ রাধারমণ দত্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পারিবারিক নানা বিপর্যয় এবং জাগতিক ধন-সম্পদের ক্ষণস্থায়ী রূপ দেখে তিনি পরমাত্মার সন্ধানে মগ্ন হন। কৃষ্ণ বিরহের আকুলতা, দেহতত্ত্ব, ভজন এবং ধামাইলসহ কয়েক হাজার গান রচনা করে তিনি বাংলা লোকসাহিত্যে এক চিরস্থায়ী আসন লাভ করেন।
Table of Contents
ভবে আসা যাওয়া যে যন্ত্রণা, জানলে ভবে আর আসতাম না
আমি যার লাগিয়া ভবে আইলাম, তাহারে যদি পাইলাম না
জানলে ভবে আর আসতাম না।
মন রে, মাকালের ফল দেখতে ভালো, বাহির লাল তার ভিতর কালো, আগে জানি না
আমি না জানিয়া মাকাল খাইয়া, বিষের জ্বালায় প্রাণ বাঁচে না।
জানলে ভবে আর আসতাম না।
মন রে, সে পারে মথুরার বাজার, পার হইয়া যায় সব দোকানদার, আমি পারলাম না
আমি শেষ বাজারে গিয়া পইড়া, বেঁচা-কিনার বাউ পাইলাম না।
জানলে ভবে আর আসতাম না।
মন রে, মহাজনের পুঁজি লইয়া আইলাম ষোল আনা
ওরে আমি লাভে মূলে সব হারাইলাম, চালানি খাইয়া হইল দেনা।
জানলে ভবে আর আসতাম না।
মন রে, টাকা-পয়সা সোনা-গয়না, মরলে কারো সঙ্গে যায় না, দালান-কোঠা সব রবে পড়িয়া
ও মন রে, পড়ে রবে ফুল বিছানা, সঙ্গে যাবে ছিঁড়া তেনা।
জানলে ভবে আর আসতাম না।
Vobe asa jaoa je jontrona, janle vobe ar astam na
Ami jar lagiya vobe ailam, tahare jodi pailam na
Janle vobe ar astam na.
Mon re, makaler fol dekhte bhalo, bahir lal tar bhitor kalo, age jani na
Ami na janiya makal khaiya, bviser jbalay pran bance na.
Janle vobe ar astam na.
Mon re, se pare mothurar bazar, par hoiya jay sob dokandar, ami parlam na
Ami ses bajare giya poira, beca-kinar bau pailam na.
Janle vobe ar astam na.
Mon re, mohajoner puji loiya ailam solo ana
Ore ami labhe mule sob harailam, calani khaiya hoilu dena.
Janle vobe ar astam na.
Mon re, taka-poysa sona-goyna, morle karo songe jay na, dalan-kotha sob robe poriya
O mon re, pore robe ful bichana, songe jabe chira tena.
Janle vobe ar astam na.
গানটির সুর মূলত খাঁটি বাংলা লোকসংগীত তথা ঐতিহ্যবাহী বাউল অঙ্গের ওপর প্রতিষ্ঠিত। রাধারমণ দত্তের অন্যান্য গানের মতো এটিও সহজ-সরল একতারা, দোতারা ও ঢোলের বোলে ভর করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। এর সুরের মধ্যে এক ধরণের উদাসীনতা ও আধ্যাত্মিক হাহাকার রয়েছে, যা শ্রোতাকে জাগতিক ব্যস্ততার বাইরে গিয়ে জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
এই গানের মূল ভাব সম্পূর্ণ দেহতত্ত্ব এবং বৈরাগ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। মানুষের এই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া, জীবন ধারণ করা এবং পুনরায় মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়ার যে চক্র, তাকেই এখানে ‘যন্ত্রণা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। গীতিকার সুন্দর সুন্দর উপমার মাধ্যমে মানুষের জাগতিক মোহকে মাকাল ফলের সাথে তুলনা করেছেন, যা বাইরে থেকে আকর্ষণীয় হলেও ভেতরে শূন্য ও বিষাদময়। মানুষ মহাজনের (ঈশ্বর) কাছ থেকে যে জীবনরূপ পুঁজি নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিল, তা সৎ কাজে না লাগিয়ে কেবল জাগতিক মোহে ব্যয় করে শেষ পর্যন্ত শূন্যহাতে ফেরার আফসোস এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
মিউজিক কম্পোজিশন ও গায়কীর দিক থেকে গানটি অত্যন্ত প্রভাবশালী। এর বিশেষত্ব হলো এর রূপকধর্মী সহজ শব্দচয়ন। ‘মথুরার বাজার’ কিংবা ‘বেঁচা-কিনার বাউ’ শব্দগুলোর মাধ্যমে জীবনের শেষ দিনগুলোর হিসাব-নিকাশ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোনো কৃত্রিম আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই কেবল বাউল শিল্পীদের দরদভরা কণ্ঠ এবং গ্রামীণ সুরের টান এই গানটিকে এক গভীর আত্মিক উপাখ্যানে পরিণত করেছে।
উৎস (Sources)
এই নিবন্ধের ঐতিহাসিক ও জীবনীসংক্রান্ত তথ্যসমূহ অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি রচিত ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’, রাধারমণ দত্তের সংগৃহীত সংগীত সংকলন এবং সিলেট অঞ্চলের লোকসংগীত গবেষকদের আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।
মন্তব্য