ভূপেন হাজারিকা: মানবতার সুরে অমর এক কিংবদন্তি

‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’—মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের এই চিরন্তন বার্তা যাঁর কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, তিনি উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতস্রষ্টা ড. ভূপেন হাজারিকা। তাঁর গান শুধু শ্রোতার মন ছুঁয়ে যায়নি, সমাজের নানা অসংগতি, বৈষম্য ও মানুষের অধিকারহীনতার কথাও তুলে ধরেছে। নদী, প্রকৃতি, মাটি ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম তাঁর সুরে পেয়েছে এক অনন্য ভাষা।

ভূপেন হাজারিকা ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, কবি, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক—প্রতিটি পরিচয়েই তিনি রেখেছেন স্বতন্ত্র অবদান। তাঁর গভীর ও দরাজ কণ্ঠস্বর, চিন্তাশীল গীতিকথা এবং সংগীতের নিজস্ব ধারা তাঁকে ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বিশেষ স্থান দিয়েছে। অসম, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়।

জন্ম ও শৈশব

১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ভারতের আসাম রাজ্যের সাদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ভূপেন হাজারিকা। তাঁর বাবা নীলকান্ত হাজারিকা এবং মা শান্তিপ্রিয়া হাজারিকা। দশ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আকর্ষণ। মাত্র ১০ বছর বয়সে গান লেখা ও সুর করার প্রতিভা প্রকাশ পায় তাঁর মধ্যে। ১৯৩৬ সালে কলকাতায় তাঁর প্রথম গান রেকর্ড করা হয়।

শৈশবেই অসমের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দুই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা ও বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার সান্নিধ্য লাভ করেন তিনি। তাঁদের সংস্পর্শ তাঁর শিল্পীসত্তা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৩৯ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা পরিচালিত অসমীয়া চলচ্চিত্র ‘ইন্দ্রমালতী’তে অভিনয় ও গান পরিবেশন করেন ভূপেন হাজারিকা। ছবিতে তাঁর গাওয়া ‘বিশ্ববিজয় নওজোয়ান’ গানটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অসমীয়া চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘ইন্দ্রমালতী’ ছিল দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। এত অল্প বয়সে চলচ্চিত্র ও সংগীতের জগতে তাঁর প্রবেশ ভবিষ্যতের অসাধারণ এক শিল্পী হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিয়েছিল।

শিক্ষাজীবন ও পল রোবসনের প্রভাব

সংগীতের পাশাপাশি পড়াশোনাতেও মেধার পরিচয় দেন ভূপেন হাজারিকা। ১৯৪২ সালে গুয়াহাটির কটন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট আর্টস সম্পন্ন করেন। ১৯৪৪ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ১৯৪৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য পরে যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। ১৯৫২ সালে নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষায় শ্রবণ ও দৃশ্যভিত্তিক পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে ভারতের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ছিল তাঁর গবেষণার মূল বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ সংগীতশিল্পী, অভিনেতা ও নাগরিক অধিকারকর্মী পল রোবসনের সংস্পর্শে আসেন ভূপেন হাজারিকা। রোবসনের বিখ্যাত গান ‘ওল্ড ম্যান রিভার’ এবং তাঁর সাম্যবাদী ও মানবতাবাদী চিন্তাধারা ভূপেনের সংগীতভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তী সময়ে তাঁর গানে শোষিত মানুষের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, ন্যায়বিচার ও মানবমুক্তির যে বার্তা উঠে এসেছে, তার পেছনে এই অভিজ্ঞতারও ভূমিকা ছিল।

সাত দশকের সংগীতযাত্রা

প্রায় সাত দশকের সংগীতজীবনে ভূপেন হাজারিকা অসমীয়া, বাংলা ও হিন্দি ভাষায় অসংখ্য গান রচনা, সুরারোপ ও পরিবেশন করেছেন। তাঁর কাছে সংগীত ছিল কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; মানুষের কথা বলা এবং সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরার শক্তিশালী একটি উপায়।

ব্রহ্মপুত্র নদ, অসমের প্রকৃতি, পাহাড়-পর্বত, চা-বাগানের শ্রমিক, সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রেম-বিরহ এবং সামাজিক বৈষম্য—বিচিত্র বিষয় তাঁর গানে জায়গা পেয়েছে। মানুষের দুঃখ, বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন সহজ অথচ গভীর ভাষায়।

অসমীয়া লোকসংগীত, বিহুগীত, ভাটিয়ালি ও বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগীতধারাকে আধুনিক সংগীতের সঙ্গে মিশিয়ে নিজস্ব একটি ধারা তৈরি করেছিলেন তিনি। স্থানীয় সংস্কৃতির শিকড় অক্ষুণ্ন রেখেও তাঁর গান ভাষা ও ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যায়।

সংগীত ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনীতিতেও যুক্ত ছিলেন ভূপেন হাজারিকা। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত আসাম বিধানসভার স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (আইপিটিএ) সঙ্গেও তাঁর সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল। মানুষের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর আগ্রহ সংগীতের বাইরেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রকাশ পেয়েছে।

বাংলা গানে অমলিন ভূপেন

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের শ্রোতাদের কাছে ভূপেন হাজারিকা বিশেষ আবেগের নাম। অসমীয়া ভাষায় তাঁর বহু গান বাংলা ভাষায় অনূদিত ও পুনর্নির্মিত হয়েছে। পাশাপাশি বাংলায়ও তিনি রচনা ও পরিবেশন করেছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান।

‘মানুষ মানুষের জন্য’, ‘আমি এক যাযাবর’, ‘বিস্তীর্ণ দুপারে’, ‘গঙ্গা আমার মা’, ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি’, ‘আমায় ভুল বুঝিস না’, ‘একটি রঙিন চাদর’, ‘ও মালিক সারা জীবন’, ‘প্রতিধ্বনি শুনি’, ‘সাগর সঙ্গমে’, ‘হে দোলা হে দোলা’ ও ‘চোখ ছলছল করে’—তাঁর এমন অনেক গান আজও শ্রোতাদের কাছে সমান আবেদনময়।

‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানটি তাঁর মানবতাবাদী দর্শনের অন্যতম প্রতিফলন। মানুষের বিপদে অন্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নেওয়া এবং সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান গানটিকে সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে কালজয়ী করে তুলেছে। এর আবেদন কোনো নির্দিষ্ট সময় বা সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

অন্যদিকে ‘বিস্তীর্ণ দুপারে’ গানটির কেন্দ্রে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ। তবে নদীকে ঘিরে লেখা হলেও গানটির বক্তব্য আরও বিস্তৃত। নদীর দুই পাড়ের মানুষের জীবন, সামাজিক বৈষম্য, সভ্যতার সংকট ও মানবিক বঞ্চনার চিত্র এতে উঠে এসেছে। ভূপেন হাজারিকার গানের বিশেষত্ব ছিল—স্থানীয় কোনো অভিজ্ঞতাকে তিনি এমনভাবে তুলে ধরতেন, যা বৃহত্তর মানবসমাজের বাস্তবতার সঙ্গেও মিলে যায়।

চলচ্চিত্রে বহুমুখী অবদান

সংগীতের পাশাপাশি অসমীয়া চলচ্চিত্রের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ভূপেন হাজারিকা। অভিনয়, পরিচালনা, প্রযোজনা, চিত্রনাট্য রচনা, সংগীত পরিচালনা ও কণ্ঠদান—চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।

তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘এরা বাটোর সুর’, ‘শকুন্তলা’, ‘প্রতিধ্বনি’, ‘লটি-ঘটি’ ও ‘চিকমিক বিজুলি’। ১৯৭৫ সালে ‘চামেলি মেমসাহেব’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

পরবর্তী সময়ে হিন্দি চলচ্চিত্রেও তাঁর সংগীত পরিচালনা প্রশংসিত হয়। কাল্পনা লাজমি পরিচালিত ‘রুদালি’ চলচ্চিত্রের সংগীত তাঁর সর্বভারতীয় পরিচিতিকে আরও বিস্তৃত করে। এ ছাড়া ‘এক পল’, ‘দরদমিয়ান’, ‘দমন’, ‘সাজ’ ও ‘গজগামিনী’ চলচ্চিত্রেও তাঁর সংগীত প্রতিভার স্বাক্ষর রয়েছে। ‘রুদালি’র সংগীত পরিচালনার জন্য জাপানে অনুষ্ঠিত এশিয়া প্যাসিফিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও তিনি পুরস্কার লাভ করেন।

পুরস্কার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

সংগীত, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন ভূপেন হাজারিকা। উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • ১৯৭৭ সালে পদ্মশ্রী।
  • ‘চামেলি মেমসাহেব’ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
  • ১৯৮৭ সালে সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার।
  • ১৯৮৭ সালে অসম সরকারের শঙ্করদেব পুরস্কার।
  • ১৯৯২ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, যা ১৯৯৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়।
  • ২০০১ সালে পদ্মভূষণ।
  • ২০০১ সালে অসম সরকারের অসম রত্ন সম্মাননা।
  • ২০০৮ সালে সংগীত নাটক আকাদেমির ফেলোশিপ।
  • ২০১২ সালে মরণোত্তর পদ্মবিভূষণ।
  • ২০১৯ সালে মরণোত্তর ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্ন।

এসব পুরস্কার তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবনের স্বীকৃতি হলেও মানুষের কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল সংগীতের মাধ্যমে হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া। ভাষা ও অঞ্চলের সীমা অতিক্রম করে তাঁর গান যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তা তাঁর শিল্পীসত্তার ব্যাপ্তিই তুলে ধরে।

প্রয়াণ ও অমর উত্তরাধিকার

২০১১ সালের ৫ নভেম্বর মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালে ৮৫ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ভূপেন হাজারিকা। তাঁর মৃত্যুতে উপমহাদেশের সংগীত ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। তবে তাঁর সৃষ্টির আবেদন থেমে যায়নি। মৃত্যুর পর ২০১৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করে।

ভূপেন হাজারিকার গান আজও মানুষের জীবনের নানা মুহূর্তে ফিরে আসে। কখনো তা নদীর কথা বলে, কখনো শ্রমজীবী মানুষের বেদনা তুলে ধরে, আবার কখনো মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়। তাঁর সংগীতে প্রেম ও প্রকৃতির পাশাপাশি ছিল সামাজিক দায়বদ্ধতা, সাম্য এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন।

তিনি দেখিয়েছেন, শিল্পীর পরিচয় কোনো ভাষা বা ভৌগোলিক সীমারেখায় আটকে থাকে না। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও দায়বদ্ধতাই একজন শিল্পীর সৃষ্টিকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

আজও যখন ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানটি বেজে ওঠে, তখন মনে হয় ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠ যেন নতুন করে মানবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তিনি ছিলেন ব্রহ্মপুত্রের সন্তান, কিন্তু তাঁর গান হয়ে উঠেছে সমগ্র উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ। তাঁর কণ্ঠ থেমে গেছে, কিন্তু তাঁর সুর ও মানবিক বার্তা আজও বহমান।

ভূপেন হাজারিকা তাই কেবল একজন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পীর নাম নন; তিনি মানবতা, সাম্য ও সহমর্মিতার এক অনন্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এই মহান শিল্পী।

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।