সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২২, ৪:৩৯ পিএম
![মানুষ ধরো মানুষ ভজো (১৯৯৯) [ Manush Dhoro Manush Bhojo ]](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2022/02/মানুষ-ধরো-মানুষ-ভজো.jpg)
Table of Contents
আধ্যাত্মিক ও মরমী লোকজ গানের জগতে ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং গভীর দর্শনসমৃদ্ধ একটি সৃষ্টি। প্রখ্যাত বাউল সাধক রশিদ উদ্দিনের রচিত এই গানটি প্রবাদপ্রতিম বংশীবাদক ও কণ্ঠশিল্পী বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠে পূর্ণতা লাভ করেছে। ১৯৯৯ সালে নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হওয়ার পর এটি সর্বস্তরের শ্রোতাদের মাঝে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং মানবতাবাদের এক অনন্য বার্তাবাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
| গানের নাম | মানুষ ধরো মানুষ ভজো |
| গীতিকার | রশিদ উদ্দিন |
| কণ্ঠশিল্পী | বারী সিদ্দিকী |
| চলচ্চিত্র | শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯) |
| গানের ধরন | লোকসংগীত / আধ্যাত্মিক |
বাউল সাধক রশিদ উদ্দিন ছিলেন নেত্রকোণা অঞ্চলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মরমী কবি, যাঁর রচনায় মানবদেহ ও আত্মার নিগূঢ় তত্ত্ব অত্যন্ত সহজ ভাষায় ফুটে উঠেছে। তাঁর লেখা এই গানটির মূল প্রেক্ষাপট হলো সুফি দর্শন ও বাউল মতবাদের দেহবোধ বা দেহতত্ত্ব। অন্যদিকে এই গানটিকে আধুনিক প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করার পেছনে প্রধান কারিগর হলেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী বারী সিদ্দিকী। ১৯৫৪ সালে নেত্রকোণায় জন্মগ্রহণ করা এই শিল্পী ওস্তাদ গোপাল দত্ত এবং আমিনুর রহমানের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে দীর্ঘ তালিম নিয়েছিলেন।
মূলত একজন বাঁশিবাদক হিসেবে দীর্ঘকাল কাজ করার পর, নব্বইয়ের দশকে হুমায়ূন আহমেদের বিশেষ উৎসাহে বারী সিদ্দিকী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া এই গানটি মানুষের আত্মিক পরিচয় এবং স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ককে এক নতুন সাঙ্গীতিক মাত্রা প্রদান করে। আধ্যাত্মিক এই মর্মভেদী গানটির মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে একটি স্থায়ী ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আসন তৈরি করতে সক্ষম হন।
মানুষ ধর মানুষ ভজ
শোন বলিরে পাগল মন
মানুষের ভিতরে মানুষ
করিতেছে বিরাজন।
মানুষ কি আর এমনি বটে
যার চরণে জগৎ লুটে
এই না পঞ্চভুতের ঘাটে
খেলিতেছে নিরঞ্জন।
চৌদ্দতালার উপরে দালান
তার ভিতরে ফুলের বাগান
লাইলী আর মজনু দেওয়ান
সুখেই করেছে আসন।
মানুষ ধর মানুষ ভজ
শোন বলিরে পাগল মন।
দুই ধারে দুই কঠোরা
হায়াৎ মউত মাঝখানে ভরা
সময় থাকতে খুঁজরে তোরা
নিকটেতে কালসময়।
সোনার পুরী আন্ধার করে
যেদিন পাখি যাবে উড়ে
শূন্যখাঁচা থাকবে পড়ে
কে করবে আর তার যতন।
মানুষ ধর মানুষ ভজ
শোন বলিরে পাগল মন।
তালাশে খালাশ মেলে
তালাশ করো রংমহলে
উঠিয়া হাবলঙের পুলে
চেয়ে থাকো সর্বক্ষন।
দেখিবে হাবলঙের পুলে
দুই দিকেতে অগ্নি জ্বলে
ভেবে রশীদউদ্দিন বলে
চমকিছে স্বর্ণের মতন।
Manush dhoro manush bhojo
Shono bolire pagol mon
Manusher bhitore manush
Koriteche birajon.
Manush ki ar emni bote
Jar chorone jogot lute
Ei na ponchobhuter ghate
Kheliteche nironjon.
Chouddotalar upore dalan
Tar bhitore fuler bagan
Laili ar mojnu dewan
Sukhei koreche ashon.
Manush dhoro manush bhojo
Shono bolire pagol mon.
Dui dhare dui kothora
Hayat maut majhkhan bhora
Shomoy thakte khujre tora
Nikotete kalshomoy.
Shonar puri andhar kore
Jedin pakhi jabe ure
Shunnokhacha thakbe pore
Ke korbe ar tar joton.
Manush dhoro manush bhojo
Shono bolire pagol mon.
Talashe khalash mele
Talash koro rongmohole
Uthiya hablonger pule
Cheye thako sorbokkhon.
Dekhibe hablonger pule
Dui dikete ogni jwole
Bhebe roshiduddin bole
Chomkiche shorner moton.
গানটির মূল সুর বা থিম হলো মানবতাবাদ এবং আত্মানুসন্ধান। সুফি ও বাউল দর্শনে বিশ্বাস করা হয় যে মানুষের ভেতরেই পরম স্রষ্টার বাস, তাই মানুষকে ভালোবাসলে এবং মানুষের ভজনা করলেই স্রষ্টাকে পাওয়া সম্ভব। এই গানে মানবদেহকে একটি রূপক হিসেবে উপস্থাপন করে বলা হয়েছে যে মানুষের হৃদয়ের ভেতরেই স্রষ্টা বিরাজমান এবং তাঁর চরণে সমগ্র জগৎ লুটিয়ে পড়ে। সোনার খাঁচাসম এই দেহ ছেড়ে যেদিন প্রাণপাখি উড়ে যাবে, সেদিন এই নশ্বর দেহের আর কোনো মূল্য থাকবে না—এই অমোঘ সত্যটি গানে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
ছন্দ ও শব্দশৈলীর দিক থেকে গানটি ঐতিহ্যবাহী বাউল অঙ্গের সরল ও গ্রামীণ ভাষায় রচিত। ‘পঞ্চভূতের ঘাট’, ‘চৌদ্দতালার দালান’, ‘রংমহল’ কিংবা ‘হাবলঙের পুল’-এর মতো শক্তিশালী রূপক শব্দগুলো মানবদেহ এবং পারলৌকিক জগতের রহস্যকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে চিত্রিত করেছে। গানটি মূলত প্রবহমান লোকজ ছন্দে গীত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি অন্ত্যমিলে এক ধরনের গ্রামীণ সারল্য ও সুরের মাধুর্য লুকিয়ে আছে যা সহজেই মন ছুঁয়ে যায়।
এই গানটি অনন্য হওয়ার প্রধান কারণ এর গভীর জীবনমুখী দর্শন এবং বারী সিদ্দিকীর দরাজ ও দরদি গায়কীর অপূর্ব সমন্বয়। গানটি শোনার সময় শ্রোতার মনে এক ধরনের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও আত্মোপলব্ধির উদ্রেক হয়। জাগতিক মোহ ত্যাগ করে মানুষের ভেতরের ঐশ্বরিক সত্তাকে সম্মান করার যে শিক্ষা এই গানে নিহিত রয়েছে, তা যেকোনো বয়সের ও চিন্তাধারার মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
এই নিবন্ধের লিরিক্স এবং জীবনীসংক্রান্ত তথ্যসমূহ ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রের মূল অডিও রিলিজ, বাউল সাধক রশিদ উদ্দিনের লোকগানের সংকলন এবং শিল্পী বারী সিদ্দিকীর বিভিন্ন প্রামাণ্য সাক্ষাৎকার ও আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।
মন্তব্য