সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুলাই ২০২২, ৪:২৫ পিএম
বাংলা আধুনিক গানের জগতে এক অনন্য ও মায়াবী অনুভূতির নাম ‘মেঘ পিওন’। ২০০০ সালের শুরুর দিকে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের কালজয়ী সিনেমা ‘তিতলি’-র অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় গান এটি। এই অসাধারণ গানটির গীত ও সুর রচনা করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথিতযশা সংগীত পরিচালক ও গীতিকার দেবজ্যোতি মিশ্র। ওপার বাংলার প্রখ্যাত ও জনপ্রিয় আধুনিক সংগীতশিল্পী শ্রীকান্ত আচার্যের মায়াবী ও আবেগঘন কণ্ঠে গানটি শ্রোতাদের মনের গভীরে এক চিরস্থায়ী জায়গা করে নেয়।
চলচ্চিত্রে গানটির ব্যবহার ও এর কাব্যিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত নিখুঁত। সিনেমার গল্পে কিশোরী তিতলির অবুঝ প্রেম, ভালোলাগা এবং পাহাড় ঘেরা প্রকৃতির সাথে মানুষের মনের একাকীত্বের যে সমীকরণ, তা দেবজ্যোতি মিশ্র তাঁর লেখনী ও সুরে ফুটিয়ে তুলেছেন। মেঘকে চিঠির বাহক বা ‘পিওন’ হিসেবে কল্পনা করে মানুষের ভালোলাগা ও মন খারাপের বার্তা আদান-প্রদানের এই অনন্য রূপকটি বাংলা গানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। মুক্তির পর থেকে আজ পর্যন্ত যেকোনো মেঘলা দিনে বা বিষণ্ন মুহূর্তে এই গানটি সংগীতপ্রেমীদের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে রয়েছে।
Table of Contents
মেঘ পিওনের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা
মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়, ব্যাকুল হলে তিস্তা।
মন খারাপের খবর আসে বনপাহাড়ের দেশে
চৌকোণো সব বাক্সে যেথায় যে মন থাক সে
মন খারাপের খবর পড়ে দারুণ ভালোবেসে।
মেঘের ব্যাগের ভেতর ম্যাপ রয়েছে, মেঘ পিওনের পাড়ি
পাকদণ্ডী পথ বেয়ে তার বাগান ঘেরা বাড়ি।
বাগান শেষে সদর দুয়ার, বারান্দাতে আরাম চেয়ার
গালচে পাতা বিছানাতে ছোট্ট রোদের ফালি
সেথায় এসে মেঘ পিওনের সমস্ত ব্যাগ খালি।
দেয়াল জুড়ে ছোট্ট রোদের ছায়া বিশাল কায়
নিষ্পলকে ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে আছে ঠায়
কীসের অপেক্ষায়।
রোদের ছুরি ছায়ার শরীর কাটছে অবিরত
রোদের বুকের ভেতর ক্ষত
সেই বুকের থেকে টুপ টুপ টুপ নীল কুয়াশা ঝরে
আর মন খারাপের খবর আসে আকাশে মেঘ করে
সারা আকাশ জুড়ে।
মেঘের দেশে রোদের বাড়ি পাহাড় কিনারায়
যদি মেঘ পিওনের ডাকে সেই ছায়ার হদিশ থাকে
রোদের ফালি তাকিয়ে থাকে আকুল আকাঙ্ক্ষায়
কবে মেঘের পিঠে আসবে খবর বাড়ির বারান্দায়
ছোট্ট বাগানটায়।
Megh pioner bager bhetor mon kharaper dista
Mon kharap hole kuasha hoy, byakul hole teesta.
Mon kharaper khobor ashe bon paharer deshe
Choukono sob bakshe jethay je mon thak se
Mon kharaper khobor pore darun bhalobese.
Megher bager bhetor map royeche, megh pioner pari
Pakdondi poth beye tar bagan ghera bari.
Bagan sheshe sodor duar, barandate aram chair
Galche pata bichanate chhotto roder fhali
Sethay eshe megh pioner somosto bag khali.
Deyal jure chhotto roder chhaya bishalkay
Nishpoloke byakul chokhe takiye ache thay
Kisher opekhay.
Roder chhuri chhayar shorir katche obiroto
Roder buker bhetor khoto
Sei buker theke tup tup tup neel kuasha jhore
Ar mon kharaper khobor ashe akashe megh kore
Sara akash jure.
Megher deshe roder bari pahar kinaray
Jodi megh pioner dake sei chhayar hodish thake
Roder fhali takiye thake akul akankhay
Kobe megher pithe ashbe khobor barir baranday
Chhotto bagantay.
গানটির সুরের ধরন মূলত আধুনিক বাংলা মেলোডি ও ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল ঘরানার এক অপূর্ব মিশ্রণ। দেবজ্যোতি মিশ্র পাহাড়ের আবহ ফুটিয়ে তুলতে এক ধরনের অপার্থিব আবহ সংগীত বা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর তৈরি করেছেন। অ্যাকোস্টিক গিটার, বাঁশি এবং ভায়োলিনের সুনিপুণ ব্যবহার গানটিতে একধরনের শান্ত অথচ গভীর বিষাদময় সুরের জন্ম দিয়েছে, যা বাংলা আধুনিক গানের সমসাময়িক ধারা থেকে একে সম্পূর্ণ আলাদা করে তোলে।
এই গানের মূল ভাব মানুষের মনের একাকীত্ব, অপ্রাপ্তি, অপেক্ষা এবং প্রকৃতির সাথে মনের ভাবগত সংযোগকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। মানুষের মন খারাপের অনুভূতিকে এখানে প্রকৃতির সাথে মেলানো হয়েছে—যেমন মন খারাপ হলে তা পাহাড়ি কুয়াশার রূপ নেয়, আর মন ব্যাকুল হলে তা তিস্তা নদীর তীব্র স্রোতের মতো বয়ে চলে। রোদ এবং ছায়ার যে চিরন্তন যুদ্ধ ও সহাবস্থান, তার মাধ্যমে মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব ও আকাঙ্ক্ষার রূপক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পাহাড়ি নির্জনতায় এক চিলতে রোদের ফালির মতো আনন্দের জন্য মানুষের যে চিরন্তন অপেক্ষা, তা-ই এই গানের মূল উপজীব্য।
শ্রীকান্ত আচার্যের গায়কী এবং দেবজ্যোতি মিশ্রের মিউজিক কম্পোজিশন এই গানটির প্রধান বিশেষত্ব। শ্রীকান্ত আচার্যের কণ্ঠের স্বাভাবিক মায়াবী কোমলতা ও স্পষ্ট উচ্চারণ প্রতিটি শব্দকে শ্রোতার সামনে দৃশ্যমান করে তোলে। গানের অন্তরায় সুরের ধীর লয় থেকে হঠাৎ তীব্রতায় পৌঁছানো এবং শেষে আবার এক শান্ত আবহে ফিরে আসা শ্রোতার মনে গভীর এক আবেশ সৃষ্টি করে। পাহাড়, মেঘ, রোদ আর মন খারাপের এমন কাব্যিক ও সুরেলা মেলবন্ধন বাংলা চলচ্চিত্রে সত্যিই বিরল।
উৎস (Sources)
এই নিবন্ধের যাবতীয় তথ্য ‘তিতলি’ চলচ্চিত্রের মূল ক্রেডিট লাইন, সংগীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্রের সাক্ষাৎকার, শ্রীকান্ত আচার্যের অফিশিয়াল ডিসকোগ্রাফি এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রামাণ্য আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।
মন্তব্য