রাগ বেহাগ বা বিহাগ । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসরে গভীর রাতের মায়াবী পরিবেশ তৈরি করার জন্য যদি কোনো রাগ ওস্তাদদের সবচেয়ে প্রিয় হয়ে থাকে, তবে তা হলো ‘রাগ বেহাগ’ (বা বিহাগ)। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রের অন্যতম রোমান্টিক এবং শ্রোতাপ্রিয় রাগ এটি। এই রাগের উৎপত্তির উৎস নিয়ে পণ্ডিতদের মাঝে কিছুটা মতভেদ আছে; কেউ একে ‘কল্যাণ’ ঠাটের মনে করলেও, অধিকাংশ গুণীজনের মতে রাগ বেহাগ মূলত ‘বিলাবল’ ঠাটেরই অন্তর্গত। এর চলনটি চমৎকার—আরোহণে ঋষভ (রে) ও ধৈবত (ধা) স্বর দুটি বর্জিত থাকে বলে এটি ঔড়ব রূপ নেয়, কিন্তু অবরোহণে সাতটি স্বরই ফিরে আসায় এটি পরিণত হয় এক পূর্ণাঙ্গ ‘ঔড়ব-সম্পূর্ণ’ জাতের রাগে।

রাগ বেহাগ বা বিহাগ । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

সুরের চলন ও কড়ি মধ্যমের খেলা:

রাগ বেহাগের এক অদ্ভুত বিবর্তন রয়েছে। প্রাচীনকালে এই রাগে ‘কড়ি মধ্যম’ (হ্ম) স্বরটিকে কেবল বিবাদী স্বর (যা রাগের সৌন্দর্য বাড়াতে সামান্য ব্যবহৃত হয়) হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আধুনিক শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এই কড়ি মধ্যমের ব্যবহার এখন প্রায় নিয়মিত এবং অবধারিত হয়ে উঠেছে।

যখন এই রাগের বিস্তার করা হয়, তখন অবরোহণের সময় নিষাদ (নি) থেকে পঞ্চমে (পা) এবং গান্ধার (গা) থেকে ষড়্‌জে (সা) নামার সময় এক অপূর্ব ‘মীড়’ (এক স্বর থেকে অন্য স্বরে গড়িয়ে যাওয়া) ব্যবহার করা হয়, যা শ্রোতার বুকে এক অদ্ভুত দোলা দেয়। তবে দ্রুত তানের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি খাটে না। আবার এই রাগে যখন ধ্রুপদ অঙ্গের গান গাওয়া হয়, তখন খুব সূক্ষ্মভাবে ‘কোমল নিষাদ’-এর ছোঁয়াও লক্ষ্য করা যায়, যা এর গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

রাগের কারিগরি ও সংক্ষিপ্ত ব্যাকরণ:

  • আরোহণ: ন্ স গ ম প ন র্স
  • অবরোহণ: র্সন ধপ হ্মপ গমগ রস (এখানে ‘হ্ম’ হলো কড়ি মধ্যম)
  • ঠাট: বিলাবল (মতান্তরে কল্যাণ)
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ
  • বাদীস্বর (রাগের প্রধান রাজা): শুদ্ধ গান্ধার (গ)
  • সমবাদী স্বর (রাগের উজির বা মন্ত্রী): শুদ্ধ নিষাদ (ন)
  • অঙ্গ: পূর্বাঙ্গ প্রধান
  • পকড় (রাগের আসল চাবিকাঠি): ন্স, গমপ, গমগ, গা রস।

 

সময়ের মায়াজাল ও শ্রোতার মনস্তত্ত্ব:

রাগ বেহাগের আসল ম্যাজিকটা টের পাওয়া যায় এর পরিবেশনের সময়ে। এই রাগের জন্য ওস্তাদরা বেছে নেন রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (মাঝরাত)।

চারপাশ যখন নিঝুম হয়ে আসে, দিনের ক্লান্তি শেষে পৃথিবী যখন ঘুমে মগ্ন—ঠিক তখনই তানপুরার তারে তারে বেজে ওঠে বেহাগ। এর বাদীস্বর ‘গান্ধার’-এর গভীর চলন আর কড়ি মধ্যমের মায়াবী ছোঁয়া শ্রোতার মনে এক তীব্র ব্যাকুলতা, আধ্যাত্মিক আর্তি এবং এক পরম প্রেমের অনুভূতির জন্ম দেয়। এটি এমন এক রাগ যা একাধারে মিলন এবং বিরহ—উভয় আবেগকেই খুব চমত্কারভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে। মাঝরাতের স্তব্ধতায় বেহাগের প্রতিটি সুর যেন মানুষের অন্তরাত্মার গোপন কোনো হাহাকারকে পরম শান্তিতে রূপান্তর করে দেয়।

তথ্যসূত্র ও আকর গ্রন্থ:

আপনার এই গবেষণাধর্মী লেখাটির নির্ভরযোগ্যতা ধরে রাখতে প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞদের এই আকর গ্রন্থগুলোর সাহায্য নেওয়া হয়েছে:

১. মগনগীত ও তানমঞ্জরী (প্রথম খণ্ড) — চিন্ময় লাহিড়ী (১লা বৈশাখ, ১৩৯২ / ১৪ এপ্রিল, ১৯৮৫)।

২. রাগ বিজ্ঞান অভিধান — নিত্যানন্দ কর্মকার। প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স (ফেব্রুয়ারি ২০০৭)।

৩. রাগ বিন্যাস (প্রথম কলি) — শ্রীশচীন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য্য। এস, চন্দ্র অ্যান্ড কোং (শারদীয়া সপ্তমী, সেপ্টেম্বর ১৯৭৬)।

৪. সঙ্গীতশাস্ত্র (দ্বিতীয় খণ্ড) — ইন্দুভূষণ রায় (শুভ মহালয়া, ১৯শে আশ্বিন, ১৩৭৯)।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।