হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে কিছু রাগ আছে যা অত্যন্ত কম সংখ্যক স্বর ব্যবহার করে এক অলৌকিক ও মায়াবী পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তেমনই এক অনন্য, সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী রাগের নাম ‘রাগ মালশ্রী’। সাধারণত কল্যাণ ঠাটের রাগগুলো অনেক স্বর নিয়ে খেললেও, এই রাগটি তার ব্যতিক্রমী ও মিতব্যয়ী স্বর বিন্যাসের কারণে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের পণ্ডিতদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
রাগ মালশ্রী: মাত্র কয়েকটি স্বরের জাদুতে ঘেরা এক অনন্য সন্ধ্যার সুর
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ব্যাকরণে সুরের বৈচিত্র্য তৈরি করতে সাধারণত অনেক স্বরের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ‘রাগ মালশ্রী’ প্রমাণ করে যে, মাত্র ৩টি মূল স্বরের ওপর ভিত্তি করেও কতটা চমৎকার একটি রাগ গড়ে তোলা সম্ভব। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে এটি কল্যাণ ঠাটের অন্তর্গত একটি বিশেষ রাগ।
এই রাগের মূল কাঠামোটি দাঁড়িয়ে আছে মূলত ষড়্জ (স), গান্ধার (গ) এবং পঞ্চম (প)—এই তিনটি স্বরের ওপর ভিত্তি করে। রাগের চলনে তীব্র মধ্যম (হ্ম) এবং নিষাদ (ন) স্বর দুটিকে কেবল ‘সহায়ক স্বর’ হিসেবে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যবহার করা হয়।
রাগ মালশ্রী-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী এই রাগের মূল কাঠামো ও প্রযুক্তিগত পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো:
- ঠাটের পরিচয় (Thaat): রাগটি কল্যাণ ঠাটের অন্তর্গত।
- জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো ঔড়ব-ঔড়ব। অর্থাৎ, এর আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই পাঁচটি করে স্বর ব্যবহৃত হয়।
- বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো পঞ্চম (প)।
- সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো ষড়্জ (সা)।
- অঙ্গ (Anga): এটি একটি পূর্বাঙ্গ প্রধান রাগ।
- পরিবেশনের সময় (Time): এই রাগ গাওয়ার বা বাজানোর আদর্শ সময় হলো সন্ধ্যাকাল। গোধূলির আলো-আঁধারিতে এই রাগের শান্ত রূপটি শ্রোতার মনে গভীর প্রশান্তি এনে দেয়।
আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়
রাগের সেই মিতব্যয়ী ও সুনিপুণ চলনটি স্বরলিপির মাধ্যমে বোঝার জন্য এর নিখুঁত রূপ নিচে দেওয়া হলো:
- আরোহণ: স গ হ্ম প ন র্স
- অবরোহণ: র্স ন প, হ্ম, গ ম, স
- পকড় (রাগের মূল রূপ): ম র ন্ স, র হ্ম প, ধ প, ম র ন্ স
(নোট: এখানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী ‘হ্ম’ দিয়ে তীব্র মধ্যমকে নির্দেশ করা হয়েছে।)
তথ্যসূত্র
এই রাগের ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয় শুদ্ধতা বজায় রাখতে প্রামাণ্য দুটি উৎসের সহায়তা নেওয়া হয়েছে:
১. ‘উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত’ – শক্তিপদ ভট্টাচার্য (নাথ ব্রাদার্স; ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭)।
২. ‘হিন্দুস্থানী সংগীত পদ্ধতি’ (দশম খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে (বঙ্গানুবাদ: অসীমকুমার চট্টোপাধ্যায়; কার্তিক ১৩৯৮)।
রাগ মালশ্রী আমাদের শেখায় যে, জটিলতা ছাড়াই সুরের আসল মাধুর্যকে ছোঁয়া সম্ভব। সন্ধ্যার শান্ত পরিবেশে এই রাগের আলাপে যে গভীরতা তৈরি হয়, তা যেকোনো সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের মনকে এক লহমায় শান্ত করে দেয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।














