রামতনু থেকে মিয়াঁ তানসেন : ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী জ্যোতিষ্ক

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বাধিক প্রভাবশালী এবং সর্বকালব্যাপী উজ্জ্বল যে নামটি সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন মিয়াঁ তানসেন। সম্রাট আকবরের রাজসভায় নবরত্নদের একজন হিসাবে তাঁর প্রতিষ্ঠা তাঁকে উপমহাদেশের সঙ্গীতধারার মূল স্তম্ভে পরিণত করেছে। ধ্রুপদ গানের পুনরুত্থান, রাগসৃষ্টি, যন্ত্র–উন্নয়ন, গায়কির নান্দনিকতা—এসব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান এত গভীর যে তাঁকে যথার্থই বলা হয় “সঙ্গীত–সম্রাট”

শিল্পী তানসেন । শিল্পী জীবনী

 

শিল্পী তানসেন । শিল্পী জীবনী

 

জন্ম ও বংশপরিচয়

তানসেনের প্রকৃত নাম ছিল রামতনু পাণ্ডে। তাঁর পিতা মুকুন্দ পাণ্ডে (বা কারো মতে মকরন্দ পাণ্ডে) ছিলেন মধ্যভারতের গ্বালিয়র অঞ্চলের এক ধর্মপ্রাণ ও সংগীতাধ্যয়ন–প্রিয় পুরোহিত।

তাঁর জন্মসাল সম্বন্ধে ঐতিহাসিকদের মতভেদ রয়েছে—

  • কেউ বলেন ১৫০৬ খ্রিস্টাব্দ
  • কেউ বলেন ১৫২০ খ্রিস্টাব্দ

তবে বহু যুক্তিতর্ক বিশ্লেষণ করে সঙ্গীত–গবেষক ড. বিমল রায় তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ “ভারতীয় সঙ্গীত প্রসঙ্গ”–এ তানসেনের জন্মসাল ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দ নির্ধারণ করেছেন। প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।

 

 

Google news
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

শৈশব ও কিংবদন্তি প্রতিভার উদ্ভব

তানসেনের শৈশব নানা কাহিনি–সমৃদ্ধ। কথিত আছে, শৈশবে তাঁর কণ্ঠ প্রাণীদের আওয়াজ নকল করতে পারত। তিনি অরণ্যে বাস করতেন এবং বাঘ–চিতাবাঘের ডাক নকল করতেন। তাঁর এই কণ্ঠশক্তি লক্ষ্য করেছিলেন সেই সময়ের মহাসাধক স্বামী হরিদাস, যিনি বৃন্দাবনের বৈষ্ণব সঙ্গীতচর্চার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুরু। হরিদাস তাঁর অপূর্ব প্রতিভাকে চিনে তাঁকে গুরু–শিষ্য পরম্পরায় গ্রহণ করেন।

তানসেনের আরেক গুরু ছিলেন সুফী সঙ্গীতজ্ঞ মুহম্মদ গাউস, যিনি তাঁকে ধর্মীয় সঙ্গীত, ধ্যানসংগীত, কণ্ঠসাধনা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন।

 

শিল্পী তানসেন । শিল্পী জীবনী

 

গুরুদের প্রভাব : দুই ধারার সম্মিলন

  • স্বামী হরিদাস তাঁকে ধ্রুপদ, রাগরূপ, ব্রজ–সংগীত, রসতত্ত্ব শেখান
  • মুহম্মদ গাউস তাঁকে সুফী সঙ্গীত, কণ্ঠরিয়াজ, গভীর আবেগ প্রকাশের কৌশল শেখান

এর ফলে তাঁর গায়কিতে হিন্দু–মুসলিম সাংস্কৃতিক ধারার এক বিরল মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়।

বিবাহ ও ধর্মান্তর

গোয়ালিয়র রাজপরিবারের রানি মৃগনয়নী প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর সঙ্গে তানসেন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সেই ছাত্রী পূর্বে মারাঠি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মালেও সামাজিক নিপীড়নের কারণে পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাই তানসেনকেও ইসলাম গ্রহণ করতে হয়। এসময় তাঁর নতুন নাম হয়— আতা আলি খান (Atta Ali Khan)। তবে তিনি “মিয়াঁ তানসেন” উপাধিতেই ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

আকবরের দরবারে আগমন : সঙ্গীত–সম্রাটের আবির্ভাব

প্রথম দিকে তানসেন রেওয়ার রাজা রামচন্দ্রের দরবারে সঙ্গীতগুরু হিসেবে কাজ করতেন। সেখানে এক অনুষ্ঠানে আকবর তাঁর গান শোনেন এবং মুগ্ধ হয়ে তাঁকে সম্রাটের দরবারে নিয়ে আসার অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে তানসেন আনুষ্ঠানিকভাবে আকবরের সভাগায়ক হন।

সম্রাট আকবর তাঁকে—

  • নবরত্নের একজন ঘোষণা করেন
  • “তানসেন” উপাধি প্রদান করেন
  • স্বর্ণমাল্য, রত্নদানি এবং উচ্চ আসন দিয়ে সম্মানিত করেন

তানসেন ছিলেন আকবরের সবচেয়ে প্রিয় শিল্পী; আকবর প্রায়ই তাঁর গান শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন।

তানসেনের কিংবদন্তি অলৌকিক ক্ষমতা

তাঁর সম্পর্কে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত, যেমন—

১. রাগ দীপক গেয়ে আগুন জ্বালানো

রাগ দীপক গাইলে – পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠত, প্রদীপ নিজে নিজে জ্বলে উঠত— এমন কথা প্রচলিত।

২. রাগ মেঘমল্লার গেয়ে বৃষ্টি নামানো

তানসেনের কণ্ঠে মেঘমল্লার শুনে – আকাশে মেঘ জমত, বৃষ্টি নেমে আসত।

৩. বন্য পশু শান্ত করা

শোনা যায় তাঁর সঙ্গীতে বনের পশুও শান্ত হয়ে যেত।

ইতিহাসবিদরা এসবকে প্রতীকী কিংবদন্তি মনে করলেও, তাঁর সঙ্গীতশক্তির মাহাত্ম্য ব্যাখ্যায় এগুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

তানসেনের সৃষ্ট রাগসমূহ

তানসেন বহু নতুন রাগ সৃষ্টি করেন। এর মধ্যে বিখ্যাত—

  • দরবারী কানাড়া (সবচেয়ে পরিচিত)
  • মিয়া কি মল্লার
  • মিয়া কি সারং
  • মিয়া কি টোড়ি (Todi)
  • বিলাসখানি টোড়ি (তাঁর পুত্র বিলাস খাঁর সৃষ্টি বলে জানা যায়)

এ রাগগুলি আজও হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূলধারায় সর্বোচ্চ মর্যাদা পায়।

ধ্রুপদ গানের উন্নয়ন

তানসেন—

  • ধ্রুপদ গানের চার ভাগ স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ নির্ধারণ করেন
  • রাগে সাত স্বরের সঙ্গে আট–নয়টি স্বরের ব্যবহার প্রচলন করেন
  • ধ্রুপদকে তিনি রাজসভায় সর্বোচ্চ মর্যাদা এনে দেন

এখনকার ধ্রুপদ গায়কি মূলত তানসেনের রীতি অনুসরণ করে।

যন্ত্রসংগীতে অবদান

তানসেনকে বলা হয় রুদ্রবীণা ও রবাবের উন্নত রূপকার এবং তিনি স্বয়ং ছিলেন অপূর্ব রুদ্রবীণা–বাদক। তিনি রবাব–বাদনেও দক্ষ ছিলেন।

পরিবার

তাঁর ৪ পুত্র এবং ১ কন্যা ছিল—

  • তানতরঙ্গ
  • সুরৎ সেন
  • বিলাস খাঁ
  • শরৎ সেন
  • কন্যা স্বরস্বতী

এদের প্রত্যেকেই ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ। তাঁদের মধ্যেই তানসেনের ঘরানা ও রাগসংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে বিকশিত হয়।

মৃত্যু

তানসেনের মৃত্যুসাল সম্পর্কেও বিতর্ক আছে—

  • কেউ বলেন ১৫৮৯ খ্রিস্টাব্দ
  • কেউ বলেন ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দ

তিনি আজও গোয়ালিয়রের “তানসেন সমাধি”–তে সমাহিত বলে জানা যায়, যেখানে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক তানসেন সঙ্গীত উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

Leave a Comment