ভারতের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকরের জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লতার অসাধারণ কণ্ঠ, সংগীতপ্রতিভা এবং ভারতীয় সংগীতে তার দীর্ঘস্থায়ী অবদানের কথা স্মরণ করেন।
মোদি বলেন, লতা মঙ্গেশকরের অনন্য কণ্ঠ ও গানের প্রতিভা ভারতের পরিচিতিকে বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার সংগীত শুধু ভারতীয় সংগীতভাণ্ডারকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার সংগীত ও অবদান স্মরণ করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে জন্মগ্রহণ করেন লতা মঙ্গেশকর। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সংগীতে তিনি হয়ে ওঠেন অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠশিল্পী। ১৯৪০-এর দশকে শুরু হওয়া তার দীর্ঘ সংগীতজীবন কয়েক দশক ধরে হিন্দি চলচ্চিত্রের গানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। একই সঙ্গে মারাঠি ভাষাসহ ভারতের বিভিন্ন ভাষার গানেও তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন।
বহুমাত্রিক সংগীতপ্রতিভার অধিকারী লতা মঙ্গেশকর রোমান্টিক গান, বিরহের গান, ভক্তিমূলক সংগীত থেকে শুরু করে দেশাত্মবোধক গান—বিভিন্ন ধারায় নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন। ‘আয়েগা আনেওয়ালা’, ‘লাগ যা গলে’, ‘পেয়ার কিয়া তো ডরনা কেয়া’ এবং ‘অ্যাই মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ’-এর মতো গান ভারতীয় সংগীতের স্মরণীয় সৃষ্টির তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
এর মধ্যে ‘অ্যাই মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ’ গানটির সঙ্গে ভারতের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির একটি বিশেষ যোগ রয়েছে। ১৯৬৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর উপস্থিতিতে গানটি পরিবেশন করেন লতা মঙ্গেশকর। তার আবেগঘন পরিবেশনা গানটিকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয় এবং পরবর্তী সময়ে এটি ভারতের জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে লতা মঙ্গেশকর ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক সম্মান অর্জন করেন। ২০০১ সালে তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ দেওয়া হয়। এর আগে তিনি পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ এবং দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি লাভ করেন।
তার সংগীতজীবনের ব্যাপ্তি শুধু পুরস্কার বা চলচ্চিত্রের গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কয়েক দশক ধরে তার কণ্ঠ ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রের পর্দায় নায়িকাদের কণ্ঠ হিসেবে তার গান যেমন জনপ্রিয় হয়েছে, তেমনি চলচ্চিত্রের বাইরেও তার পরিবেশনা শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
লতা মঙ্গেশকর ২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে ৯২ বছর বয়সে মারা যান। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারতীয় সংগীতের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তবে তার রেকর্ড করা গান, কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য এবং কয়েক দশকের সংগীতকর্ম এখনও ভারতীয় সংগীতের গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়।
জন্মবার্ষিকীতে নরেন্দ্র মোদির শ্রদ্ধা নিবেদন সেই দীর্ঘ সংগীতযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অবদানের কথাই নতুন করে সামনে এনেছে। লতা মঙ্গেশকরের গান এখনও বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পরিচিত। তার কণ্ঠ ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে যে স্থায়ী জায়গা তৈরি করেছে, জন্মবার্ষিকীর এই স্মরণ সেই উত্তরাধিকারের কথাই মনে করিয়ে দেয়।















