সঙ্গীতের প্রাগৈতিহাসিক কাল বলতে সাধারণত আমরা ইতিহাসলিপির পূর্ববর্তী সেই সময়কালকে বুঝি, যখন মানবসমাজ ছিল শিকারি ও কৃষিভিত্তিক (hunter and farmer) জীবনধারায় অভ্যস্ত। তবে এই সময়ের বিস্তার কতদূর পর্যন্ত, সে বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। ফলস্বরূপ, এ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আজও সম্ভব হয়নি।
ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ ড. এল. এস. বি. লিকি (Dr. L. S. B. Leakey) তানজানিয়ার Olduvai Gorge এলাকায় খননকার্যের মাধ্যমে প্রাপ্ত জীবাশ্ম (fossil) বিশ্লেষণ করে ধারণা দেন যে, মানবজাতির বিকাশ ঘটেছে প্রায় ১৮ লক্ষ বছর আগে। তাঁর মতে, অনুরূপ জীবাশ্ম ভারতবর্ষের Soan, পিকিংয়ের নিকটবর্তী Chou-kou-tien এবং জাভা দ্বীপেও পাওয়া গেছে [Prehistoric and Primitive Man – Dr. Andreas Lommel]। এ তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা যায় যে মানবজাতির বিকাশ এই অঞ্চলগুলোতে সুদীর্ঘ ১৮ লক্ষ বছর আগে ঘটেছিল।
Table of Contents
সঙ্গীতের প্রাগৈতিহাসিক কাল । সঙ্গীতের ইতিহাস
ভারতীয় সভ্যতার প্রারম্ভ ও সাংস্কৃতিক বিস্তার
ভারতীয় সভ্যতার আদিভূমি নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও সিন্ধু উপত্যকা (Indus Valley) যে এর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল, সে বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। এখানেই স্থাপিত হয়েছিল বিশ্বের প্রাচীনতম নগরগুলোর মধ্যে হরপ্পা (পাঞ্জাব) ও মহেঞ্জোদড়ো (সিন্ধু)। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে প্রায় ৩৭০ মাইলের মধ্যে এই ধরনের উন্নত ও সুপরিকল্পিত আরও প্রায় একশত নগর আবিষ্কৃত হয়েছে।
ধারণা করা হয়, প্রথম আক্রমণকারী আর্যরা পারস্য থেকে ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবেশ করে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে এবং তারা খ্রিস্টপূর্ব ৩য়–২য় সহস্রাব্দের এই নগরগুলিকে ধ্বংস করে। পরবর্তীতে তারা ধীরে ধীরে সিন্ধু ও গাঙ্গেয় উপত্যকা জুড়ে বসতি বিস্তার করে।
আর্যদের মাধ্যমেই ভারতবর্ষে সংস্কৃত ভাষা, বৈদিক সংস্কৃতি এবং প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটে [Jeannine Auboyer – The Oriental World: Roger Goepper; Landmarks of the World’s Art, 1971]।
প্রাগৈতিহাসিক সঙ্গীতের সময়সীমা ও বৈশিষ্ট্য
সঙ্গীত ইতিহাসের আলোচনায় এই গ্রন্থে প্রাগৈতিহাসিক কালকে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ থেকে ৩০০০ অব্দ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে প্রাপ্ত বাঁশি, মৃদঙ্গ, ভিন্ন সংখ্যক তারযুক্ত বীণা, ব্রোঞ্জের নৃত্যশীল নারীমূর্তি ইত্যাদি নিদর্শন থেকে গবেষকরা তৎকালীন সঙ্গীত সম্পর্কে নানা মত প্রকাশ করেছেন।
কিছু গবেষকের মতে, সে সময়ের সঙ্গীত জীবনের বিভিন্ন সামাজিক ও আচারিক পর্বে ব্যবহৃত হতো—যেমন জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, শিকার, রোগ নিরাময়, পূজা ও যুদ্ধ। এমনকি সঙ্গীতের প্রভাবে অলৌকিক ঘটনাও ঘটতে পারে—এমন ধারণা তখনকার সমাজে প্রচলিত ছিল। এই ধরনের বিশ্বাস এখনও কিছু যাযাবর বা বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যেও দেখা যায়।
সঙ্গীত ও ভাষার যৌথ উৎস
জার্মান সঙ্গীততাত্ত্বিক ড. এরউইন ফেলবার (Dr. Erwin Felber) তৎকালীন সঙ্গীত সম্পর্কে বলেন—
“Speech and music have descended from a common origin, in a primitive language, which was neither speaking nor singing but something both.”
(বক্তৃতা ও সঙ্গীতের উৎস এক; এটি এমন এক আদিম ভাষা, যা ছিল না কেবল কথা বলা, না কেবল গান, বরং উভয়েরই মিশ্র রূপ।)
[The Indian Music of the Vedic and the Classical Period, 1912]
প্রাগৈতিহাসিক সঙ্গীতের সুরতাল
খননকার্যে প্রাপ্ত বাদ্যযন্ত্রের পর্যালোচনায় বহু গবেষকই একমত হয়েছেন যে, তৎকালীন সঙ্গীতে অন্তত চারটি স্বরের ব্যবহার ছিল। এই প্রাথমিক স্বরধারা পরবর্তীতে সংগঠিত রাগ, রাগিণী ও জটিল সুরসংগঠনের ভিত্তি তৈরি করে, যা প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিকাশে ভূমিকা রাখে।
