সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জুন ২০২৬, ১২:১৪ পিএম

বাংলা গানের জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম লাকী আখন্দ। তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত সুরকার, সংগীত পরিচালক, গায়ক এবং আধুনিক বাংলা গানের অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর সৃষ্টি করা সুরের আলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতাদের পথ দেখিয়ে আসছে। তাঁর অনন্য সুর, সংগীতায়োজন এবং কণ্ঠের জাদু বাংলা গানকে এক নতুন মাত্রা ও গভীর আবেদন এনে দিয়েছে। তাঁর সৃষ্টি করা ‘এই নীল মনিহার’, ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ এবং ‘আমায় ডেকো না’—এর মতো কালজয়ী গানগুলো আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে ঠিক একই রকম আবেগ ও আবেদন জাগিয়ে রাখে, যেমনটা জাগিয়েছিল গানগুলো প্রথম প্রকাশের দিনে।
১৯৫৬ সালের ৭ জুন পুরান ঢাকার পাতলা খান লেনে এই মহান শিল্পীর জন্ম হয়। সংগীত ছিল তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য এবং রক্তে মিশে থাকা এক গভীর উত্তরাধিকার। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ শুরু করেন। শৈশবকালেই তিনি টেলিভিশন এবং বেতারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শুরু করেন এবং অত্যন্ত অল্প বয়সেই নিজের অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। তাঁর এই প্রতিভা সময়ের সাথে সাথে আরও বিকশিত হতে থাকে।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি এইচএমভি পাকিস্তানের সুরকার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান এবং ১৬ বছর বয়সে এইচএমভি ভারতের সংগীত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন। এত অল্প বয়সে এই ধরনের আন্তর্জাতিক স্তরের স্বীকৃতি লাভ করা বাংলা গানের ইতিহাসে সত্যিই একটি বিস্ময়কর অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল থেকে ‘বাংলা আধুনিক গান’ বিভাগে মর্যাদাপূর্ণ পদক লাভ করেন।
১৯৭৫ সালে লাকী আখন্দ তাঁর ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের একটি অ্যালবামের সংগীতায়োজন করেন। সেই বিখ্যাত অ্যালবামে স্থান পেয়েছিল ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’, ‘কে বাঁশি বাজায় রে’, ‘ can স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে’ এবং ‘পাহাড়ি ঝর্ণা’—এর মতো অত্যন্ত জনপ্রিয় কিছু গান। পরবর্তীকালে ১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী পরিচালিত ‘ঘুড্ডি’ নামক চলচ্চিত্রে ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গানটি ব্যবহার করা হলে তা সমগ্র দেশজুড়ে বিপুল সাড়া ফেলে এবং বাংলা গানের ইতিহাসে এক স্থায়ী আসন লাভ করে। ১৯৮৪ সালে দেশের একটি অন্যতম প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়, যার নাম ছিল ‘লাকী আখন্দ’। তিনি দেশের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় বেতার কেন্দ্রের সংগীত বিভাগের পরিচালক হিসেবেও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৭ সালে তাঁর প্রিয় ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের অকালমৃত্যু লাকী আখন্দকে মানসিকভাবে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। এই শোকের কারণে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সংগীতচর্চা এবং সুরের ভুবন থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে থাকেন। প্রায় এক যুগ ধরে নীরব থাকার পর, ১৯৯৮ সালে ‘পরিচয় কবে হবে’ এবং ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ নামক অ্যালবামের সংগীতায়োজনের মাধ্যমে তিনি আবারও গানের জগতে সগৌরবে প্রত্যাবর্তন করেন।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে এই কিংবদন্তি শিল্পী দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের মারাত্মক ক্যান্সারের সাথে লড়াই করেছেন। অবশেষে ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু প্রকৃত শিল্পীর কখনোই মৃত্যু হয় না, তাঁর সৃষ্টি চিরকাল বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে।
| বিষয়ের বিবরণ | তথ্য ও কালানুক্রম |
| জন্ম স্থান ও তারিখ | ৭ জুন ১৯৫৬, পুরান ঢাকা |
| প্রাথমিক সংগীত শিক্ষা | পাঁচ বছর বয়সে বাবার কাছে শুরু |
| পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল পদক | ১৯৬৯ সাল |
| প্রথম একক অ্যালবাম প্রকাশ | ১৯৮৪ সাল |
| চলচ্চিত্রে গানের ব্যবহার | ১৯৮০ সাল (চলচ্চিত্র: ঘুড্ডি) |
| সংগীত ভুবনে প্রত্যাবর্তন | ১৯৯৮ সাল |
| মৃত্যুর তারিখ ও কারণ | ২১ এপ্রিল ২০১৭, ফুসফুসের ক্যান্সার |
মন্তব্য