স্মরণ – বাংলা গানের কিংবদন্তি শচীন দেব বর্মণ

বাংলা ও উপমহাদেশের সংগীতভুবনে শচীন দেব বর্মণ এমন এক নাম, যাঁর সৃষ্টিকে সময়ের গণ্ডিতে আটকে রাখা যায় না। তাঁর কণ্ঠে ছিল মাটির টান, সুরে ছিল লোকজ জীবনের সহজ সৌন্দর্য, আর সংগীত পরিচালনায় ছিল শাস্ত্রীয় সংগীত ও আধুনিকতার অনন্য সমন্বয়। ১ অক্টোবর তাঁর জন্মদিনে তাই বারবার ফিরে আসে সেই কিংবদন্তি শিল্পীর কথা, যিনি কুমিল্লার মাটি থেকে উঠে গিয়ে ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

‘শোনো গো দখিনা হাওয়া’ তাঁর জনপ্রিয় সৃষ্টিগুলোর একটি। গানটির কথা লিখেছিলেন তাঁর সহধর্মিণী মীরা দেব বর্মণ। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত পূজার গানের সংকলনে গানটি স্থান পায়। শচীন দেব বর্মণের নিজস্ব কণ্ঠ ও সুরে গানটি আজও বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে বিশেষ আবেগের নাম। দক্ষিণা বাতাস, প্রকৃতি ও বাংলার মাটির সঙ্গে মানুষের অনুভূতির যে মেলবন্ধন তাঁর গানে পাওয়া যায়, এই গানেও তার পরিচয় মেলে।

১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত কুমিল্লার চর্থা এলাকায় শচীন দেব বর্মণের জন্ম। তাঁর বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেব বর্মণ ছিলেন ত্রিপুরা রাজপরিবারের সদস্য এবং সংগীতসাধক। বাবার কাছেই শচীন দেব বর্মণের সংগীতে হাতেখড়ি। ছোটবেলা থেকেই তিনি লোকগান, ভাটিয়ালি, বাউল ও বিভিন্ন আঞ্চলিক সুরের সঙ্গে পরিচিত হন। কুমিল্লার নদী, গ্রামবাংলার জীবন এবং মানুষের সহজ অনুভূতি পরবর্তী সময়ে তাঁর সংগীতের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

তবে পারিবারিক সংগীতপরিবেশই তাঁর একমাত্র অবলম্বন ছিল না। শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিতে তিনি কলকাতায় যান এবং কৃষ্ণচন্দ্র দে-র কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, বাদল খান ও উস্তাদ আলাউদ্দিন খানের মতো বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞদের কাছ থেকেও তিনি তালিম নেন। ফলে তাঁর সংগীতে যেমন শাস্ত্রীয় সংগীতের শৃঙ্খলা ছিল, তেমনি ছিল লোকজ সুরের স্বাভাবিক প্রাণস্পন্দন।

সংগীতজীবনের শুরুতে তিনি বাংলা গানের শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরে ধীরে ধীরে তাঁর কাজের পরিধি বিস্তৃত হয় এবং তিনি পা রাখেন চলচ্চিত্রের জগতে। কলকাতার পর বোম্বাইয়ের চলচ্চিত্রশিল্পে তাঁর উত্থান তাঁকে উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী সুরকারে পরিণত করে। বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর সংগীত পরিচালনা অসংখ্য জনপ্রিয় গানকে জন্ম দিয়েছে।

‘শচীন কর্তা’ নামে বাংলার শ্রোতাদের কাছে পরিচিত এই শিল্পীর সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, গীতা দত্ত, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মুকেশ, তালাত মাহমুদসহ বহু খ্যাতিমান শিল্পী। তাঁর সুরের বিশেষত্ব ছিল সহজ অথচ গভীর আবেগ। জটিল সংগীতায়োজনের পরিবর্তে তিনি অনেক সময় সুরের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও কণ্ঠের আবেগকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘পেয়াসা’, ‘কাগজ কে ফুল’, ‘গাইড’, ‘আরাধনা’ ও ‘অভিমান’-এর মতো চলচ্চিত্র। এসব কাজের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু জনপ্রিয় গান উপহার দেননি, চলচ্চিত্রের গল্প, চরিত্র ও আবেগের সঙ্গে সংগীতকে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছিলেন। বাংলা গানের ক্ষেত্রেও ‘সুন্দরী কমলা’, ‘সাজনী গো’, ‘কেন প্রীতম’ ও ‘ওরে সুজন নাইয়া’-র মতো গান তাঁর বহুমাত্রিক সংগীতপ্রতিভার পরিচয় বহন করে।

তাঁর সংগীতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল স্বাতন্ত্র্য। বাংলার লোকসুরকে তিনি কখনো নিছক অতীতের স্মৃতি হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং তা আধুনিক সংগীতের কাঠামোর সঙ্গে মিশিয়ে নতুন রূপ দিয়েছেন। নদী, নৌকা, মাঝি, প্রেম, বিরহ কিংবা প্রকৃতির মতো চেনা বিষয় তাঁর সুরে নতুন আবেগ নিয়ে হাজির হয়েছে। এ কারণেই তাঁর গান একদিকে সহজে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে, অন্যদিকে সংগীতবিশারদদের কাছেও পেয়েছে স্বীকৃতি।

শচীন দেব বর্মণের শিল্পীসত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর পরিবার। তাঁর একমাত্র পুত্র রাহুল দেব বর্মণ পরবর্তী সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেন। বাবা ও ছেলের দুই প্রজন্মের সংগীতচর্চা ভারতীয় চলচ্চিত্রের সুরের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য শচীন দেব বর্মণ সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার, ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এবং ১৯৬৯ সালে পদ্মশ্রীসহ বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন। তবে তাঁর প্রকৃত পরিচয় কোনো পুরস্কার বা পদকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন শ্রোতাদের ভালোবাসা এবং এমন এক সংগীতভাণ্ডার, যা কয়েক প্রজন্ম পেরিয়েও আবেদন ধরে রেখেছে।

১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর মুম্বাইয়ে শচীন দেব বর্মণের জীবনাবসান হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর সৃষ্টির পথ থেমে যায়নি। বরং সময় যত এগিয়েছে, তাঁর গান নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন করে পরিচিত হয়েছে।

কুমিল্লার চর্থা থেকে শুরু হওয়া সেই সংগীতযাত্রা শেষ পর্যন্ত তাঁকে উপমহাদেশের অন্যতম স্মরণীয় সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীতে পরিণত করে। তাঁর গানে বাংলার প্রকৃতি যেমন আছে, তেমনি আছে মানুষের অন্তর্গত আবেগ। আছে নদীর স্রোত, নৌকার দুলুনি, মাটির গন্ধ আর ভালোবাসা-বিরহের চিরচেনা অনুভূতি।

আজও ‘শোনো গো দখিনা হাওয়া’ কিংবা তাঁর অন্য কোনো গান বেজে উঠলে মনে পড়ে যায় এক স্বতন্ত্র কণ্ঠের কথা—যে কণ্ঠে ছিল মাটির কাছাকাছি থাকার অনুভব। শচীন দেব বর্মণ তাই শুধু একটি সময়ের শিল্পী নন; তিনি বাংলা ও উপমহাদেশের সংগীতঐতিহ্যের এক স্থায়ী অধ্যায়।

জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সুরসম্রাট শচীন দেব বর্মণকে।

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।