বাংলাদেশের আধুনিক এবং ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, শহীদ মাহমুদ জঙ্গী তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। চট্টগ্রাম থেকে উঠে আসা এই নিভৃতচারী মানুষটি পেশাগত জীবনে শিক্ষকতা, ব্যবসা কিংবা বিজ্ঞাপনী সংস্থা সামলালেও দিনশেষে তাঁর হৃদস্পন্দন মিশে ছিল গানের লাইনে। আজ ৬ ফেব্রুয়ারি, এই গুণী গীতিকবির জন্মদিন। ১৯৫৬ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই শব্দকারি কেবল গান লেখেননি, বরং এক একটি গানের মাধ্যমে নির্মাণ করেছেন জীবনের একেকটি দর্শন। ‘আজ যে শিশু’, ‘হৃদয় কাদামাটি’, ‘সময় যেন কাটে না’ কিংবা ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’—এই গানগুলো আজ কেবল সুরের মূর্ছনা নয়, বরং বাঙালির আবেগের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
Table of Contents
সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও নামের নেপথ্য কথা
শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর শৈশব কেটেছে চট্টগ্রামের এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে। তাঁর পিতা এ. এল. চৌধুরী ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। পারিবারিক পদবি ‘চৌধুরী’ হলেও নামের দীর্ঘতা কমাতে তাঁর বাবা ‘জঙ্গী’ শব্দটি যুক্ত করেন, যা বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর পিতা আবু সালেহ মুছা জঙ্গীর নাম থেকে অনুপ্রাণিত। তাঁদের বাড়িতে প্রতি রবিবার বসত গানের আসর, যেখানে নজরুলগীতি থেকে শুরু করে মাইজভান্ডারি—সব ঘরানার গানের মিলনমেলা ঘটত। এই পরিবেশই কিশোর শহীদ মাহমুদকে টেনে নিয়ে যায় শিল্পের আঙিনায়।
স্কুল পালানো কিশোর থেকে মঞ্চের ‘মন্টু’
শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর কিশোরবেলা ছিল এক রোমাঞ্চকর পাঠশালা। বাঁধাধরা নিয়মের চেয়ে পাবলিক লাইব্রেরি আর সিনেমার রঙিন পর্দা তাঁকে বেশি টানত। একসময় শৃঙ্খলা ফেরাতে তাঁকে বোর্ডিং স্কুলেও পাঠানো হয়। তবে তাঁর জীবনের প্রকৃত রূপান্তর ঘটে চট্টগ্রামের এম ই এস হাই স্কুলে ভর্তির পর। প্রধান শিক্ষকের জহুরি চোখ তাঁর ভেতরের অস্থিরতাকে সৃজনশীলতায় রূপ দেন। ‘মন্টুর পাঠশালা’ নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি আবিষ্কার করেন নিজের মঞ্চসত্ত্বাকে। যে কিশোর একসময় স্কুল এড়াতে চাইত, সেই হয়ে ওঠে সংস্কৃতির প্রধান কারিগর।
উত্তাল রাজনৈতিক জীবন ও মুক্তিযুদ্ধ (১৯৬৯-১৯৭১)
১৯৬৯-৭০ সালের ছাত্র আন্দোলনে শহীদ মাহমুদ জঙ্গী ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা। মাধ্যমিক স্কুল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে মার্শাল ল-তে হুলিয়া জারি হয়। নয় মাসের কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে তিনি আত্মগোপনে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়সের কারণে সরাসরি ট্রেনিংয়ে যেতে না পারলেও খবরাখবর আদান-প্রদান ও গোয়েন্দা কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ‘মেন্টর’ ও নেপথ্য নায়ক
শহীদ মাহমুদ জঙ্গী কেবল গীতিকার নন, বরং আইয়ুব বাচ্চু, পার্থ বড়ুয়া বা পিলু খানের মতো কিংবদন্তিদের ‘প্রথম’ অনুপ্রেরণা। আইয়ুব বাচ্চু যখন কেবল ইংরেজি গান নিয়ে ভাবতেন, তখন জঙ্গীই তাঁকে দিয়ে প্রথম বাংলা গান ‘হারানো বিকেলের গল্প বলি’ সুর করান। একইভাবে পিলু খানের সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তাঁর লেখা ‘আজ যে শিশু’ গানের মাধ্যমে।
এক নজরে শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর কালজয়ী ১০টি গান:
| গানের শিরোনাম | মূল শিল্পী / ব্যান্ড | সুরকার |
| ১. আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে | রেনেসাঁ | পিলু খান |
| ২. একদিন ঘুম ভাঙা শহরে | এলআরবি (পূর্বে সোলস) | আইয়ুব বাচ্চু |
| ৩. হৃদয় কাদামাটির কোনো মূর্তি নয় | রেনেসাঁ | নকীব খান |
| ৪. সময় যেন কাটে না | সামিনা চৌধুরী | পিলু খান |
| ৫. চায়ের কাপে পরিচয় | সোলস | পার্থ বড়ুয়া |
| ৬. আমি ভুলে যাই তুমি আমার নও | পার্থ বড়ুয়া | পার্থ বড়ুয়া |
| ৭. হে বাংলাদেশ, তোমার বয়স হলো কত? | রেনেসাঁ | পিলু খান |
| ৮. কোলাহল থেমে গেল | নাসিম আলী খান | নাসিম আলী খান |
| ৯. তৃতীয় বিশ্ব | রেনেসাঁ | পিলু খান |
| ১০. শুধুমাত্র তোমার জন্য | কুমার বিশ্বজিৎ | নকীব খান |
‘আজ যে শিশু’ ও ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’: দুটি কালজয়ী উপাখ্যান
শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর লেখা প্রতিটি গানের পেছনে রয়েছে একেকটি গভীর গল্প। ‘আজ যে শিশু’ গানটি তিনি লিখেছিলেন শীতের রাতে রেলস্টেশনে পড়ে থাকা অসহায় শিশুদের দেখে তীব্র অপরাধবোধ থেকে। অন্যদিকে, ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’ গানটির জন্ম হয়েছিল এক ঝোড়ো গতিতে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার পথে মাইক্রোবাসের ভেতরেই চলেছিল গানের ঘষামাজা, আর এলিফ্যান্ট রোডের ব্লুনাইল হোটেলে রাতভর আড্ডায় পূর্ণতা পেয়েছিল এই শহরবন্দনা।
বর্তমান ব্যস্ততা ও প্রাপ্তি
গানের সংখ্যা দিয়ে তিনি কখনো নিজেকে বিচার করতে চাননি। তাঁর কাছে মানের চেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মানুষের ভালোবাসা। করোনাকালের পর তিনি ‘গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে গীতিকারদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জীবনের সায়াহ্নে এসেও তিনি বিশ্বাস করেন, গান কেবল বিনোদন নয়, গান হলো সময়ের জীবন্ত দলিল।
জন্মদিনে এই কালজয়ী স্রষ্টাকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁর গান বেঁচে থাকুক আমাদের হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে।
