ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালের ঐতিহাসিক হাফটাইম শো: পারিশ্রমিক ছাড়াই গাইলেন ম্যাডোনা-শাকিরা-বিটিএস

ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল মানেই তো বিশ্ব ক্রীড়াজগতের সবচেয়ে জমজমাট ও উত্তেজনাকর মহারণ। বিশ্বের প্রতিটি কোণে কোটি কোটি দর্শক টেলিভিশনের সামনে চোখ রাখেন বিশ্বসেরা দল নির্ধারণের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে। তবে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল শুধু স্পেনের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার জন্যই নয়, ফুটবলের শতবর্ষের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমেরিকার বিখ্যাত ‘সুপার বোল’ ফুটবলের আদলে এই প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে যুক্ত করা হয়েছিল জাঁকজমকপূর্ণ ‘হাফটাইম শো’। আর সেই আলোঝলমলে মঞ্চে একসঙ্গে সুরের জাদুতে দর্শকদের মাতাতে হাজির হয়েছিলেন পপসম্রাজ্ঞী ম্যাডোনা, লাতিন পপ কুইন শাকিরা, কানাডীয় পপ তারকা জাস্টিন বিবার এবং বিশ্বজুড়ে মাতানো কে-পপ ব্যান্ড বিটিএস। এছাড়া উপস্থাপনা ও বিনোদনে অংশ নেন জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘টেড ল্যাসো’র দুই তারকা জেসন সুডেইকিস ও ব্রেন্ডন হান্ট, এমনকি বিশ্বখ্যাত পুতুল চরিত্র ‘দ্য মাপেটস’ও ছিল এই স্মরণীয় আয়োজনের অংশ।

বিশ্বের অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় এসব তারকাদের একই মঞ্চে পারফর্ম করতে দেখে সাধারণ দর্শকদের মনে কৌতূহল জাগাই স্বাভাবিক—এত বড় আয়োজনে শিল্পীদের নিশ্চয়ই আকাশচুম্বী পারিশ্রমিক দিতে হয়েছে। তবে পর্দার পেছনের আসল সত্যটি ফুটবলপ্রেমী ও সঙ্গীত অনুরাগীদের বেশ অবাক করেছে। বিশ্বসংগীতের এই কিংবদন্তিরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই ক্রীড়া বিনোদন মঞ্চে গাওয়ার জন্য ফিফার কাছ থেকে কোনো অর্থ বা পারিশ্রমিক নেননি। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে তাঁরা এই ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সে অংশ নিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপটি এমনিতেই ছিল নানামুখী পরিবর্তনের প্রতীক। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ নিয়ে আয়োজিত এই মেগা টুর্নামেন্টে আমেরিকান ক্রীড়াসংস্কৃতির একটি মূল উপাদান যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। এর আগে এনএফএল সুপার বোলের হাফটাইম শোতে মাইকেল জ্যাকসন, প্রিন্স, বেয়ন্সে, রিহানা, লেডি গাগা ও কেনড্রিক লামারের মতো কালজয়ী তারকারা পারফর্ম করে বিশ্বজুড়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে বিশ্বমঞ্চে ফুটবলের সঙ্গে সুরের মেলবন্ধন ঘটায় ফিফা।

তবে ফাইনাল ম্যাচের মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও বেশ কিছু কারণে এই হাফটাইম শো সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের রোমাঞ্চকর লড়াইটি শুরু থেকেই ছিল বেশ রক্ষণাত্মক। নির্ধারিত সময় গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের অসাধারণ গোলে ১-০ ব্যবধানে শিরোপা নিশ্চিত করে স্পেন। ফুটবলারদের ক্ষুরধার লড়াইয়ের মাঝপথেই আয়োজিত হয় এই দীর্ঘ বিরতির শো। ফুটবলের প্রচলিত বিরতি সাধারণত ১৫ মিনিটের হলেও এ দিনের হাফটাইম শোয়ের কারণে তা গড়ায় প্রায় ২৭ মিনিটে। এত দীর্ঘ সময় খেলা বন্ধ থাকায় স্টেডিয়ামে উপস্থিত ও টিভি পর্দার সামনে থাকা অনেক ফুটবল অনুরাগী তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

অনেকেরই দাবি, কৃত্রিম এই বিরতি খেলোয়াড়দের শারীরিক ছন্দ ও ম্যাচের স্বাভাবিক গতি নষ্ট করেছে। ইংল্যান্ড ফুটবল দলের প্রাক্তন অধিনায়ক ও বিবিসি স্পোর্টসের জনপ্রিয় বিশ্লেষক ওয়েন রুনি প্রকাশ্যেই এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, পারফর্ম করা তারকাদের গান তাঁর অত্যন্ত পছন্দের হলেও ফাইনাল খেলার মাঝে এমন দীর্ঘ বিরতি একদমই মানানসই নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এটি নিয়ে বেশ বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। একদল ভক্ত মনে করেন, এই উদ্যোগ বিশ্বকাপকে বিশ্বজনীন বিনোদনের এক নতুন উচ্চতায় তুলে ধরেছে; অন্যদিকে ঐতিহ্যবাদীদের মতে, এতে ফুটবলের মূল আবেদন ও শতবর্ষের ঐতিহ্য ক্ষুণ্ন হয়েছে।

জাস্টিন বিবার, শাকিরা, ম্যাডোনা কিংবা বিটিএসের মতো আন্তর্জাতিক তারকাদের একক কনসার্ট বা করপোরেট শো থেকে আয় সাধারণত লাখ লাখ ডলারের ঘরে পৌঁছায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এর বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই শিল্পীদের পারিশ্রমিক না নেওয়ার নেপথ্য গল্প। এই হাফটাইম শোটি ছিল মূলত ‘গ্লোবাল সিটিজেন’-এর সঙ্গে ফিফার একটি আন্তর্জাতিক সামাজিক কল্যাণ উদ্যোগের অংশ। আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিফা গ্লোবাল সিটিজেন এডুকেশন ফান্ডের মাধ্যমে বিশ্বের পিছিয়ে পড়া, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে সহায়তা করতেই সব শিল্পী স্বতঃস্ফূর্তভাবে পারফর্ম করেছেন।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অনুষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সময় বলেছিলেন, বিশ্বমঞ্চের ফাইনাল ম্যাচে এ ধরনের আয়োজন শুধু বিনোদন বা জাঁকজমকের জন্য নয়; এটি গ্লোবাল প্লাটফর্ম থেকে শিক্ষা, সামাজিক ঐক্য ও সার্বিক মানবিকতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম। সুপার বোলেও মূলত হলিউড ও আমেরিকান মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির নামিদামি শিল্পীরা সরাসরি কোনো নগদ পারিশ্রমিক পান না। সেখানে আয়োজক সংস্থা কেবল মঞ্চ তৈরি ও পারফরম্যান্সের ব্যয়ভার বহন করে, আর শিল্পীরা বিনিময় হিসেবে পান কোটি কোটি বিশ্বদর্শকের সামনে বিনামূল্যে নিজেকে তুলে ধরার অকল্পনীয় প্রচারণার সুযোগ। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপেও এনএফএলের সেই সুপরীক্ষিত বাণিজ্য ও সামাজিক মডেলটি নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করল ফিফা।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক । সঙ্গীত গুরুকুল নেটওয়ার্ক

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।