কিছু কণ্ঠ শুধু গান গায় না—
তারা মানুষের হৃদয়ে স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে।
কিছু সুর শুধু কানে শোনা যায় না—
তারা প্রজন্মের পর প্রজন্মের অনুভূতির সঙ্গে মিশে যায়।
লতা মঙ্গেশকর ছিলেন তেমনই এক কণ্ঠ। ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতভুবনে তিনি শুধু একজন গায়িকা নন; তিনি ছিলেন এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অধ্যায়ের নাম—সুরের এক অনন্য উত্তরাধিকার।
১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের ইন্দোরে জন্মগ্রহণ করেন লতা মঙ্গেশকর। তাঁর জন্মনাম ছিল হেমা। পিতা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও নাট্যব্যক্তিত্ব। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছেই সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা। মঞ্চে গান ও অভিনয়ের মধ্য দিয়েই তাঁর শিল্পীজীবনের শুরু।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে, ১৯৪২ সালে, মারাঠি ছবি Kiti Hasaal-এর জন্য তিনি প্রথম গান রেকর্ড করেন। গানটি ছিল “Naachu Yaa Gade, Khelu Saari Mani Haus Bhaari”। তবে গানটি শেষ পর্যন্ত ছবির চূড়ান্ত সংস্করণে রাখা হয়নি। একই বছর Pahili Mangalaa-gaur ছবিতে অভিনয় ও গান করার মধ্য দিয়ে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের পথচলা শুরু হয়। ১৯৪৩ সালে Gajaabhaau ছবিতে তিনি প্রথম হিন্দি গান রেকর্ড করেন।
শৈশবেই পিতৃবিয়োগ। সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে কিশোরী লতার কাঁধে। অভিনয় দিয়ে শুরু হলেও তাঁর প্রকৃত আশ্রয় হয়ে উঠল গান। কঠোর সাধনা, শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম, অসাধারণ নিষ্ঠা এবং নিজের কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রসংগীতের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ।
১৯৪৯ সালে Mahal ছবির “Aayega Aanewala” গানটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক কালজয়ী গান—প্রেম, বিরহ, আনন্দ, বেদনা, দেশপ্রেম, ভক্তি—জীবনের কত রঙ, কত অনুভূতি যে তাঁর কণ্ঠে রূপ পেয়েছে, তার হিসাব করা কঠিন।
সাত দশকেরও বেশি সময়ের শিল্পীজীবনে লতা মঙ্গেশকর ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন অসংখ্য গানে। হিন্দি ছাড়াও বাংলা, মারাঠি এবং আরও বহু ভারতীয় ভাষায় তাঁর কণ্ঠ ধ্বনিত হয়েছে। তাঁর রেকর্ড করা গানের সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে; এমনকি তিনি নিজেও গানের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সংরক্ষণ করেননি বলে জানা যায়। তাই সংখ্যার হিসাবের চেয়ে তাঁর রেখে যাওয়া বিশাল সংগীতভাণ্ডারই তাঁর প্রকৃত পরিচয়।
“আয়েগা আনেওয়ালা”, “লাগ যা গলে”, “অজীব দাস্তাঁ হ্যায় ইয়ে”, “প্যায়ার কিয়া তো ডরনা ক্যা”, “এ মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ”— এমন অসংখ্য গান তাঁর কণ্ঠে পেয়েছে অমরত্ব। প্রেমিকের হৃদয়ে তিনি প্রেমের ভাষা, বিরহীর কণ্ঠে তিনি বেদনার সুর, আর দেশপ্রেমিকের হৃদয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন আবেগের অনুরণন।
শুধু জনপ্রিয়তাই নয়, শিল্পী হিসেবে তাঁর অবদান স্বীকৃত হয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানেও। ১৯৬৯ সালে পদ্মভূষণ, ১৯৮৯ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ২০০১ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্ন লাভ করেন তিনি। এছাড়া তিনি তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
লতা মঙ্গেশকর ছিলেন শুধু কণ্ঠশিল্পী নন, একজন সংগীতসাধকও। তাঁর কণ্ঠে যেমন ছিল কোমলতার মায়া, তেমনি ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীর ভিত্তি। উচ্চারণের শুদ্ধতা, আবেগের সংযম এবং গানের কথাকে অনুভব করে তা কণ্ঠে ধারণ করার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে করে তুলেছিল স্বতন্ত্র।
আর তাই তাঁর প্রয়াণ যেন কেবল একজন শিল্পীর চলে যাওয়া নয়—
একটি যুগের পর্দা নামা।
২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন উপমহাদেশের এই কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী। কাকতালীয়ভাবে সেদিন ছিল সরস্বতী পূজার সময়। সেদিন যেন একদিকে চলছিল জ্ঞানের ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনা, অন্যদিকে পৃথিবীর মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন আমাদের চেনা ‘সুরের সরস্বতী’।
তিনি নেই—
কিন্তু তাঁর কণ্ঠ আছে।
রেডিওতে, পুরোনো রেকর্ডে, চলচ্চিত্রের দৃশ্যে, প্রেমিকের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসে, বিরহীর চোখের জলে, দেশপ্রেমের উত্তাল আবেগে—তিনি আজও বেঁচে আছেন।
লতা মঙ্গেশকর চলে গেছেন,
কিন্তু তাঁর সুরের মৃত্যু নেই।
যতদিন মানুষ প্রেমে পড়বে,
যতদিন মানুষ বিচ্ছেদে কাঁদবে,
যতদিন মানুষের হৃদয়ে স্মৃতি ও অনুভূতি থাকবে—
ততদিন কোনো না কোনো অদৃশ্য আকাশে বেজে উঠবে তাঁর সেই অনন্ত কণ্ঠ।
“হাম ভুল গয়ে রে হার বাত,
মাগার তেরা পেয়ার নেহি ভুলে…”
সুরের সরস্বতী,
আপনার কণ্ঠের মায়া আমরা কোনোদিন ভুলব না।
কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।












![তত্ত্ব তুমি কেমন করে গান করো [ Tumi Kemon Kore Gan Koro ]](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2024/02/তুমি-কেমন-করে-গান-করো-1024x576.webp)

