গজল তাঁর কণ্ঠে শুধু গান হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছিল মানুষের মনের ভাষা। প্রেম, বিরহ, অপেক্ষা, অভিমান কিংবা নিঃসঙ্গতার মতো অনুভূতিগুলোকে তিনি এমন মায়াময় আবহে তুলে ধরতেন, যেন প্রতিটি শব্দ শ্রোতার নিজের জীবনের কোনো না কোনো গল্প বলে যাচ্ছে। তাই মৃত্যুর পাঁচ দশক পরও বেগম আখতারের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। উপমহাদেশের সংগীতজগতে তিনি আজও ‘মালিকা-এ-গজল’—গজলের সম্রাজ্ঞী।
বেগম আখতারের প্রকৃত নাম ছিল আখতারি বাঈ ফৈজাবাদি। ১৯১৪ সালের ৭ অক্টোবর উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদে তাঁর জন্ম। ছোট বয়স থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। মাত্র সাত বছর বয়সে মঞ্চে আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে তাঁকে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রদ্ধেয় কণ্ঠশিল্পীতে পরিণত করে।
শাস্ত্রীয় সংগীতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি দীর্ঘদিন কঠোর সাধনা করেন। পাটিয়ালা ঘরানার ওস্তাদ আতা মোহাম্মদ খান এবং কিরানা ঘরানার ওস্তাদ আবদুল ওয়াহিদ খানের কাছে তিনি সংগীতের তালিম নেন। সেই শিক্ষার প্রভাব তাঁর গায়কিতে স্পষ্ট থাকলেও, বেগম আখতার কখনো কোনো একটি ঘরানার অনুকরণে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং বিভিন্ন সংগীতধারার বৈশিষ্ট্য আত্মস্থ করে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজের স্বতন্ত্র পরিবেশনরীতি।
ঠুমরি ও দাদরায় তাঁর দক্ষতা ছিল বিশেষভাবে প্রশংসিত। পুরব ও পাঞ্জাবি ধারার নানা বৈশিষ্ট্যকে নিজের গায়কির সঙ্গে মিলিয়ে তিনি এই গানগুলোকে আলাদা মাত্রা দিয়েছিলেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় গজলশিল্পী হিসেবে। কবিতার আবেগকে কণ্ঠের ওঠানামা, স্বরের মাধুর্য এবং সূক্ষ্ম অভিব্যক্তির মাধ্যমে তিনি এমনভাবে তুলে ধরতেন, যা শ্রোতাকে সহজেই গানের ভেতরে টেনে নিত।
মির্জা গালিবসহ বহু খ্যাতিমান কবির লেখা গজল তাঁর কণ্ঠে নতুন প্রাণ পেয়েছে। তাঁর গানে প্রেম কখনো উচ্ছ্বাস, কখনো অপেক্ষা; বিরহ কখনো দীর্ঘশ্বাস, কখনো নীরব কান্না। এই আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সংযম। তিনি অনুভূতিকে অতিরঞ্জিত না করেও তার গভীরতা শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে পারতেন।
সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও তাঁর প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে তিনি কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ‘মুমতাজ বেগম’, ‘নসীব কা চক্কর’, ‘রোটি’, ‘পন্না দাই’ ও ‘দানা পানি’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে অভিনয়ের চেয়ে সংগীতই তাঁর জীবনের প্রধান পরিচয়ে পরিণত হয়।
১৯৪৪ সালে লখনউয়ের ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ আব্বাসির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর কিছু সময় তিনি সংগীত পরিবেশন থেকে দূরে ছিলেন। কিন্তু গান থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ১৯৪৮-৪৯ সালের দিকে অল ইন্ডিয়া রেডিওর মাধ্যমে তিনি আবার শ্রোতাদের কাছে ফিরে আসেন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের পুনরারম্ভ ছিল না; এটি ছিল এমন এক কণ্ঠের পুনরাগমন, যার জন্য শ্রোতারা অপেক্ষা করছিলেন।
রেডিওর মাধ্যমে তাঁর গান দ্রুত আরও বিস্তৃত শ্রোতৃমহলে পৌঁছে যায়। সে সময় সরাসরি জলসা বা সংগীতানুষ্ঠানের পাশাপাশি রেডিও ছিল ঘরে ঘরে সংগীত পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ফলে বেগম আখতারের কণ্ঠ আরও বেশি মানুষের নিত্যদিনের শ্রবণ-অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।
বাংলাভাষী শ্রোতাদের কাছেও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল বিশেষ। ‘কোয়েলিয়া গান থামা এবার’ এবং ‘জোছনা করেছে আড়ি’র মতো বাংলা গান তাঁর কণ্ঠে ভিন্ন এক আবেগ পেয়েছে। বাংলা ভাষায় গাওয়া এসব গান তাঁকে বাঙালি শ্রোতার কাছেও আপন করে নেয়। ফলে তাঁর পরিচয় শুধু উত্তর ভারতীয় গজলশিল্পীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বাংলা সংগীতপ্রেমীদের স্মৃতিতেও তিনি বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন।
শিল্পী হিসেবে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে রাষ্ট্রীয় সম্মানে। ১৯৬৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী প্রদান করে। ১৯৭২ সালে তিনি সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন। মৃত্যুর পর ১৯৭৫ সালে তাঁকে মরণোত্তর পদ্মভূষণ দেওয়া হয়। এসব সম্মান তাঁর দীর্ঘ সংগীতসাধনা ও অসামান্য শিল্পীসত্তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বহন করে।
তবে জীবনের শেষ দিনগুলোতেও সংগীত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি বেগম আখতার। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে একটি সংগীতানুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। নিজের পরিবেশনা নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি আরও জোর দিয়ে গান গেয়েছিলেন—তাঁর শেষ সময়ের বিবরণে এমন কথাও পাওয়া যায়। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তাঁর শেষ পরিবেশনা নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনায় স্থান ও তারিখের কিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে ১৯৭৪ সালের শেষ অক্টোবর আহমেদাবাদে অসুস্থ হওয়ার পর ৩০ অক্টোবর সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৬০ বছর।
একজন শিল্পীর জীবন সেদিন থেমে গেলেও তাঁর সংগীত থামেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেগম আখতারের গান নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছেছে। তাঁর কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য, গজলের প্রতি তাঁর নিবেদন এবং কবিতাকে সংগীতে রূপ দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে উপমহাদেশের সংগীত ইতিহাসে স্থায়ী আসন দিয়েছে।
বেগম আখতারের বিশেষত্ব ছিল তিনি শ্রোতার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতেন না। তাঁর গান শুনলে মনে হতো, কোনো দূরের শিল্পী নয়—একজন আপন মানুষ নিজের মনের কথা বলছেন। হয়তো সেই কারণেই তাঁর গাওয়া বিরহের গান আজও নিঃসঙ্গ মানুষের মনে এত সহজে জায়গা করে নেয়।
‘কোয়েলিয়া গান থামা এবার’—এই পঙ্ক্তি শুনলে আজও বহু শ্রোতার মনে ভেসে ওঠে বেগম আখতারের মায়াময় কণ্ঠ। মনে হয়, বহু পুরোনো কোনো জলসাঘরে আলো-আঁধারির মধ্যে বসে আছেন এক শিল্পী; তাঁর কণ্ঠে ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে প্রেম, অপেক্ষা আর বিচ্ছেদের গল্প।
বেগম আখতার চলে গেছেন ১৯৭৪ সালে। কিন্তু তাঁর কণ্ঠের আবেদন ফুরোয়নি। তাঁর গান এখনও শোনা হয়, গাওয়া হয়, নতুন করে আবিষ্কৃত হয়। সংগীতের ইতিহাসে কিছু শিল্পী সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যান, আবার কিছু শিল্পী সময়কে অতিক্রম করেন। বেগম আখতার সেই দ্বিতীয় দলের একজন।
তাঁর কণ্ঠ থেমেছে, কিন্তু সুর থামেনি। গজলের সেই সম্রাজ্ঞী আজও বেঁচে আছেন তাঁর গানে, তাঁর শ্রোতাদের স্মৃতিতে এবং উপমহাদেশের সংগীত ঐতিহ্যে। প্রয়াণদিবসে তাই তাঁকে স্মরণ মানে শুধু একজন কিংবদন্তি শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং সেই কণ্ঠকে স্মরণ করা, যে কণ্ঠ মানুষের ভালোবাসা, বেদনা ও নিঃসঙ্গতাকে দিয়েছিল এক অনন্য সুরের ভাষা।












![কথা বা বানী চলনা সুজন লিরিক্স [ Cholna Sujon Lyrics ] । Sajib Rana & Salma](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2022/07/download-2022-07-17T045334.167-e1658060545254.png)


