কিছু কণ্ঠ কেবল গান গায় না, মানুষের হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলোকেও জাগিয়ে তোলে। কিছু সুর আনন্দের মুহূর্তে ভালো লাগার আবেশ ছড়ায়, আবার নিঃসঙ্গ রাতে হয়ে ওঠে মনের অব্যক্ত কথার সঙ্গী। উপমহাদেশের কিংবদন্তি গজলশিল্পী জগজিৎ সিং ছিলেন তেমনই এক বিরল শিল্পী। তাঁর কণ্ঠে প্রেম, বিরহ, স্মৃতি, বিষণ্নতা ও জীবনের নানা উপলব্ধি পেয়েছে অনন্য প্রকাশ। গজলকে তিনি শুধু সংগীতের একটি ধারা হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং সাধারণ মানুষের অনুভূতি প্রকাশের সহজ ও মর্মস্পর্শী ভাষায় পরিণত করেছিলেন।
‘তুম ইতনা যো মুসকুরা রহে হো’, ‘ঝুকি ঝুকি সি নজর’, ‘হোঠোঁ সে ছু লো তুম’ কিংবা ‘চিঠি না কোই সন্দেশ’—তাঁর গাওয়া এসব গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। গানগুলোর আবেদন শুধু সুরের মাধুর্যে নয়, কথার গভীরতা ও পরিবেশনার আন্তরিকতায়। তাঁর কণ্ঠ শুনলে মনে হয়, শিল্পী যেন দূরের কোনো গল্প বলছেন না; বরং শ্রোতার নিজের জীবনের সুখ-দুঃখ, পাওয়া-না-পাওয়া আর না বলা কথাগুলোই তুলে ধরছেন।
জগজিৎ সিংয়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল গজলকে অভিজাত সংগীতের নির্দিষ্ট পরিসর থেকে বের করে বৃহত্তর শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। সহজবোধ্য সুর, সংযত গায়কী এবং আধুনিক সংগীতায়োজনের মাধ্যমে তিনি গজলের ঐতিহ্যকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন। তাঁর গানে শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত যেমন ছিল, তেমনি ছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অনুভূতির সঙ্গে গভীর সংযোগ।
Table of Contents
শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি টান
জগজিৎ সিংয়ের জন্ম ১৯৪১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগরে। তাঁর বাবা সর্দার অমর সিং ধিমান সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর প্রত্যাশা ছিল প্রচলিত ও বাস্তবধর্মী—ছেলে পড়াশোনা শেষ করে প্রকৌশলী হবেন, প্রতিষ্ঠিত পেশায় যুক্ত হবেন এবং নিরাপদ জীবন গড়ে তুলবেন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই জগজিৎ সিংয়ের মনে সংগীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেন। পণ্ডিত ছগনলাল শর্মা ও উস্তাদ জামাল খানের মতো সংগীতগুরুদের কাছে শেখার অভিজ্ঞতা তাঁর কণ্ঠ, সুরবোধ ও সংগীতচর্চার ভিত্তি গড়ে দেয়। নিয়মিত অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তিনি বুঝতে শেখেন, গানের সৌন্দর্য শুধু কণ্ঠের মাধুর্যে সীমাবদ্ধ নয়; সুরের শুদ্ধতা, কথার অর্থ অনুধাবন এবং আবেগের যথাযথ প্রকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পড়াশোনার জন্য তিনি জলন্ধরের ডিএভি কলেজে ভর্তি হন। তবে তাঁর মন পড়ে থাকত সংগীতের জগতে। গানের চর্চা, নতুন সুরের সন্ধান এবং শিল্পী হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে ক্রমেই সংগীতের দিকে টেনে নেয়। পারিবারিক প্রত্যাশা ও নিজের স্বপ্নের মধ্যে শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন সেই পথ, যে পথে তাঁকে কঠোর পরিশ্রম, অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে।
আকাশবাণী থেকে মুম্বাইয়ের সংগীতজগৎ
পেশাদার সংগীতশিল্পী হিসেবে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলার প্রাথমিক পর্যায়ে জগজিৎ সিং জলন্ধর আকাশবাণী কেন্দ্রে গান গাইতেন। রেডিওতে পরিবেশনার মাধ্যমে তাঁর কণ্ঠ বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। বিভিন্ন মঞ্চে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর পরিবেশনা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।
কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও বিস্তৃত। সেই স্বপ্ন নিয়েই তিনি মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান, যে শহর দীর্ঘদিন ধরে ভারতের চলচ্চিত্র ও সংগীতশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেখানে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সহজ ছিল না। নতুন পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, সীমিত সুযোগ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে তাঁকে মানিয়ে নিতে হয়েছে। বিজ্ঞাপনের জিঙ্গল গাওয়া ও ছোট ছোট কাজের সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি তিনি নিজের সংগীতচর্চা অব্যাহত রাখেন।
জগজিৎ সিংয়ের সাফল্যের পেছনে ছিল এই দীর্ঘ প্রস্তুতি। তিনি বুঝেছিলেন, সংগীতজগতে স্থায়ী জায়গা করে নিতে শুধু ভালো কণ্ঠ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিজস্ব গায়কী, সুরের স্বতন্ত্রতা এবং শ্রোতার সঙ্গে আন্তরিক সংযোগ। সময়ের সঙ্গে তাঁর গায়কীতে সেই বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গজলে আধুনিকতার নতুন ভাষা
জগজিৎ সিংয়ের সংগীতজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো গজলকে আধুনিক সংগীতের সঙ্গে সফলভাবে যুক্ত করা। গজলের ঐতিহ্যে কাব্যিক ভাষা, সূক্ষ্ম আবেগ, রাগভিত্তিক সুর ও পরিবেশনার নিজস্ব রীতি গুরুত্বপূর্ণ। জগজিৎ সিং এসব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখেই গজলকে এমনভাবে পরিবেশন করেন, যাতে নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও সহজে এর সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন।
তাঁর গায়কীতে অকারণ অলংকারের বাহুল্য ছিল না। বরং গানের কথার অর্থ, সুরের স্বাভাবিক প্রবাহ এবং অনুভূতির গভীরতাই পেত প্রাধান্য। হারমোনিয়াম, তবলা, গিটারসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার এবং আধুনিক রেকর্ডিংয়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি গজলের সংগীতায়োজনে নতুন মাত্রা যোগ করেন। এতে গজল আরও অন্তরঙ্গ ও শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে, যদিও এর কাব্যিক আবেদন অক্ষুণ্ণ থাকে।
‘ঝুকি ঝুকি সি নজর’ গানে প্রেমের লাজুক অনুভূতি, ‘হোঠোঁ সে ছু লো তুম’-এ ভালোবাসার কোমল আকুতি এবং ‘তুম ইতনা যো মুসকুরা রহে হো’ গানে হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বেদনার প্রশ্ন—প্রতিটি পরিবেশনাতেই তাঁর সংযত গায়কী বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি উচ্চকণ্ঠে আবেগ প্রকাশের বদলে মৃদু স্বর, শব্দের স্পষ্টতা ও সুরের সূক্ষ্মতায় শ্রোতার মনে জায়গা করে নিতেন।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই তাঁর গজল শুধু প্রেমের গান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। একাকী মানুষ, স্মৃতিকাতর শ্রোতা, বিচ্ছেদের কষ্টে থাকা ব্যক্তি কিংবা জীবনের কঠিন সময় পার করা মানুষ—অনেকেই তাঁর গানে নিজেদের অনুভূতির প্রতিফলন খুঁজে পেয়েছেন। গজলকে সাধারণ মানুষের আবেগের কাছাকাছি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান তাই বিশেষভাবে স্মরণীয়।
চিত্রা সিংয়ের সঙ্গে জীবন ও সংগীতের বন্ধন
জগজিৎ সিংয়ের ব্যক্তিগত ও সংগীতজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে তাঁর সহধর্মিণী চিত্রা সিংয়ের নাম। চিত্রাও ছিলেন একজন প্রতিভাবান গজলশিল্পী। ১৯৬০-এর দশকে বিজ্ঞাপনের জিঙ্গল রেকর্ডিংয়ের সূত্রে তাঁদের পরিচয় ঘটে। পরবর্তী সময়ে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং গড়ে তোলেন উপমহাদেশের সংগীতজগতের অন্যতম স্মরণীয় গজল-জুটি।
তাঁদের সম্পর্ক ছিল ব্যক্তিগত ভালোবাসার পাশাপাশি সংগীতের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার বন্ধন। দুজনের কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য যৌথ পরিবেশনাকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিত। একসঙ্গে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা গজলকে আরও বেশি শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেন।
১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁদের অ্যালবাম ‘দ্য আনফরগেটেবলস’ এই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অ্যালবামটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং চলচ্চিত্রের বাইরেও গজলভিত্তিক রেকর্ডসংগীতের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তুলে ধরে। এ সাফল্য গজলকে আধুনিক সংগীতের শ্রোতাদের মধ্যে নতুনভাবে পরিচিত করে তুলতে সহায়তা করে।
জগজিৎ ও চিত্রার যৌথ পরিবেশনায় ছিল আবেগের সংযম, কণ্ঠের সামঞ্জস্য এবং কথার প্রতি যত্নশীলতা। তাঁদের সংগীতজীবন যখন সাফল্যের পথে এগোচ্ছিল, তখনই ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়, যা তাঁদের জীবন ও সংগীতচর্চাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
সন্তান হারানোর শোক ও জীবনের কঠিন অধ্যায়
১৯৯০ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় জগজিৎ সিং ও চিত্রা সিংয়ের একমাত্র পুত্র বিবেক সিংয়ের মৃত্যু হয়। এই আকস্মিক ঘটনা তাঁদের জীবনে গভীর শোকের জন্ম দেয়। প্রিয় সন্তানকে হারানোর বেদনা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং সংগীতচর্চার ওপরও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
এই ঘটনার পর দুজনই কিছু সময়ের জন্য সংগীতজগৎ থেকে দূরে সরে যান। বিশেষ করে চিত্রা সিং দীর্ঘদিন গান থেকে বিরত থাকেন। এমন শোকের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সংগীত মানুষের দুঃখকে সুরে রূপ দিতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের গভীরতম ক্ষত সারিয়ে তোলা যে কত কঠিন, তাঁদের অভিজ্ঞতা তারই মর্মস্পর্শী উদাহরণ।
অনেক শ্রোতা জগজিৎ সিংয়ের গানে থাকা বিষণ্নতাকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এই অধ্যায়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। তবে তাঁর শিল্পীসত্তাকে কেবল ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। প্রেম, স্মৃতি, বিচ্ছেদ, নিঃসঙ্গতা ও জীবনের নানা অনুভূতি তিনি গানে এমনভাবে ধারণ করেছিলেন, যা বিভিন্ন বয়স ও অভিজ্ঞতার মানুষের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
তাঁর কণ্ঠে বিষণ্নতা কখনো অতিনাটকীয় হয়ে ওঠেনি। বরং তা ছিল শান্ত, গভীর এবং সংযত। সম্ভবত এই কারণেই তাঁর গান শুনে শ্রোতারা নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সহজে সংযোগ স্থাপন করতে পারেন।
কবিতা ও ভাবনার জগতে ‘নয়া দিশা’ ও ‘সমবেদনা’
জগজিৎ সিংয়ের কাজ শুধু প্রেম, বিরহ কিংবা ব্যক্তিগত অনুভূতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। কবিতা ও চিন্তাশীল রচনাকে সংগীতের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৯৯ সালে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ির কবিতাভিত্তিক অ্যালবাম ‘নয়া দিশা’র সঙ্গে তাঁর সংগীতায়োজনের সম্পৃক্ততা তাঁর শিল্পীসত্তার আরেকটি দিক তুলে ধরে। কবিতার ভাষা, ভাবনা ও অনুভূতিকে সুরের আবহে উপস্থাপন করার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, গজলশিল্পীর পরিচয় কেবল নির্দিষ্ট একটি সংগীতধারায় সীমাবদ্ধ নয়।
২০০২ সালে প্রকাশিত ‘সমবেদনা’ অ্যালবামেও তাঁর সংগীতায়োজন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এতে অমিতাভ বচ্চন ও শাহরুখ খানের মতো পরিচিত ব্যক্তিত্বের কণ্ঠে কবিতা পরিবেশিত হয়। এ ধরনের কাজের মাধ্যমে সংগীত, কবিতা ও আবৃত্তির মধ্যে একটি সেতুবন্ধ তৈরি হয়। শ্রোতারা শুধু সুর উপভোগ করেননি; কবিতার বক্তব্য ও ভাবনার সঙ্গেও যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
এসব উদ্যোগ জগজিৎ সিংয়ের বহুমুখী সংগীতবোধের পরিচয় বহন করে। তিনি বুঝতেন, সংগীতের শক্তি বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাকেও সমৃদ্ধ করতে পারে।
চলচ্চিত্রের গানেও অমলিন অবদান
গজলশিল্পী হিসেবেই জগজিৎ সিং সবচেয়ে বেশি পরিচিত হলেও চলচ্চিত্রের গানেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। মহেশ ভাট পরিচালিত ‘আর্থ’ (১৯৮২) চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া ‘তুম ইতনা যো মুসকুরা রহে হো’ গানটি বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। গানটির কথায় হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা দুঃখ ও মানসিক দ্বন্দ্বের যে ইঙ্গিত রয়েছে, তাঁর সংযত কণ্ঠ তা অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলে।
একই চলচ্চিত্রের ‘ঝুকি ঝুকি সি নজর’ গানটিও শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। অন্যদিকে ‘হোঠোঁ সে ছু লো তুম’ ভালোবাসার কোমল প্রকাশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়। এসব গানের আবেদন সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়নি; নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও বিভিন্ন মাধ্যমে গানগুলো শুনছেন।
‘চিঠি না কোই সন্দেশ’ গানটি বিচ্ছেদ, অপেক্ষা ও প্রিয়জনের অনুপস্থিতির অনুভূতিকে গভীরভাবে তুলে ধরে। গানের কথার সঙ্গে তাঁর কণ্ঠের মেলবন্ধন শ্রোতার মনে শূন্যতা ও স্মৃতির আবেশ তৈরি করে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যাই হোক না কেন, অনেকেই এই গানে নিজেদের হারানো সময়, দূরে চলে যাওয়া মানুষ কিংবা অপূর্ণ সম্পর্কের স্মৃতি খুঁজে পান।
তাঁর গায়কীর অন্যতম শক্তি ছিল সংযম। তিনি আবেগের তীব্রতা বোঝাতে কণ্ঠের জোর বাড়ানোর ওপর নির্ভর করতেন না। বরং শব্দের স্পষ্ট উচ্চারণ, সুরের স্বাভাবিক প্রবাহ এবং অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশের মধ্য দিয়ে গানকে হৃদয়স্পর্শী করে তুলতেন। এই বৈশিষ্ট্যই তাঁর সংগীতকে দীর্ঘস্থায়ী আবেদন দিয়েছে।
পদ্মভূষণসহ নানা স্বীকৃতি
জগজিৎ সিংয়ের সংগীতপ্রতিভা ও দীর্ঘদিনের অবদান শ্রোতাদের ভালোবাসার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পেয়েছে। ভারত সরকার ২০০৩ সালে তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। গজলসংগীতকে বৃহত্তর শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া, নিজস্ব গায়কীর ধারা প্রতিষ্ঠা এবং ভারতীয় সংগীতজগতে দীর্ঘস্থায়ী অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তাঁর অর্জনের মূল্যায়ন শুধু পুরস্কার দিয়ে করা সম্ভব নয়। তাঁর গান বহু মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কেউ প্রেমের স্মৃতিতে তাঁর গজল শোনেন, কেউ বিচ্ছেদের সময়ে সান্ত্বনা খোঁজেন, আবার কেউ নিঃশব্দ রাতে নিজের অনুভূতিগুলো বুঝতে তাঁর কণ্ঠের আশ্রয় নেন।
প্রযুক্তি ও শ্রবণমাধ্যম বদলেছে। ক্যাসেট ও সিডির সময় পেরিয়ে গান এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও সহজলভ্য। কিন্তু জগজিৎ সিংয়ের গানের আবেদন টিকে আছে। কারণ তাঁর সৃষ্টির মূল শক্তি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সংগীতপ্রবণতা নয়; বরং মানুষের চিরচেনা অনুভূতিগুলোকে আন্তরিকভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা।
প্রয়াণের পরও অমলিন তাঁর কণ্ঠ
২০১১ সালের ১০ অক্টোবর মুম্বাইয়ে ৭০ বছর বয়সে জগজিৎ সিং শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে উপমহাদেশের সংগীতজগৎ হারায় এক অসামান্য শিল্পীকে। তবে তাঁর কণ্ঠ, সুরের মাধুর্য এবং গজলকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অবদান আজও সংগীতপ্রেমীদের কাছে সমানভাবে মূল্যবান।
শিল্পীর জীবন একসময় থেমে যায়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতি ও অনুভূতির মধ্যে। জগজিৎ সিংয়ের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ‘তুম ইতনা যো মুসকুরা রহে হো’ শুনলে আজও মনে হয়, মানুষের হাসির আড়ালে জমে থাকতে পারে অসংখ্য না বলা কথা। ‘চিঠি না কোই সন্দেশ’ মনে করিয়ে দেয়, প্রিয়জনের অনুপস্থিতি কখনো কখনো শব্দের চেয়েও গভীর নীরবতা তৈরি করে।
তাঁর সংগীত আমাদের শিখিয়েছে, আবেগ প্রকাশের জন্য সব সময় উচ্চকণ্ঠ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কখনো মৃদু স্বর, সহজ শব্দ ও সংযত সুরই মানুষের হৃদয়ে সবচেয়ে গভীর ছাপ ফেলে। গজলকে বৃহত্তর শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিয়ে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতজগতে এমন একটি অধ্যায় সৃষ্টি করেছেন, যা সময়ের সঙ্গে মুছে যাওয়ার নয়।
আজ তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর জনপ্রিয় গানগুলো ফিরে শোনা নয়; তাঁর দীর্ঘ সাধনা, সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা, জীবনসংগ্রাম, ভালোবাসা এবং ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কের কথাও মনে করা। তাঁর গান আনন্দের দিনে মুগ্ধতা ছড়াবে, বিষণ্ন সময়ে সঙ্গ দেবে, আর নিঃসঙ্গ মুহূর্তে মনে করিয়ে দেবে—মানুষের হৃদয়ের ভাষা কখনো হারিয়ে যায় না।
গজলসম্রাট জগজিৎ সিংয়ের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর কণ্ঠের মায়া, সুরের আবেশ ও গজলের গভীর অনুভব প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।
বাংলা সঙ্গীতের কালজয়ী ব্যক্তিত্ব, গানের পেছনের না-বলা গল্প ও প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে আকর্ষণীয় আখ্যানে উপস্থাপন করতে কাজ করছে ‘ফিচার ডেস্ক’। এখানে স্থান পায় প্রখ্যাত শিল্পী ও সুরকারদের জীবনভিত্তিক বিবরণী, সৃষ্টিশীল কাজের নেপথ্য ইতিহাস এবং সুরের বিবর্তনের তথ্যভিত্তিক রূপলেখ। গভীর পর্যবেক্ষণ ও প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণের সমন্বয়ে সঙ্গীতকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে আবিষ্কার করাই আমাদের লক্ষ্য।















