তিন বছর গোপন রেখেছিলেন বিয়ে, মোনালির জীবনের অজানা গল্প

ভারতীয় সংগীতজগতে স্বতন্ত্র কণ্ঠ, সাবলীল গায়কী ও বহুমুখী প্রতিভার জন্য পরিচিত মোনালি ঠাকুর। শৈশব থেকেই গান, নাচ ও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত এই শিল্পী নিজের যোগ্যতায় বলিউডে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। ‘জারা জারা টাচ মি’, ‘সাওয়ার লু’ কিংবা ‘মোহ মোহ কে ধাগে’র মতো জনপ্রিয় গান তাঁকে শ্রোতাদের কাছে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও রয়েছে তাঁর অর্জনের তালিকায়। তবে সংগীতজীবনের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও রয়েছে নানা কৌতূহল। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ডের হোটেল ব্যবসায়ী মাইক রিজের সঙ্গে প্রেম এবং বিয়ের খবর প্রায় তিন বছর গোপন রাখার ঘটনা তাঁকে নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মোনালির সংগীতচর্চা শুরু হয়েছিল একেবারে ছোটবেলায়। পরিবারের কাছ থেকেই গানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেন। পণ্ডিত জগদীশ প্রসাদ ও পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর কাছে তালিম নিয়ে সংগীতের মৌলিক ভিত্তি মজবুত করেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের এই চর্চা তাঁর কণ্ঠের পরিশীলন ও গায়কির বৈচিত্র্য তৈরিতে সহায়তা করে।

গান শেখার পাশাপাশি নাচ ও অভিনয়েও আগ্রহ ছিল তাঁর। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই বিভিন্ন প্রাদেশিক পর্যায়ের পুরস্কার অর্জন করেন মোনালি। ছোটবেলা থেকেই মঞ্চে গান পরিবেশনের অভিজ্ঞতা তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ধীরে ধীরে সংগীতের জগতে নিজের পরিচিতি তৈরি করতে থাকেন তিনি।

তবে ভারতের বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘ইন্ডিয়ান আইডল’। প্রতিযোগিতাটির দ্বিতীয় আসরে অংশ নিয়ে সেরা দশে জায়গা করে নেন মোনালি। তাঁর কণ্ঠের স্বকীয়তা, গানের আবেগ এবং মঞ্চে পরিবেশনার দক্ষতা দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি বলিউডে কাজের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

‘জারা জারা টাচ মি’ বদলে দেয় ক্যারিয়ারের মোড়

২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া বলিউডের ‘রেস’ ছবির ‘জারা জারা টাচ মি’ গানটি মোনালির ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নিয়ে আসে। সংগীত পরিচালক প্রীতমের সুরে গাওয়া গানটি মুক্তির পর দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তরুণ শ্রোতাদের মধ্যে গানটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। রাতারাতি পরিচিতি পান মোনালি। এরপর তাঁর কাছে বিভিন্ন ধরনের গানের প্রস্তাব আসতে শুরু করে।

তবে জনপ্রিয়তার প্রথম ঢেউয়ে ভেসে গিয়ে নিজেকে নির্দিষ্ট একটি ধারার গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি তিনি। বরং ভিন্ন স্বাদের গান গেয়ে নিজের সামর্থ্য প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। সেই সিদ্ধান্তের প্রতিফলন দেখা যায় পরবর্তী কাজগুলোতে।

২০১৩ সালে বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানে পরিচালিত ‘লুটেরা’ ছবির ‘সাওয়ার লু’ গানটি তাঁর সংগীতজীবনে নতুন পরিচয় তৈরি করে। গানটির কোমল সুর, আবেগঘন কথা এবং মোনালির মিষ্টি কণ্ঠ শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। ‘জারা জারা টাচ মি’র মতো ছন্দময় গানের বাইরেও যে তিনি মেলোডিনির্ভর গানে সমান দক্ষ, তা এই পরিবেশনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এরপর ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দম লাগা কে হাইসা’ ছবির ‘মোহ মোহ কে ধাগে’ গানটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অর্জন হয়ে ওঠে। গানটির জন্য সেরা নারী কণ্ঠশিল্পী বিভাগে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। এই পুরস্কার শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যই নয়, সংগীতশিল্পী হিসেবে তাঁর দক্ষতারও গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। বলিউডের প্রতিষ্ঠিত নারী কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে তাঁর অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়।

গানের পাশাপাশি অভিনয়েও রেখেছেন স্বাক্ষর

মোনালির প্রতিভা শুধু সংগীতেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিনয়ের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় দীর্ঘদিনের। ছোটবেলায় বাংলা টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘আলোকিত এক ইন্দু’তে অভিনয় করেছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে রাজা সেন পরিচালিত ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ ছবির মাধ্যমে।

বলিউডেও অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন মোনালি। নাগেশ কুকনুর পরিচালিত ‘লক্ষ্মী’ ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। মানব পাচার ও শিশুদের যৌন শোষণের মতো স্পর্শকাতর সামাজিক বিষয় নিয়ে নির্মিত ছবিটিতে তাঁর চরিত্র ছিল ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর। কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া একটি মেয়ের মানসিক যন্ত্রণা, অসহায়ত্ব ও সংগ্রাম ফুটিয়ে তুলতে হয় তাঁকে। চরিত্রটির জন্য তাঁর অভিনয় প্রশংসা পায়। বিষয়বস্তুর সংবেদনশীলতা এবং চরিত্রের গভীরতা বিবেচনায় ছবিটি তাঁর অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি।

মাইক রিজের সঙ্গে প্রেম, ২০১৭ সালে বিয়ে

পেশাগত জীবনের নানা অর্জনের বাইরে মোনালির ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে আকর্ষণীয় অধ্যায়। সুইজারল্যান্ডের হোটেল ব্যবসায়ী মাইক রিজের সঙ্গে তাঁর পরিচয় থেকে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাঁরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

কিন্তু বিয়ের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেননি মোনালি। প্রায় তিন বছর ধরে নিজেদের দাম্পত্য জীবনের খবর গোপন রেখেছিলেন তিনি। ফলে ভক্তদের পাশাপাশি বিনোদনজগতের অনেকের কাছেও বিষয়টি অজানা ছিল। পরে বিয়ের খবর প্রকাশ্যে এলে তা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।

তারকাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পারিবারিক জীবন নিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং ভক্তদের কৌতূহল সব সময়ই থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের পর অনেক শিল্পী তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের নানা মুহূর্ত নিয়মিত প্রকাশ করেন। কিন্তু মোনালি সে পথে হাঁটেননি। নিজের সম্পর্ক ও দাম্পত্য জীবনকে প্রচারের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত পরিসরকে গুরুত্ব দেওয়ার এই প্রবণতা তাঁর জীবনযাপনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।

সব মিলিয়ে মোনালি ঠাকুরের পথচলা একজন বহুমুখী শিল্পীর সাফল্যের গল্প। শৈশবের সংগীতচর্চা থেকে রিয়েলিটি শো, সেখান থেকে বলিউডে প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন—প্রতিটি ধাপেই রয়েছে পরিশ্রম ও প্রতিভার স্বাক্ষর। অভিনয়েও নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন তিনি। আর ব্যক্তিজীবনের প্রেম ও বিয়ের গল্প তাঁর পরিচিতির সঙ্গে যুক্ত করেছে ভিন্ন এক মাত্রা। খ্যাতির আলোয় থেকেও ব্যক্তিগত জীবনকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে মোনালি বুঝিয়েছেন, একজন শিল্পীর পরিচয় কেবল তাঁর কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্বাধীনতারও রয়েছে আলাদা গুরুত্ব।

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।