শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল ভাণ্ডারে এমন কিছু রাগ রয়েছে, যাদের নাম শুনলেই বোঝা যায় তারা প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজেদের এক ‘ভিন্ন’ বা অনন্য রূপ তৈরি করেছে। তেমনই একটি বিশেষ ও চমৎকার রাগ হলো ‘রাগ ভিন্ন ষড়্জ’। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে এটি মূলত ‘বিলাবল’ ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। এই রাগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এর চলনে ‘ঋষভ’ (রে) এবং ‘পঞ্চম’ (পা) স্বর দুটি সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে। দুই জোরালো স্বর বাদ দিয়েও এটি যে কতটা মিষ্টি হতে পারে, তা এই রাগটি না শুনলে বোঝা যায় না। আমাদের বাংলার সঙ্গীত ঐতিহ্যের সাথেও এর একটি পুরোনো সংযোগ রয়েছে; এক সময় বাংলাদেশের গুণীজন ও সঙ্গীতজ্ঞরা এই রাগটিকে ভালোবেসে ‘হিন্দোলী’ নামেও অভিহিত করতেন।
রাগ ভিন্ন ষড়্জ । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
রাগের কারিগরি ও সুরের বিতর্ক:
রাগ ভিন্ন ষড়্জের ব্যাকরণ ও এর প্রধান স্বর নিয়ে পণ্ডিতদের মাঝে বেশ চমৎকার কিছু মতভেদ আছে, যা এর চরিত্রকে আরও রহস্যময় করে তোলে:
- ঠাট: বিলাবল
- জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহণ ও অবরোহণ—উভয় পথেই পাঁচটি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)
- আরোহণ: স গ ম ধ ন র্স
- অবরোহণ: র্স ন ধ ম গ, স
- বাদীস্বর (রাগের প্রধান রাজা): মধ্যম (ম)। তবে অনেক পণ্ডিতের জোরালো দাবি, এই রাগের প্রধান স্বর বা বাদীস্বর হলো ধৈবত (ধ)।
- সমবাদী স্বর (রাগের উজির বা মন্ত্রী): ষড়জ (স)। তবে ধৈবতকে যাঁরা বাদী মানেন, তাঁদের মতে সমবাদী স্বর হলো গান্ধার (গ)।
- অঙ্গ: পূর্বাঙ্গ প্রধান।
- পকড় (রাগের আসল চাবিকাঠি): র্স, নধ, মধনর্স, নধ মগ, মগ স।
সময়ের মায়াজাল ও শ্রোতার মনস্তত্ত্ব:
এই রাগের পরিবেশনের সময় নিয়ে এর ‘বাদীস্বর’-এর মতভেদের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণ নিয়মে রাগ ভিন্ন ষড়্জ পরিবেশনের উপযুক্ত সময় হলো রাতের প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা পার হওয়ার পরের সময়)। কিন্তু যেসব ওস্তাদ ‘ধৈবত’ (ধ) স্বরটিকে এর প্রধান বা বাদী স্বর হিসেবে মান্য করেন, তাঁরা এই রাগটির মায়াবী রূপ ফুটিয়ে তোলার জন্য বেছে নেন দিনের প্রথম প্রহর বা সকালবেলাকে।
দিনের আলোয় হোক কিংবা রাতের শুরুতে, যখনই এই রাগের আলাপ তানপুরায় ধরা হয়, ঋষভ ও পঞ্চমহীন এই সুরের চলন শ্রোতার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও কিছুটা কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। এর শান্ত অথচ গম্ভীর প্রকৃতি শ্রোতার অবচেতন মনকে চারপাশের জাগতিক কোলাহল থেকে নিমেষেই মুক্ত করে এক অন্য ভুবনে নিয়ে যায়। এটি কেবল কিছু স্বরের বিন্যাস নয়, বরং সুরের জগতে এক অনন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যা শ্রোতার হৃদয়কে এক স্নিগ্ধ অনুভূতিতে ভরিয়ে দেয়।
তথ্যসূত্র:
গীতবল্লরী (পঞ্চম ভাগ) — শ্রীপ্রশান্ত দাশগুপ্ত (১৪ এপ্রিল, ১৯৭৩)।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।














