রাগ মোহন কল্যাণ । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল সাগরে এমন কিছু রত্ন রয়েছে, যা একসময় সঙ্গীত জলসাগুলোকে আলোড়িত করত, কিন্তু কালের নিয়মে আজ তারা হারিয়ে যাওয়ার মুখে। তেমনই এক পরম সুন্দর, অথচ প্রায় বিস্মৃত ও বিলুপ্তপ্রায় রাগের নাম ‘রাগ মোহন কল্যাণ’। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে এটি এক অনন্য সৃষ্টি, যা আজ কেবল গুণী গবেষক আর প্রাচীন স্বরলিপির পাতায় বেঁচে রয়েছে।

রাগ মোহন কল্যাণ

আমাদের চেনা রাগ-সঙ্গীতের জগতে বহু রাগ যুগের পর যুগ ধরে সমান জনপ্রিয় থাকলেও, কিছু রাগ সময়ের আবর্তে অপ্রচলিত হয়ে পড়ে। রাগ মোহন কল্যাণ তেমনই এক নিভৃতচারী রাগ। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান যুগে সঙ্গীত জলসা কিংবা কোনো আসরে এখন আর প্রায় কাউকেই এই রাগটি গাইতে বা বাজাতে শোনা যায় না। তবে এর স্বর বিন্যাস এবং সুরের গভীরতা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পণ্ডিতদের কাছে সবসময়ই অত্যন্ত উচ্চমানের একটি সৃষ্টি হিসেবে গণ্য হয়।

স্বরের বিশেষত্ব

রাগ মোহন কল্যাণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ও বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বর প্রয়োগের চাতুর্য। এই রাগে দুই গান্ধার (অর্থাৎ শুদ্ধ ‘গ’ এবং কোমল ‘জ্ঞ’) ব্যবহৃত হয়, যা রাগের চলনকে এক অদ্ভুত ও মায়াবী রূপ দান করে।

রাগ মোহন কল্যাণ-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী রাগ মোহন কল্যাণের মূল কাঠামো ও ব্যাকরণগত পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ঠাট (Thaat): রাগটি উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে ক্ল্যাসিক্যাল কল্যাণ ঠাটের অন্তর্গত।
  • জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো ঔড়ব-সম্পূর্ণ। অর্থাৎ, এর আরোহণে দুটি স্বর (মধ্যম ও নিষাদ) বর্জিত থাকে এবং ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়। তবে অবরোহণের সময় ৭টি স্বরই (সম্পূর্ণ রূপ) নিখুঁতভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো পঞ্চম (পা)।
  • সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো ঋষভ (রে)।
  • অঙ্গ (Anga): এটি একটি উত্তরাঙ্গ প্রধান রাগ।
  • পরিবেশনের সময় (Time): রাগ মোহন কল্যাণ গাওয়ার বা বাজানোর আদর্শ সময় হলো রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর। রাতের এই নির্জন প্রহরে রাগের সুরগুলো এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশের সৃষ্টি করে।

আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়

রাগটির সুরের গতিপ্রকৃতি ও চলন বোঝার জন্য এর প্রধান স্বরলিপি নিচে দেওয়া হলো:

আরোহণ: স র জ্ঞ প ধ র্স

অবরোহণ: র্স ণ ধ প, হ্ম গ র স

পকড় (রাগের মূল রূপ): স র জ্ঞ, প হ্ম গ প র স

তথ্যসূত্র

এই রাগের তাত্বিক ও ক্রিয়াত্মক পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণের জন্য প্রখ্যাত সঙ্গীত গবেষক শক্তিপদ ভট্টাচার্য রচিত এবং ‘নাথ ব্রাদার্স’ কর্তৃক ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত’ গ্রন্থটির সহায়তা নেওয়া হয়েছে。

রাগ মোহন কল্যাণ
রাগ মোহন কল্যাণ

রাগ মোহন কল্যাণ আজ হয়তো আমাদের সঙ্গীতমঞ্চ থেকে দূরে সরে গেছে, কিন্তু এর ভেতরের শৈল্পিক মাধুর্য বিন্দুমাত্র কমেনি। এই ধরনের অপ্রচলিত রাগগুলোকে সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা আমাদের সঙ্গীত সংস্কৃতির জন্যই ভীষণ জরুরি।

হারিয়ে যাওয়া এই রাগ মোহন কল্যাণ নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজনটি আপনার কেমন লাগল, তা আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে সঙ্গীতপ্রেমী বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।