গোবিন্দ হালদার | বাঙালি গীতিকার

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কেবল অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা বীরেরাই ইতিহাস গড়েননি, শব্দের বুলেটে মুক্তিযোদ্ধাদের শিরায় শিরায় স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন কিছু ক্ষ্যাপাটে কলমযোদ্ধা। তেমনই এক কালজয়ী ও অমর গীতিকার হলেন গোবিন্দ হালদার।

“মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি” কিংবা “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে”—এই গানগুলো শোনেননি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের দিনগুলোতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর গানগুলো ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান মানসিক শক্তি।

গোবিন্দ হালদার | বাঙালি গীতিকার
গোবিন্দ হালদার

 

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন: অবিনাশী শব্দের শুরু

১৯৩০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয়ে এক সাধারণ বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন গোবিন্দ হালদার। কাকতালীয়ভাবে, যে ২১শে ফেব্রুয়ারি পরবর্তীতে বাঙালির ভাষার অধিকার ও আত্মত্যাগের চিরন্তন প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেই দিনটিতেই জন্ম হয়েছিল বাংলা গানের এই মহান রূপকারের।

ছোটবেলা থেকেই শব্দ আর ছন্দের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তাঁর হাত দিয়ে রচিত প্রথম কবিতাটির নাম ছিল ‘আর কতদিন’। পেশাগত জীবনে তিনি ভারতের আকাশবাণী বেতারের একজন তালিকাভুক্ত গীতিকার ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি প্রায় সাড়ে তিন হাজার কবিতা ও গান লিখেছেন, যার মধ্যে তাঁর প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ছিল ‘দূর দিগন্ত’। তবে ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম চিরতরে অমর হয়ে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছিল ১৯৭১ সালের সেই ঐতিহাসিক ক্যানভাস।

এক খাতা গান এবং স্বাধীন বাংলা বেতারের সেই সন্ধিক্ষণ

১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা আর গণহত্যা চলছে, গোবিন্দ হালদার তখন কলকাতায় আয়কর বিভাগে (Income Tax) কর্মরত। দেশের ভেতরের এই নারকীয় তাণ্ডব আর লাখো শরণার্থীর কষ্ট তাঁর সংবেদনশীল মনকে প্রতিনিয়ত কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।

ঠিক এই সময়ে তাঁর জীবনে এক দেবদূতের মতো আসেন বন্ধু কামাল আহমেদ। তাঁরই অনুপ্রেরণায় এবং অদম্য উৎসাহে গোবিন্দ হালদার খাতা কলম নিয়ে বসে যান বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ওপর গান লিখতে। একের পর এক গান লিখে তিনি একটি খাতা পূর্ণ করেন। বন্ধু কামাল আহমেদ তখন গোবিন্দ হালদারকে নিয়ে যান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম কর্ণধার কামাল লোহানীর কাছে এবং তাঁর হাতে ১৫টি গানের সেই ঐতিহাসিক খাতাটি তুলে দেন।

সেই খাতাটি পাওয়ার পর কামাল লোহানী ও স্বাধীন বাংলা বেতারের সঙ্গীত পরিচালকেরা বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁরা এক মস্ত বড় রত্ন খুঁজে পেয়েছেন। ওই খাতার গানগুলোর মধ্য থেকে স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রথম প্রচারিত হয় প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ সমর দাসের সুরারোপিত “পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে” গানটি। গানটি প্রচারের পর অবরুদ্ধ বাংলাদেশ ও সীমান্তের ওপারে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়।

রণাঙ্গনের অবিনাশী গান ও ১৬ই ডিসেম্বরের সেই সন্ধ্যা

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গোবিন্দ হালদারের সেই খাতা থেকে একের পর এক গান স্বাধীন বাংলা বেতারে সম্প্রচারিত হতে থাকে। তাঁর লেখা গানগুলো স্রেফ বিনোদন ছিল না, সেগুলো ছিল একেকটি যুদ্ধের স্লোগান। তাঁর রচিত কালজয়ী গানগুলোর মধ্যে অন্যতম:

  • মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি
  • পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে
  • এক সাগর রক্তের বিনিময়ে
  • পদ্মা মেঘনা যমুনা
  • লেফট রাইট লেফট রাইট
  • হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার বাংলার মাটি
  • চলো বীর সৈনিক

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ নামক এক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। বিজয়ের সেই ঐতিহাসিক খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই, ওই দিন সন্ধ্যায় স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রথম সম্প্রচারিত হয় গোবিন্দ হালদারের লেখা আরেকটি চিরন্তন মাস্টারপিস—“এক সাগর রক্তের বিনিময়ে”। বাংলাদেশের প্রখ্যাত সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী আপেল মাহমুদের অসাধারণ সুরে গানটিতে মূল কণ্ঠ দিয়েছিলেন স্বপ্না রায়। সহশিল্পী হিসেবে আপেল মাহমুদসহ আরও অনেকেই এই গানে কণ্ঠ মেলান, যা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের থিম সং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও শেষ বিদায়

গোবিন্দ হালদার ছিলেন প্রচারবিমুখ এক নিঃস্বার্থ সাধক। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কলম ধরলেও তিনি কখনো খ্যাতির পেছনে ছোটেননি। তবে বাঙালি জাতি এই মহান শব্দসৈনিকের অবদানকে ভুলে যায়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য, ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করা হয়।

২০১৫ সালের ১৭ই জানুয়ারি কলকাতার একটি হাসপাতালে ৮৫ বছর বয়সে এই মহান গীতিকার শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

গোবিন্দ হালদার | বাঙালি গীতিকার
গোবিন্দ হালদার

গোবিন্দ হালদার হয়তো রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু বাংলাদেশের মানচিত্র, লাল-সবুজ পতাকা আর ১৬ই ডিসেম্বরের প্রতিটা বিজয় দিবসের ভোরের বাতাসে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। যতদিন এই পৃথিবীতে “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি” গানটি গাওয়া হবে, ততদিন বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে গোবিন্দ হালদারের নামটি সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। এই মহান সুরস্রষ্টার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।