বাংলা গান ও সংস্কৃতির আকাশে এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁদের অবদান অনস্বীকার্য, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাঁরা বড্ড অন্তরালে রয়ে গেছেন। তেমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম জেব-উন-নেসা জামাল। ষাটের দশকের প্রথমার্ধের বাংলা গানের ভুবনে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান এবং প্রভাবশালী এক নারী গীতিকার। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের শুরুর দিনগুলোতে তাঁর চেনা কণ্ঠ, কথিকা পাঠ এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার দক্ষতা লক্ষ লক্ষ শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছিল। ঘরের চেনা আঙিনা পেরিয়ে তিনি কীভাবে হয়ে উঠেছিলেন এক কালজয়ী শব্দসৈনিক, সেই গল্পটা সত্যিই ভীষণ অনুপ্রেরণার।
Table of Contents
জেব-উন-নেসা জামাল | বাঙালি গীতিকার

শৈশব, মেধার আলো এবং লেডি ব্রাবোর্ন কলেজের সেই সোনালী দিনগুলো
১৯২৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া নয়, বরং উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী জেলা রাজশাহীতে জন্ম নেন জেব-উন-নেসা জামাল। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বগুড়ার বিখ্যাত ‘হোয়াইট হাউস’ নামক বাড়িতে এবং পিতা ছিলেন তৎকালীন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব কসিরুদ্দিন তালুকদার। ছোটবেলা থেকেই জেব-উন-নেসার মেধার দ্যুতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বগুড়া ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল থেকে ১৯৪১ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক (এসএসসি) পাস করেন।
স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চলে যান কলকাতার নবনির্মিত এবং সমাদৃত লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে。 পড়াশোনায় তাঁর একাগ্রতা কতখানি ছিল, তার প্রমাণ মেলে ১৯৪৩ সালের আই.এ পরীক্ষায়। সে বছর তিনি সমগ্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলায় সর্বোচ্চ নম্বর (৭৮) পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন এবং এই অনন্য কৃতিত্বের জন্য তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘নগেন্দ্র স্বর্ণপদক’ দেওয়া হয়। এরপর ১৯৪৫ সালে একই কলেজ থেকে তিনি বি.এ পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
শিক্ষার প্রতি তাঁর এই তৃষ্ণা জীবনের শেষভাগেও ম্লান হয়নি। বিয়ের অনেক বছর পর, ১৯৬৪ ও ১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যথাক্রমে বাংলা সাহিত্যে এম.এ প্রথম পর্ব এবং শেষ পর্ব (দ্বিতীয় শ্রেণী) সম্পন্ন করেন। তাঁর মেধা ও যোগ্যতার সম্মান জানিয়ে ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে “আধুনিক বাংলা কাব্যে দেশপ্রেম” শীর্ষক গবেষণার জন্য বিশেষ বৃত্তি প্রদান করে।
সংসার ও সুযোগ্য সন্তানদের জননী
১৯৫৪ সালে বগুড়ার পৈতৃক নিবাস ‘হোয়াইট হাউস’-এ এক জাঁকজমকপূর্ণ আবহে সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান সৈয়দ জামাল উদ্দিনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জেব-উন-নেসা। বিয়ের পর তিনি স্বামীর নামের শেষাংশ যুক্ত করে পরিচিত হন ‘জেব-উন-নেসা জামাল’ নামে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন চার সন্তানের এক গর্বিত ও সফল জননী। মায়ের সংস্কৃতির ধারাকে সন্তানেরাও পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়েছিলেন। তাঁর প্রথম সন্তান জীনাত রেহেনা ছিলেন রেডিও ও টেলিভিশনের একজন অত্যন্ত সুপরিচিত ও নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী। দ্বিতীয় সন্তান সৈয়দ নিজামউদ্দিন এবং তৃতীয় সন্তান শামীম বারী—দুজনই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত (এম.এ পাস)। শামীম বারীও মায়ের মতো সমাজবিজ্ঞান পড়ার পাশাপাশি বেতার ও টিভির নিয়মিত একজন গুণী শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন।
কর্মজীবন: ‘ছোট কবি’ থেকে রেডিও-টিভির কাণ্ডারি
জেব-উন-নেসার ভেতরের সাহিত্যিক সত্তাটি জেগে উঠেছিল তাঁর শৈশবেই। ১৯৩৮-৩৯ সালের দিকে, তিনি যখন স্কুলের ছাত্রী, তখনই কলকাতার বিখ্যাত ‘জলছবি’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। মেঘলা দিনের রুদ্র রূপ দেখে সেই ছোট্ট বালিকার মন কেমন আকুল হয়েছিল, তা ফুটে উঠেছিল তাঁর কবিতার এই চরণে:
“আজিকে মেঘের একী ঘনঘটা/ লুকালো কোথায় রবি আলোচ্ছটা?…/ হেরিয়া ধরার এ রুদ্র ছবি/ ভীত চমকিত আমি ছোট কবি।”
এই ‘ছোট কবি’ই একসময় পরিণত বয়সে এসে বাংলা গানের জগতে নিজের রাজত্ব তৈরি করেন। ১৯৬৫ সালের দিকে তিনি একজন চমৎকার কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তান বেতারে (বর্তমান বাংলাদেশ বেতার) আত্মপ্রকাশ করেন। তবে কেবল গায়িকা হিসেবেই নয়, তাঁর মূল দ্যুতি ছড়িয়েছিল অনুষ্ঠান পরিচালনায়। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বেতারের ‘মহিলা মাহফিল’, ‘স্কুল ব্রডকাস্ট’, ‘বুনিয়াদি গণতন্ত্রের আসর’, ‘ঘরোয়া’, ‘অঙ্গনা’, ‘ঘরণী’, ‘সুখী সংসার’ এবং শিশুদের প্রিয় অনুষ্ঠান ‘কলকাকলী’ অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালনা ও প্রযোজনা করেন。
১৯৬৬ সালে তিনি রেডিওর তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসেবে স্বীকৃতি পান। শুধু রেডিওই নয়, বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সৃষ্টিলগ্ন থেকেই তিনি এর সাথে গীতিকার হিসেবে যুক্ত ছিলেন। প্রেমমূলক, দেশাত্মবোধক এবং গভীর আধ্যাত্মিক বা মরমি গান রচনায় তাঁর পারদর্শিতা সমকালীন সময়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
গ্রন্থাবলী: শব্দের মলাটে জীবনের গান
জেব-উন-নেসা জামালের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও যা আছে, তা গুণগত মানে অনন্য। তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ৫টি গীত সংকলন, ১টি গল্পগ্রন্থ এবং ১টি অনুবাদ গ্রন্থ।
১৯৭৯ সালের আগস্টে (ভাদ্র ১৩৮৬) প্রকাশিত হয় তাঁর জীবনের প্রথম গীত সংকলন ‘আমার যতো গান’। ৬৪টি মন ছুঁয়ে যাওয়া গানের এই সংকলনটি তিনি গভীর অনুরাগে উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় স্বামী সৈয়দ জামাল উদ্দিনকে। তাঁর বাকি ৪টি বিখ্যাত গীতগ্রন্থের নাম হলো:
- আরজি
- গান এল মোর মনে
- জাদুর পেনসিল
- সাগরের তীর থেকে
মহাপ্রয়াণ
সংসার, সমাজ, সাহিত্য আর সুরের আঙিনায় আলো ছড়িয়ে ১৯৯৫ সালের ১ এপ্রিল ঢাকার ধানমণ্ডিতে এই গুণী মানুষটি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

জেব-উন-নেসা জামাল এমন এক সময়ে গান লিখেছেন এবং রেডিও-টেলিভিশন সামলেছেন, যখন নারীদের জন্য ঘরের বাইরে বের হওয়াটাই ছিল মস্ত বড় এক সামাজিক চ্যালেঞ্জ। তিনি তাঁর পরিচ্ছন্ন রুচি, মেধা আর শব্দের শক্তি দিয়ে সেই দেয়াল ভেঙেছিলেন। তাঁর লেখা গানগুলোর ভেতরে যে নিখাদ বাঙালি আবেগ আর মরমী সুর লুকিয়ে আছে, তা আজও আমাদের সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে দোলা দেয়। পর্দার আড়ালে থাকা এই সুরের কাণ্ডারিকে বাংলা সংস্কৃতি চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।
