সঙ্গীতের ঘরানা সূচি [Gharana]

সঙ্গীতের ঘরানা [ Gharanas ] বিষয়ে আমাদের আজকের আলোচনা। আমরা জানি, গীত-বাদ্য-নৃত্য এই তিন ললিতকলার সম্মিলনকে বলা হয় সংগীত । পৃথকভাবে গীত-বাদ্য-নৃত্য পরিবেশনের প্রচলিত ও স্বীকৃত ধারা রয়েছে। এই প্রচলিত ধারা বা রীতির মধ্য থেকে বিদগ্ধ প্রতিভাবান কোনো শিল্পী নিজস্ব রীতি ও ভঙ্গিমায় যখন নিজে গীত, বাদ্য কিংবা নৃত্য পরিবেশন করেন এবং তাঁর শিষ্যবৃন্দকে সেই ধারাতেই সংগীতশিক্ষা প্রদান করে থাকেন, কালক্রমে প্রবর্তিত সেই সংগীতশৈলীটি একটি ঘরানায় পরিণত হয়।

 

ঐতিহ্যগত গুরু-শিষ্য সম্পর্ক - জলরঙ, পাঞ্জাব হিলস, ভারত, ১৭৪০
ঐতিহ্যগত গুরু-শিষ্য সম্পর্ক – জলরঙ, পাঞ্জাব হিলস, ভারত, ১৭৪০

সঙ্গীতের ঘরানা

 

প্রত্যেক শিল্পী নিজ নিজ স্বভাব, শিক্ষা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সংগীত (গীত-বাদ্য-নৃত্য) পরিবেশন করে থাকেন। প্রত্যেকেরই গান বা বাজনা কিংবা নৃত্যে তাঁর নিজ ব্যক্তিত্বের কিছু না কিছু প্রভাব পড়ে। শিল্পীর বয়স এবং অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সংগীত কলাকৌশলে তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিত্বের ছাপ গভীরভাবে রেখাপাত করে।

শিল্পী অসাধারণ প্রতিভাবান হলেই তাঁর গীত বা বাদ্য অথবা নৃত্য পরিবেশনের একটি বিশেষ ঢং বা রীতি গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে তাঁর শিষ্যপরম্পরায় ওই বিশেষ রীতি বা ঢং সকলের কাছে বেশ পরিচিত হয়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে, গুরু-শিষ্য-প্রশিষ্য সকলের সংগীত (গীত-বাদ্য-নৃত্য) পরিবেশনের রীতি একই ধরনের হয়।

গুরুর কাছে শিক্ষালাভের সময় শিষ্য সর্বান্তঃকরণে তাঁকে অনুকরণের চেষ্টা করে এবং গুরুজির ব্যক্তিত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এভাবে গুরু-শিষ্য-প্রশিষ্য ধারাবাহিকতায় একটি বিশেষ রীতি বা ঢঙের শৃঙ্খল রচিত হয়, সংগীতের ভাষায় একেই বলে ঘরানা। অবশ্য বাদ্যের ক্ষেত্রে (তবলা) একে বলা হয় বাজ।

ঘরানা শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো উচ্চ বংশজাত বা বিখ্যাত বংশোপন্ন। সংগীতের ক্ষেত্রে ঘরানা শব্দটিও মূলত এই অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে। সাংগীতিক পরিভাষায় কোনো সংগীতশিল্পীর কিংবা সংগীত পরিবারের মৌলিক সৃষ্টি অর্থাৎ গায়নশৈলী যখন সংগীতপ্রেমী ও সর্বসাধারণের মহলে গ্রহণযোগ্যতাসহ প্রতিষ্ঠা লাভ করে তখন তাকে ঘরানা নামে অভিহিত করা হয়।

 

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান এর কাছে তালিম নিচ্ছেন ওস্তাদ আলী আকবর খান ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান এর কাছে তালিম নিচ্ছেন ওস্তাদ আলী আকবর খান ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর

 

গোয়ালিওর ঘারানার উপরে একটি ডকুমেন্টরি :

আবার হিন্দি ভাষায় ‘ঘরানা’ শব্দের অর্থ ‘পরিবার’। তবে শিল্পীসমাজে একই গুরুজির শিষ্য-প্রশিষ্য বা একই সংগীত (গীত-বাদ্য-নৃত্য) পরিবারভুক্ত শিল্পীবৃন্দের গায়নের ঢং বোঝাতে ‘ঘরানা’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। সামগ্রিকভাবে সংগীতশৈলীর (গীত-বাদ্য-নৃত্য) বৈশিষ্ট্য তথা পরিবেশনের বিশিষ্ট প্রয়োগকলাকেই বলা হয় ‘ঘরানা’।

প্রতিটি ঘরানার একজন বিদগ্ধ প্রতিভাবান প্রতিষ্ঠা গুরু থাকেন। তাঁর নিজ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে গায়ন, বাদন বা নৃত্যশৈলী থাকে, সেই ধারাতেই ওই ঘরানা পরিচিতি লাভ করে। চতুর্দশ শতকের প্রথমদিকে ঘরানার উদ্ভব হয়েছে বলে অনুমান করা হয়ে থাকে। অবশ্য তারও আগে ‘কলাবন্ত’ ও ‘কাওয়াল’ নামে দুটি ঘরানা এবং সংগীতের কিছু রীতিনীতি প্রচলিত ছিল।

তথাপি সংগীতগুণীজন ও ঐতিহাসিকগণের মতে, চতুর্দশ শতকেই সুসংবদ্ধভাবে ঘরানার উদ্ভব হয়। ঘরানার প্রবর্তক গুরুজির নামানুসারে কিংবা যে স্থানে গুরুজি ঘরানা সৃষ্টি করেছেন সেই উৎপত্তিস্থলের নাম অনুসারে প্রবর্তিত ঘরানার নামকরণ করা হতো। পরবর্তীকালে সেই বিশেষ শৈলীর ধারক ও বাহকদের ওই ঘরানার শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

আধুনিককালের সংগীতগুণীজনেরা বলেন, সাধারণত তিন পিঁড়ি অর্থাৎ তিন সংগীতপুরুষের পরম্পরায় গড়ে ওঠে ঘরানা এবং প্রতিটি ঘরানার শিল্পীবৃন্দ যুগ যুগ ধরে সেই ধারাবাহিকতাকে সমৃদ্ধ করতে সচেষ্ট থাকেন । ভারতীয় উপমহাদেশে এরকম বেশ কিছু ঘরানা প্রচলিত রয়েছে। যেমন— তানসেন ঘরানা, সেনি ঘরানা, আগ্রা ঘরানা, গোয়ালিয়র ঘরানা, পাতিয়ালা ঘরানা, আল্লাদিয়া ঘরানা, লক্ষ্ণৌ ঘরানা, ডাগর ঘরানা, সেনি-মাইহার ঘরানা ইত্যাদি।

 

অন্নপূর্ণা দেবী তার পিতা ও গুরু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের কাছ থেকে সুরবাহারের তালিম নিচ্ছেন
অন্নপূর্ণা দেবী তার পিতা ও গুরু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের কাছ থেকে সুরবাহারের তালিম নিচ্ছেন

 

ঘরানার শিক্ষা পদ্ধতি [ Gharana Training System ] :

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত প্রতিটি ঘরানায় নিজস্ব শিক্ষাক্রম অনুসারে শিষ্যবৃন্দকে সংগীতশিক্ষা (গীত-বাদ্য-নৃত্য) প্রদান করা হতো। গুরু-শিষ্যপরম্পরায় ঘরানার শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে যেত । ঘরানা প্রবর্তনকারী বিশেষ সম্মানিত গুরুজি নিজ সুবিধামতো সংগীত শিক্ষালয় বা সংগীত আশ্রম গড়ে তুলতেন।

সংগীত শিক্ষার্থী শিষ্যদের দীর্ঘদিন সেখানে অবস্থান করে গুরুসেবা এবং সংগীতশিক্ষা লাভে সচেষ্ট থাকতে হতো। গুরুজির নির্দেশ অনুযায়ী ওই আশ্রমের যাবতীয় কাজকর্ম শিষ্যরা ভাগাভাগি করে সম্পন্ন করত। শিক্ষানবিশকালে কোনো শিষ্যের স্বাধীনতা বা নিজস্বতা বলতে কোনোকিছু থাকত না।

গুরুজি কর্তৃক সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে পরিচালিত হতো। নির্ধারিত সময়ে তালিম গ্রহণ করাসহ নির্দেশিত সময় এবং নিয়মানুযায়ী সংগীত সাধনা ও অনুশীলন চলত। ঘরানা শিক্ষা পদ্ধতির নিয়ম অনুসারে এবং গুরুজি প্রদত্ত আইন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রা অতিবাহিত হতো।

 

গুরু শিষ্য পরম্পরায় শিক্ষা
গুরু শিষ্য পরম্পরায় শিক্ষা

 

গুরুজির ইচ্ছাকেই শিষ্যবৃন্দের নিজ ইচ্ছা মেনে নিয়ে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল মুখ্য বিষয়। কঠোর সাধনা ও নিয়মানুবর্তিতার মধ্য দিয়ে শিক্ষা অর্জন সম্পন্ন হলে গুরুজির অনুমতি লাভ করে কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ মিলত। শিষ্যবৃন্দের মাধ্যমেই পরবর্তীকালে ঘরানার সংগীতশৈলী (গীত-বাদ্য-নৃত্য) বিস্তার লাভ করত।

সাধনা ও নৈপুণ্যের গুণে একসময় শিষ্যদের কেউ কেউ বিশেষ খ্যাতি অর্জন করতেন এবং পরবর্তী সময়ে নিজেও বিশেষ সমৃদ্ধি লাভের মাধ্যমে গুরুজিতে পরিণত হতেন। সেই গুরুজিদের মাধ্যমে ওই ঘরানার নতুন নতুন শিষ্য তৈরি হতো। এভাবেই গুরু-শিষ্যপরম্পরায় নতুন শিল্পী সৃষ্টি হতো এবং বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ত।

এক একটি ঐতিহ্যবাহী ঘরানা কয়েক পুরুষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠা লাভ করত। তবে বলা হয়ে থাকে, সাধারণত তিন পিঁড়ি অর্থাৎ তিন পুরুষের পরম্পরায় গড়ে ওঠে এক একটি সংগীত ঘরানা। নিজ সাধনা দিয়ে প্রতিটি ঘরানার শিল্পীবৃন্দ যুগ যুগ ধরে এই ধারাবাহিকতাকে ধারণ, বহন, লালন ও সমৃদ্ধ করতে সচেষ্ট থাকেন।

 

সঙ্গীতের ঘরানা

 

ঘরানার প্রকারভেদ [ Types of Gharanas ] :

ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতে প্রকৃতিভেদে ঘরানাকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। সেগুলো নিম্নরূপ —

  • গায়ক ঘরানা : গায়ক ঘরানার বিস্তারিত পেতে এই লিংটিতে ক্লিক করুন।
  • বাদক ঘরানা এবং
  • নর্তক ঘরানা।

 

গুরুকুল ব্যবস্থায় শিক্ষা
গুরুকুল ব্যবস্থায় শিক্ষা

 

গায়ক ঘরানা :

বিদগ্ধ প্রতিভাবান গায়কের গীতে বিশিষ্ট প্রয়োগশৈলীর মাধ্যমে যেসকল ঘরানার সৃষ্টি হয়েছে সেগুলোকে বলে গায়ক ঘরানা। এই গায়ক ঘরানাকে আবার চারটি ভাগে শ্রেণিকরণ করা হয়েছে। আর সেগুলো হচ্ছে –

  • ধ্রুপদ ঘরানা
  • খেয়াল ঘরানা
  • ঠুংরি ঘরানা এবং
  • টপ্পা ঘরানা।

বাদক ঘরানা :

বিদগ্ধ প্রতিভাবান বাদকের বিশিষ্ট প্রয়োগশৈলীর মাধ্যমে বাদ্যযন্ত্রের যেসব ঘরানার সৃষ্টি হয়েছে সেগুলোকে বলে বাদক ঘরানা। এই বাদক ঘরানাকে আবার প্রধান দুটি ভাগে শ্রেণিকরণ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে –

  • তবাদক ঘরানা এবং
  • আনদ্ধবাদক ঘরানা।

নর্তক ঘরানা :

বিদগ্ধ প্রতিভাবান নৃত্যশিল্পীর বিশিষ্ট নৃত্যশৈলী ও নৈপুণ্যের মাধ্যমে যে সকল নৃত্য ঘরানার সৃষ্টি হয়েছে সেগুলোকে বলে নর্তক ঘরানা। এটি মূলত নর্তকের নৃত্যশৈলীভিত্তিক ঘরানা। কথক নৃত্যের ভেদ অনুযায়ী নর্তক ঘরানাকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে –

  • লক্ষ্ণৌ কথক ঘরানা
  • জয়পুর কথক ঘরানা এবং
  • বারানসি কথক ঘরানা।

এছাড়া ভরতনাট্যম নৃত্যেরও প্রধান চারটি ঘরানা রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে –

  • তাঞ্জোর ঘরানা
  • থিরুভ্যালর ঘরানা
  • পান্ডানালুর ঘরানা এবং
  • পিল্লাই ঘরানা।

 

ডাগর ভ্রাতাবৃন্দ
ডাগর ভ্রাতাবৃন্দ

 

বাদ্য ঘরানা

  • আজরাড়া ঘরানা

  • ইমদাদ খাঁ ঘরানা

  • করামতউল্লাহ্ ঘরানা

  • গোলাম আলী ঘরানা

  • দিল্লি ঘরানা

  • নিয়ামতউল্লাহ্ খাঁ ঘরানা

  • পাঞ্জাব ঘরানা

  • বারানসি তবলা ঘরানা

  • বেনারস ঘরানা

  • মথুরা ঘরানা লক্ষ্ণৌ ঘরানা

  • শাহ্জাহানপুর ঘরানা

  • সেনি ঘরানা

  • সেনি-মাইহার ঘরানা

 

শিষ্যকে শেখাচ্ছেন পণ্ডিত উলহাস কাশালকার
শিষ্যকে শেখাচ্ছেন পণ্ডিত উলহাস কাশালকার

 

নৃত্য ঘরানা

  • কথক ও ঘরানা

  • লক্ষ্ণৌ ঘরানা

  • জয়পুর ঘরানা বেনারস ঘরানা

  • ভরতনাট্যম ও ঘরানা

  • তাঞ্জোর ঘরানা

  • থিরুভ্যালর ঘরানা

  • পান্ডানাল্লুর ঘরানা

  • পিল্লাই ঘরানা

 

 

YaifwwriN4BzRFCyqbslL4 সঙ্গীতের ঘরানা সূচি [Gharana]
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

উল্লিখিত ঘরানাগুলো ছাড়াও আরো বেশকিছু ঘরানার নাম জানা যায়। বর্ণের ক্রমানুসারে বিভিন্ন ঘরানা সম্পর্কে মোটামুটিভাবে আলোকপাত করা হলো।

 

Leave a Comment