তুমি বিনে আকুল পরান [ Tumi bine akul poran ] | শাহ আবদুল করিম

বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের ভাব ও বিরহ ধারার এক হৃদয়স্পর্শী সৃষ্টি “তুমি বিনে আকুল পরান”। গানটিতে লৌকিক প্রেমের আবরণে মূলত পরমাত্মা বা ‘সোনা বন্ধু’-র বিরহে জীবাত্মার তীব্র ব্যাকুলতা প্রকাশিত হয়েছে। সংসার, কূল-মান এবং পার্থিব সব অহংকার বিসর্জন দিয়ে কেবল প্রেমাস্পদের সান্নিধ্য প্রার্থনা ও তাঁর চরণে আত্মনিবেদনের চিরন্তন বাউল দর্শন এই গানের পরতে পরতে ফুটে উঠেছে। পরবর্তীতে আধুনিক সংগীতাঙ্গনে শিল্পী কাজী শুভর কণ্ঠে ফোক ঘরানায় গানটি নতুনভাবে ধারণ ও পরিবেশিত হলে তা দেশব্যাপী তরুণ প্রজন্মের মাঝেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
গানের নামতুমি বিনে আকুল পরান
গীতিকার ও সুরকারশাহ আবদুল করিম
সংগীতধারাবাউল সংগীত / বিরহ ও মরমি অঙ্গ
মূল উপজীব্যপ্রেমাস্পদের বিরহ, কূল-মান বিসর্জন ও পরমাত্মায় সমর্পণ
কণ্ঠশিল্পী (আধুনিক সংস্করণ)কাজী শুভ
আঞ্চলিক প্রভাবভাটি অঞ্চল (সুনামগঞ্জ, সিলেট)
গ্রন্থ / সংকলনশাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র

তুমি বিনে আকুল পরান [ Tumi bine akul poran ] | শাহ আবদুল করিম

গীতিকারঃ শাহ আবদুল করিম
প্রথম রেকর্ডের কন্ঠশিল্পীঃ কাজী শুভ 

তুমি বিনে আকুল পরান লিরিক্স :

তুমি বিনে আকুল পরান

থাকতে চায়ে না ঘরে রে
সোনা বন্ধু ভুইলনা আমারে রে”(২)
আমি এই মিনতি করি রে
সোনা বন্ধু ভুইলনা আমারে রে……………..।।
সাগরে ভাসাইয়া কূল মান
তোমারে সপিয়া দিলাম
আমার দেহ মন প্রান” (২)
সর্বস্ব ধন করিলাম দান
তোমার চরণ পরে রে………..
সোনা বন্ধু ভুইলনা আমারে রে……………..।।

আমারে ছাড়িয়া যদি যাও

প্রতিজ্ঞা করিয়া বল
তুমি আমার মাথা খাও” (২)
তুমি যদি আমায় কান্দাও
তোমার কান্দন পরে রে……….
সোনা বন্ধু ভুইলনা আমারে রে……………..।।
কুলমান গেলে ক্ষতি নাই আমার,
তুমি বিনে প্রান বাচেনা
কি করিব আর”(২)
তোমার প্রেমও সাগরে
প্রেম সাগরে তোমার
করিম যেন ডুবে মরে রে……
সোনা বন্ধু ভুইলনা আমারে রে……………..।

Tumi Bine Akul Poran [Tumi bine akul poran] | Shah Abdul Karim

Gitikar: Shah Abdul Karim

Prothom recorder konthoshilpi: Kazi Shuvo

Tumi Bine Akul Poran Lyrics:

Tumi bine akul poran

Thakte chaye na ghore re
Shona bondhu bhuilna amare re (2)
Ami ei minoti kori re
Shona bondhu bhuilna amare re……………..।।

Sagore bhasaiya kulman
Tomare sopiya dilam

Amar deho mon pran (2)
Sorbossho dhon korilam dan
Tomar choron pore re………..
Shona bondhu bhuilna amare re……………..।।

Amare chhariya jodi jao

Protiggya koriya bol
Tumi amar matha khao (2)
Tumi jodi amay kandao

Tomar kandon pore re……….
Shona bondhu bhuilna amare re……………..।।

Kulman gele khoti nai amar,

Tumi bine pran bachena
Ki korib ar (2)
Tomar premo sagore
Prem sagore tomar
Karim jeno dube more re……
Shona bondhu bhuilna amare re……………..।।

গানের মূল ভাব

“তুমি বিনে আকুল পরান” গানটির মূল নির্যাস হলো ভালোবাসার জন্য সর্বস্ব ত্যাগের ব্যাকুলতা। বাউল দর্শনে ‘সোনা বন্ধু’ কেবল কোনো পার্থিব ভালোবাসার পাত্র নন; তিনি সাধকের অন্তরের ‘মনের মানুষ’ বা পরমেশ্বর। প্রেমাস্পদের সান্নিধ্য ছাড়া পার্থিব ঘর-সংসারের কোনো মূল্য সাধকের কাছে থাকে না।
এখানে বিরহ কোনো ক্ষণস্থায়ী মানসিক আঘাত নয়, বরং আত্মার মুক্তির পথ। সমাজের শাসন, জাত-কূল এবং লোকলজ্জাকে তুচ্ছ করে প্রেমিকের চরণে দেহ-মন-প্রাণ সঁপে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সেই অনন্ত প্রেমসাগরে নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়াই বাউলের পরম প্রাপ্তি।

চরণ ও স্তবক বিশ্লেষণ

১. ঘরের বন্ধনমুক্তি ও আকুল প্রার্থনা

  • “তুমি বিনে আকুল পরান / থাকতে চায়ে না ঘরে রে / সোনা বন্ধু ভুইলনা আমারে রে…”
    বাউল তত্ত্বে ‘ঘর’ হলো মোহ, জড়তা ও সংসারের সীমানা। পরম প্রেমের স্পর্শ পেলে মন আর সেই সংকীর্ণ ঘরে আবদ্ধ থাকতে চায় না। প্রিয়জনের কাছে একমাত্র মিনতি—দূরত্ব যাই হোক না কেন, স্মৃতির আসন যেন অমলিন থাকে।

২. কূল-মান বিসর্জন ও আত্মোৎসর্গ

  • “সাগরে ভাসাইয়া কূল মান / তোমারে সপিয়া দিলাম আমার দেহ মন প্রান / সর্বস্ব ধন করিলাম দান তোমার চরণ পরে রে…”
    বৈষ্ণব পদাবলীর রাধাভাবের মতো এখানেও সামাজিক আভিজাত্য বা সুনামকে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নিজের শারীরিক ও আত্মিক অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে চরণে সমর্পণ করে প্রেমিক নিজেকে নিঃস্ব করার মাঝেই মুক্তির সন্ধান পান।

৩. শপথ ও প্রেমের গভীরতা

  • “আমারে ছাড়িয়া যদি যাও / প্রতিজ্ঞা করিয়া বল তুমি আমার মাথা খাও…”
    লোকজ সংস্কৃতির একান্ত আপন ভঙ্গিতে শপথ ও অনুযোগ করা হয়েছে। প্রিয়জন ছেড়ে গেলে যে হৃদয় ভেঙে যাবে এবং সেই বেদনার প্রভাব পরোক্ষভাবে অপর প্রান্তেও পড়বে, তা এখানে গভীর ভালোবাসার ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে।

৪. প্রেমসাগরে আত্মবিলোপ

  • “কুলমান গেলে ক্ষতি নাই আমার, তুমি বিনে প্রান বাচেনা… / তোমার প্রেম সাগরে করিম যেন ডুবে মরে রে…”
    গানের ভণিতায় সাধক শাহ আবদুল করিম নিজের চূড়ান্ত ইচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। প্রেমাস্পদের বিরহে বেঁচে থাকার চেয়ে তাঁর ভালোবাসার অথৈ সাগরে ডুবে প্রাণ বিসর্জন দেওয়াকেই পরম সার্থকতা হিসেবে বরণ করে নেওয়া হয়েছে।

গানের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

  • বৈষ্ণব ও সুফি দর্শনের মেলবন্ধন: পদাবলীকীর্তনের বিরহভাব এবং সুফি ধারার ‘ফানা’ বা পরম সত্তায় বিলীন হওয়ার দর্শন এখানে একাকার হয়ে গেছে।
  • সহজ মেঠো উপমা: কোনো দুর্বোধ্য রূপক ছাড়াই দৈনন্দিন গ্রামীণ ভাষার সহজ ও আন্তরিক প্রকাশভঙ্গি গানটিকে সার্বজনীন করে তুলেছে।
  • ভণিতার প্রয়োগ: চিরায়ত বাউল ও পদাবলী গানের নিয়ম অনুসারে শেষ স্তবকে রচয়িতার নাম (“করিম যেন ডুবে মরে রে”) অন্তর্ভুক্ত করে আত্মনিবেদনের ভাব সুসংহত করা হয়েছে।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও আধুনিক রূপায়ন

  • সুর ও গায়কী: ভাটি অঞ্চলের ধীর লয়ের উদাস সুর এবং বাউল গানের গভীর মরমিয়াবাদ গানটির মূল কাঠামো। দোতারা, একতারা ও বাঁশির সংমিশ্রণে এর সুর আবহ তৈরি হয়।
  • আধুনিক সংস্করণ: কাজী শুভর মিষ্টি ও আবেগঘন কণ্ঠে ফোক-ফিউশন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে গানটি নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশিত হওয়ার পর শহরের শ্রোতাদের কাছেও ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। মূল বাউল সুরের নির্যাস অক্ষুণ্ণ রেখেই আধুনিক রিদমের ব্যবহার গানটিকে গতিশীল করেছে।

রচনাপ্রেক্ষিত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটানো শাহ আবদুল করিম সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদে রূপ দিয়েছেন। সামাজিক অনগ্রসরতা ও দারিদ্র্যের মাঝেও তিনি যে মানবিক ও আত্মিক ব্যাকুলতার গান রচনা করেছিলেন, “তুমি বিনে আকুল পরান” তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গানটি বাংলার লোকসংগীতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি আধুনিক যুগেও পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে সমান প্রাসঙ্গিক হয়ে টিকে রয়েছে।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. বাউল শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র, সিলেট।
  2. শাহ আবদুল করিম স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনা: সুমনকুমার দাশ, অন্বেষা প্রকাশন।
  3. বাংলাদেশ লোকসংগীত ও লোকসংস্কৃতি গবেষণা আর্কাইভ।

 

 

 

 

কাজী শুভঃ

কাজী শুভ একজন অন্যতম জনপ্রিয় বাংলাদেশী কন্ঠশিল্পী।কাজী শুভর আসল নাম কাজী আশিকুর রহমান, ডাক নাম  কাজী শুভ। তার বাবা কাজী শাহ আলম ও মা ফাতেমা খাতুন। তিনি ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সালে বরিশালের বিজয়পুরে জন্ম গ্রহণ করেন। গানে তার দীক্ষা শুরু হয় বাবার হাত ধরে তবলা শেখার দ্বারা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি প্রথমে খুলনার “এসো গান শিখি” থেকে এবং “উদীচী” থেকে তবলা বাজানো শিখেছিলেন।তার গান গাওয়ার প্রতি খুব আকর্ষণ ছিল। তিনি তার বড় ভাই কাজী আতিকুর রহমান এর কাছ হতে অনুপ্রাণিত হন গান গাইতে। তার বড় ভাইয়ের ডায়েরি থেকে তিনি অনেকগুলি গান মুখস্থ করেছিলেন।

 

 

 

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।