‘উত্তরাধিকার’ ঘিরে আইয়ুব বাচ্চুর গান নিয়ে বিতর্ক

কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ও ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর সৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ সংগীত প্রকল্প ‘উত্তরাধিকার’। প্রয়াত এই শিল্পীর জনপ্রিয় ২০টি গান নতুন সংগীতায়োজন ও পরিবেশনায় তুলে ধরেছেন সমসাময়িক শিল্পী ও ব্যান্ডের সদস্যরা। আইয়ুব বাচ্চুর গানকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করানো এবং তার সৃষ্টিকে সংরক্ষণের ভাবনা থেকেই নেওয়া হয়েছে এই উদ্যোগ।

প্রকল্পটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিকল্পনা। ‘উত্তরাধিকার’ থেকে অর্জিত অর্থ আইয়ুব বাচ্চুকে ঘিরে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, উদ্যোগটির লক্ষ্য কেবল পুরোনো গান নতুনভাবে প্রকাশ করা নয়; একই সঙ্গে শিল্পীর সংগীতজীবন, স্মৃতি ও সৃষ্টিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

তবে প্রকাশের পর থেকেই প্রকল্পটি প্রশংসার পাশাপাশি বিতর্কের মুখেও পড়েছে। বিশেষ করে ‘ঘুমন্ত শহরে’ গানটির নতুন পরিবেশনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শ্রোতাদের একাংশ তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন উপলক্ষে গত ১৬ আগস্ট প্রকাশ করা হয় ‘উত্তরাধিকার’-এর প্রথম গান ‘রুপালি গিটার’। এতে কণ্ঠ দিয়েছেন বাপ্পা মজুমদার। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটি গান প্রকাশিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সাতটি গানের মধ্যে অদিত রহমানের কণ্ঠে ‘ঘুমন্ত শহরে’ সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

নতুন সংস্করণে শুধু সংগীতায়োজনেই পরিবর্তন আনা হয়নি, গায়কীতেও যোগ হয়েছে ভিন্ন মাত্রা। অদিত রহমান নিজের গায়কীর ধরন অনুসরণ করে গানটি পরিবেশন করেছেন। কিন্তু এই পরিবর্তনই আইয়ুব বাচ্চুর একাংশের ভক্তের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাদের অভিযোগ, নতুনত্ব আনার চেষ্টায় গানটির মূল আবেগ, অনুভূতি এবং পরিচিত আবেদন অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

আইয়ুব বাচ্চুর গানের সঙ্গে শ্রোতাদের দীর্ঘদিনের আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। তার কণ্ঠ, গিটারবাদন এবং পরিবেশনার নিজস্ব ধরন গানগুলোকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। ফলে সেই গান নতুনভাবে পরিবেশন করা হলে শ্রোতাদের প্রত্যাশাও থাকে ভিন্ন। কেউ নতুন সংগীতায়োজনকে স্বাগত জানালেও অন্যদের কাছে মূল গানের আবহ ও অনুভূতি অক্ষুণ্ন রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

‘ঘুমন্ত শহরে’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সেই দ্বন্দ্বই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিছু শ্রোতা গানটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ দাবি পূরণ না হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেছেন। তবে এসব বক্তব্য মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া। বাস্তবে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এক শ্রোতার মন্তব্য, আইয়ুব বাচ্চুর গানকে এভাবে উপস্থাপন করা উচিত হয়নি এবং নতুন সংস্করণে মূল গানের প্রাণ খুঁজে পাওয়া কঠিন। আরেক শ্রোতার কাছে গানটির নতুন রূপান্তর একেবারেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। এ ধরনের আরও মন্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে হতাশা, ক্ষোভ ও পুরোনো গানের প্রতি গভীর আবেগ।

তবে ‘উত্তরাধিকার’ নিয়ে সব প্রতিক্রিয়া যে নেতিবাচক, তা নয়। আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিল্পী তার গান ও গিটার পরিবেশন করেছেন। এর মধ্যে মোল্লা বাবুর কণ্ঠে ‘কষ্ট কাকে বলে’ গানটির পরিবেশনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা পেয়েছে।

‘উত্তরাধিকার’ প্রকল্প এবং ‘ঘুমন্ত শহরে’ নিয়ে নিজের অবস্থানও জানিয়েছেন মোল্লা বাবু। তিনি বলেছেন, আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার গান গাইতে চান। তার মতে, প্রকল্পটির অধিকাংশ আয়োজন সুন্দর হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা দেখে কৌতূহলী হয়ে ‘ঘুমন্ত শহরে’ শুনেছেন তিনি। নতুন পরিবেশনায় আইয়ুব বাচ্চুর মূল গানের সেই পরিচিত আবেদন তিনি খুঁজে পাননি বলেও জানিয়েছেন।

এদিকে প্রকল্পটি প্রকাশের পর আলোচনায় আসে আইয়ুব বাচ্চুর দীর্ঘদিনের সহযাত্রী ও গিটারিস্ট আব্দুল্লাহ আল মাসুদের নাম। তিনি দীর্ঘ সময় এলআরবির সঙ্গে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত এবং শিল্পীর মৃত্যুর পর তার গান ও সৃষ্টিকে ঘিরে বিভিন্ন উদ্যোগে কাজ করে আসছিলেন।

তবে ‘উত্তরাধিকার’ নিয়ে তৈরি বিভ্রান্তি দূর করতে আব্দুল্লাহ আল মাসুদ স্পষ্ট করেছেন, এই প্রকল্পের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির শুরু থেকে প্রকাশ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা কিংবা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তিনি যুক্ত ছিলেন না।

তার এই বক্তব্য বিতর্কে নতুন একটি দিক সামনে এনেছে। প্রয়াত কোনো শিল্পীর গান নতুন করে পরিবেশনের ক্ষেত্রে শুধু কণ্ঠ বা সংগীতায়োজনের বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা, সৃষ্টির প্রতি দায়বদ্ধতা এবং প্রকল্পের উদ্দেশ্যও শ্রোতাদের আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে।

আইয়ুব বাচ্চুর গান বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে। তার কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য, গিটারবাদনের দক্ষতা এবং গান পরিবেশনের নিজস্ব ভঙ্গি তাকে কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। তার মৃত্যুর পরও সেই জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং নতুন প্রজন্মের মধ্যেও তার গান নতুন করে আবিষ্কৃত হচ্ছে।

সেই জায়গা থেকেই ‘উত্তরাধিকার’-এর মতো উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে। পুরোনো গান নতুন শিল্পীর কণ্ঠে পৌঁছালে নতুন শ্রোতাদের কাছে সেগুলো পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে—নতুন সংগীতায়োজন কতটা স্বাধীন হবে এবং কোন পর্যায়ে গিয়ে মূল সৃষ্টির আবেগ ও স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে?

‘উত্তরাধিকার’ ঘিরে বর্তমান বিতর্ক মূলত সেই প্রশ্নকেই সামনে এনেছে। একটি প্রয়াত শিল্পীর গান নতুন করে পরিবেশনের ক্ষেত্রে নতুনত্বের সঙ্গে শ্রদ্ধা, সৃজনশীল স্বাধীনতার সঙ্গে মূল সৃষ্টির পরিচয় এবং আধুনিক আয়োজনের সঙ্গে পুরোনো আবেগের ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে—তা নিয়েই চলছে আলোচনা।

ফলে ‘ঘুমন্ত শহরে’ নিয়ে সমালোচনা শুধু একটি গানকে ঘিরে শ্রোতাদের পছন্দ-অপছন্দের বিষয় হয়ে থাকেনি। এটি আইয়ুব বাচ্চুর সৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পদ্ধতি নিয়েও বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে রয়েছে তার গানকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন, অন্যদিকে রয়েছে সেই গানগুলোর স্বকীয়তা ও আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা। ‘উত্তরাধিকার’ প্রকল্পের পরবর্তী প্রকাশনা ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের দিকে তাকিয়ে এখন সংগীতপ্রেমীদের আগ্রহ আরও বাড়ছে।

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।