বাঙালি লোকসংগীত ও মরমি বিচ্ছেদগীতির ধারায় এক অনন্য আধ্যাত্মিক ও আত্মবিলোপী সৃষ্টি “তোমারে পাইলাম না আমি”। বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী, বংশীবাদক ও সুরকার বারী সিদ্দিকীর গম্ভীর, দরদি ও আর্তিভরা কণ্ঠের জাদুতে গানটি এক অভাবনীয় নান্দনিক উচ্চতা লাভ করেছে। পার্থিব প্রেমের না-পাওয়ার ক্ষোভকে ছাপিয়ে ভালোবাসার মানুষের প্রতি নিঃশর্ত সমর্পণের যে পরম আত্মতৃপ্তি, তা গানটিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে। লোকায়ত বাউল দর্শন এবং সুফি আধ্যাত্মিক চেতনার সংমিশ্রণে রচিত এই গান প্রমাণ করে যে, প্রকৃত প্রেম কোনো পাওয়ার হিসাবে বন্দি নয়; নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দেওয়ার মাঝেই লুকিয়ে থাকে প্রেমের চরম সার্থকতা।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| গানের নাম | তোমারে পাইলাম না আমি |
| মূল কণ্ঠশিল্পী | বারী সিদ্দিকী (Bari Siddiqui) |
| সুরকার | বারী সিদ্দিকী |
| গীতিকার | বারী সিদ্দিকী |
| সংগীতধারা | বাংলা আধুনিক লোকসংগীত / মরমি বাউল-বিচ্ছেদ গান |
| সুরশৈলী | রাগাশ্রয়ী মেঠো সুর ও বংশীধ্বনিপ্রধান করুণ আবহ |
| মূল উপজীব্য | প্রতিদানহীন অনুরাগ, নিঃশর্ত সমর্পণ, প্রাপ্তিহীন আত্মতৃপ্তি ও পরকালের ব্যাকুলতা |
| প্রধান চিত্রকল্প | ঠুনকো জীবন, না-পাওয়ার হিসাব, সাধের জনম বন্ধক, জীবনের ওপার |
| আবেগীয় আবহ | প্রশান্ত বিরহ, গভীর আত্মনিবেদন ও আধ্যাত্মিক আর্তি |
তোমারে পাইলাম না আমি লিরিক্স
তোমারে পাইলামনা আমি
তাতে দুঃখ নাই…….
আমি যে তোমার হইয়াছি
এই ভেবে সুখ পাই!!!
তোমারে পাইলামনা আমি
তাতে দুঃখ নাই…….
আমি যে তোমার হইয়াছি
এই ভেবে সুখ পাই!!!
আমি যে তোমার হইয়াছি
এই ভেবে সুখ পাই!!!
ঠুনকো জীবন স্বপ্ন যেমন
গড়া সুখে দুঃখে…
কি পাইলামনা এই ভেবে বুক
ভরবো না আর সুখে
ঠুনকো জীবন স্বপ্ন যেমন
গড়া সুখে দুঃখে
কি পাইলামনা এই ভেবে বুক
ভরবো না আর সুখে
আমি কেবল কি পাইয়িলাম
হিসাব রাখতে চাই তার…
আমি কেবল কি পাইয়িলাম
হিসাব রাখতে চাই
আমি যে তোমার হইয়াছি
এই ভেবে সুখ পাই!!!
আমি যে তোমার হইয়াছি
এই ভেবে সুখ পাই!!!
জীবনের ঐ পাড়ে যদি
অন্য জীবন থাকে….
সাধের জনম বন্দক দিয়া
পাই যেন তোমাকে
জীবনের ঐ পাড়ে যদি
অন্য জীবন থাকে….
সাধের জনম বন্দক দিয়া
পাই যেন তোমাকে
জনম জনম আমার সুরে
তোমারি গান গাই, আয় ……
জনম জনম আমার সুরে
তোমারি গান গাই
আমি যে তোমার হইয়াছি
এই ভেবে সুখ পাই!!!
আমি যে তোমার হইয়াছি
এই ভেবে সুখ পাই!!!
তোমারে পাইলামনা আমি
তাতে দুঃখ নাই…….
আমি যে তোমার হইয়াছি
এই ভেবে সুখ পাই!!!
আমি যে তোমার হইয়াছি
এই ভেবে সুখ পাই!!!
Tomare Pailam Na Ami Lyrics
Tomare pailam na ami
Tate dukkho nai…….
Ami je tomar hoiyachhi
Ei bhebe sukh pai!!!
Tomare pailam na ami
Tate dukkho nai…….
Ami je tomar hoiyachhi
Ei bhebe sukh pai!!!
Ami je tomar hoiyachhi
Ei bhebe sukh pai!!!
Thunko jibon shopno jemon
Gora sukhe dukkhe…
Ki pailam na ei bhebe buk
Bhorbo na ar sukhe
Thunko jibon shopno jemon
Gora sukhe dukkhe
Ki pailam na ei bhebe buk
Bhorbo na ar sukhe
Ami kebol ki paiyilam
Hisab rakhte chai tar…
Ami kebol ki paiyilam
Hisab rakhte chai
Ami je tomar hoiyachhi
Ei bhebe sukh pai!!!
Ami je tomar hoiyachhi
Ei bhebe sukh pai!!!
Jiboner oi pare jodi
Onno jibon thake….
Shadher jonmo bondok diya
Pai jeno tomake
Jiboner oi pare jodi
Onno jibon thake….
Shadher jonmo bondok diya
Pai jeno tomake
Jonmo jonmo amar shure
Tomari gaan gai, ay ……
Jonmo jonmo amar shure
Tomari gaan gai
Ami je tomar hoiyachhi
Ei bhebe sukh pai!!!
Ami je tomar hoiyachhi
Ei bhebe sukh pai!!!
Tomare pailam na ami
Tate dukkho nai…….
Ami je tomar hoiyachhi
Ei bhebe sukh pai!!!
Ami je tomar hoiyachhi
Ei bhebe sukh pai!!!
গানের মূল ভাব
“তোমারে পাইলাম না আমি” গানটির মূল ভিত্তি হলো জাগতিক প্রেমের অধিকারবোধ ও স্বার্থপরতাকে বিসর্জন দিয়ে পরম ভালোবাসায় নিজেকে বিলীন করা। সাধারণ মানবীয় ভালোবাসায় মানুষকে অধিকার করার বা ‘পাওয়ার’ আকাঙ্ক্ষাই মুখ্য হয়ে ওঠে; আর সেই চাওয়া পূরণ না হলে জন্ম নেয় তিক্ততা ও হাহাকার। কিন্তু এই গানে প্রেমিক সেই লৌকিক হিসাব-নিকাশ অতিক্রম করে এক নির্লিপ্ত আধ্যাত্মিক আনন্দে পৌঁছেছেন। প্রিয় মানুষটি তাকে আপন করে না নিলেও, সে নিজে যে তার হয়ে গেছে—এই আত্মোপলব্ধিই সমস্ত বেদনার সান্ত্বনা।
গানটিতে জীবনকে দেখা হয়েছে এক ক্ষণস্থায়ী বা ‘ঠুনকো’ বুদ্বুদ হিসেবে, যা সুখ-দুঃখের দোলাচলে তৈরি। নশ্বর জীবনের না-পাওয়ার খতিয়ান নিয়ে বুক ভার না করে প্রেমিক কেবল তার সমর্পণের আনন্দটুকুর হিসাব রাখতে চায়। পার্থিব জগতের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে পরকালের অনন্ত জীবনে নিজের অস্তিত্ব বন্ধক রেখে হলেও প্রিয়তমকে পাওয়ার যে তীব্র ব্যাকুলতা, তা গানটিকে সাধারণ প্রেমের সীমানা ছাড়িয়ে মরমি ঈশ্বর-অন্বেষার স্তরে পৌঁছে দেয়।
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. সমর্পণের আত্মতৃপ্তি ও প্রাপ্তির অসারতা
- “তোমারে পাইলাম না আমি তাতে দুঃখ নাই / আমি যে তোমার হইয়াছি এই ভেবে সুখ পাই…”গানটির সূচনাই হয় এক বৈপ্লবিক মানসিক অনুভূতির প্রকাশ দিয়ে। ভালোবাসা যে পাওয়ার ওপর নির্ভর করে না, বরং নিজের অনুভূতির শুদ্ধতায় বেঁচে থাকে—এই চিরন্তন সত্যটি এখানে প্রকাশিত। প্রিয়জনের অনুপস্থিতিও প্রেমিকের আত্মিক আনন্দে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।
২. ক্ষণভঙ্গুর অস্তিত্ব ও অপ্রাপ্তির হিসাব বর্জন
- “ঠুনকো জীবন স্বপ্ন যেমন গড়া সুখে দুঃখে / কি পাইলাম না এই ভেবে বুক ভরবো না আর সুখে / আমি কেবল কি পাইলাম হিসাব রাখতে চাই তার…”জীবনের নশ্বরতাকে উপলব্ধি করার প্রজ্ঞা। স্বপ্ন যেমন মিলিয়ে যায়, তেমনি মানবজীবনও ক্ষণস্থায়ী। যা পাওয়া যায়নি তা নিয়ে ক্ষোভ জমিয়ে না রেখে, ভালোবেসে অন্তরে যে আত্মিক প্রাপ্তি ঘটেছে, কেবল তার স্মৃতিটুকুই প্রেমিক হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখতে চায়।
৩. পরপারের অন্বেষণ ও জনম বন্ধকের আর্তি
- “জীবনের ঐ পাড়ে যদি অন্য জীবন থাকে / সাধের জনম বন্দক দিয়া পাই যেন তোমাকে…”ভালোবাসার অনন্ত ব্যাপ্তি। এই নশ্বর জনমে মিলন না হলেও আশা ফুরিয়ে যায় না। মৃত্যুর ওপারে যদি আরেকটি জীবনের অস্তিত্ব থাকে, তবে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান ‘সাধের জনম’ বন্ধক রেখে হলেও প্রিয়তমের সান্নিধ্য পাওয়ার এই আর্তি বৈষ্ণব বা সুফি সমর্পণের সমতুল্য।
৪. সুরের মাধ্যমে শাশ্বত আরাধনা
- “জনম জনম আমার সুরে তোমারি গান গাই…”শিল্প ও প্রেমের মিলন। সাধক বা শিল্পী বেঁচে থাকে তার সৃষ্টির সুরে। প্রতিটি জন্মে নিজের কণ্ঠ ও বাঁশির সুরে কেবল প্রিয়জনের আরাধনা করে যাওয়ার সংকল্পের মধ্য দিয়ে প্রেম এখানে এক চিরন্তন ধ্যানে রূপ নিয়েছে।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
সাহিত্যিক ও লোকজ বৈশিষ্ট্য
- সহজিয়া দর্শনের প্রকাশ: কোনো কৃত্রিম অলংকার ছাড়াই আবহমান বাংলার লোকায়ত সহজিয়া ভাষায় (“ঠুনকো জীবন”, “সাধের জনম বন্দক দিয়া”) গভীর দার্শনিক তত্ত্বকে প্রকাশ করা হয়েছে।
- সুফি ও দেহতত্ত্বের আবহ: ঈশ্বর বা পরমাত্মাকে প্রেমিক হিসেবে কল্পনা করে নিজের আত্মাকে তাঁর চরণে উৎসর্গ করার সুফিবাদী ‘ফানা’ দর্শনের সাথে গানটির বাণীর নিবিড় মিল রয়েছে।
- ধ্বনিমাধুর্য ও কথ্য সারল্য: “হইয়াছি-পাই”, “দুঃখে-সুখে”, “থাকে-তোমাকে”-র মতো দেশজ ছন্দগান গানটিকে মাটির মানুষের একান্ত অনুভূতির সুরে পরিণত করেছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- বারী সিদ্দিকীর গায়কীর গভীরতা: ওস্তাদ গোপাল কৃষ্ণ এবং পণ্ডিত ভি জি কার্ণাডের কাছে শাস্ত্রীয় বংশীবাদনে দীক্ষিত বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠস্বরে ছিল এক প্রাকৃত মন্দ্রতা ও উদাসীনতা। তাঁর কণ্ঠের দীর্ঘ গমক ও মীড় গানের প্রতিটি শব্দকে ব্যথাতুর করে তোলে।
- বাঁশির বিষাদময় আবহ: গানটির মূল চলনে বাঁশির যে মায়াবী সুর ও শূন্যতার তান ব্যবহৃত হয়েছে, তা কথাগুলোকে ছাপিয়ে এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গ পরিবেশ রচনা করে।
- ধীর লয়ের চলন: গানের তাল ও লয় অত্যন্ত সংযত এবং ধীর, যা শ্রোতাকে কোলাহলমুক্ত করে অন্তর্মুখী ভাবনায় নিমগ্ন হতে বাধ্য করে।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- বারী সিদ্দিকী (১৯৫৪–২০১৭): বাংলাদেশের সংগীত জগতের এক বিরল প্রতিভাবান সংগীতসাধক। তিনি একাধারে ক্ল্যাসিক্যাল বংশীবাদক, লোকসংগীতশিল্পী ও সুরস্রষ্টা ছিলেন। দীর্ঘদিন সংগীতের নেপথ্যে বাঁশি বাজানোর পর কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তিনি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলেন। “শুয়াচান পাখি”, “আমার গায়ে যত দুঃখ সয়”, “পূবালী বাতাসে”-র মতো তাঁর অজস্র গান বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে।
- লোক ও উচ্চাঙ্গের সেতুবন্ধন: লোকসংগীতের মেঠো সুরের সাথে শাস্ত্রীয় সংগীতের সূক্ষ্ম কারুকাজ মিলিয়ে একটি স্বতন্ত্র সংগীতধারা নির্মাণ করেছিলেন তিনি।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- বারী সিদ্দিকী নির্বাচিত লোক ও আধুনিক সংগীত সংগ্রহশালা।
- বাংলা লোকসংগীতের মরমি ধারা ও বারী সিদ্দিকী সমীক্ষা।
- বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশন অডিও আর্কাইভ।
সব ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত বাংলা গানের কথা সংগ্রহ করে সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য প্রকাশে কাজ করছে ‘লিরিক ডেস্ক’। আপনার কাঙ্ক্ষিত গানটি আমাদের ওয়েবসাইটে না পেলে জানান; আমরা তা সংগ্রহ করে দ্রুত আপলোড করে দেব।











![তত্ত্ব দিন কি রাতে সাজ প্রভাতে [ Din Ki Rate Saj Provate ]](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2024/02/maxresdefault-6-1024x576.webp)

