শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রথমবারের মতো ভারতের মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করতে যাচ্ছে চট্টগ্রামের সনাতনী ব্যান্ড ‘টিম বৃষ্টি’। ভারতের আসাম রাজ্যের হাইলাকান্দি জেলার মাধবপুর গ্রামে আয়োজিত দুর্গাপূজার অনুষ্ঠানে অংশ নেবে দলটি। মাধবপুর নবদুর্গা পূজা কমিটির আমন্ত্রণে ২১ অক্টোবর ভারতের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে ব্যান্ডটির সদস্যদের। কয়েকটি কনসার্টে অংশ নেওয়ার পর আগামী ২৮ অক্টোবর তাদের বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে।
ধর্মীয় সংগীত, বাংলার লোকজ সুর এবং আধুনিক গানের সমন্বয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিবেশনা তৈরি করেছে টিম বৃষ্টি। বিশেষ করে প্রচলিত ধর্মীয় গানের সঙ্গে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার এবং ফোক ফিউশনের মাধ্যমে শ্রোতাদের কাছে নিজেদের সংগীত তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছে দলটি। এবার সেই পরিবেশনা নিয়ে প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে সংগীতপ্রেমীদের সামনে হাজির হতে যাচ্ছে তারা।
ভারত সফরের কনসার্টগুলোতে আধুনিক ধর্মীয় সংগীতের পাশাপাশি সমসাময়িক লোকগানের ফিউশন পরিবেশনের পরিকল্পনা রয়েছে ব্যান্ডটির। আয়োজনে দুই বাংলার সংগীত ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটবে বলে আশাবাদী দলের সদস্যরা।
টিম বৃষ্টির ম্যানেজার অমিত সাহা প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রথমবারের মতো ভারতের মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ পেয়ে আমরা আনন্দিত ও গর্বিত। এটি আমাদের জন্য একটি বিশেষ অর্জন। আমরা চাই, আমাদের সংগীত ও সংস্কৃতি সারা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে পৌঁছে যাক। দুই বাংলার মানুষের ভালোবাসা ও আশীর্বাদ নিয়েই আমরা মঞ্চে উঠব।’
ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের সংগীতকে তুলে ধরার স্বপ্নের কথাও জানান তিনি। অমিত সাহা বলেন, ‘ভবিষ্যতেও দেশ-বিদেশের আরও বড় বড় মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন দেখি। দর্শকদের ভালোবাসা পেলে আমাদের সে স্বপ্ন পূরণ হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’
সাত সদস্যের টিম বৃষ্টির মূল কণ্ঠশিল্পী বৃষ্টি দে। দলের অন্য সদস্যরা হলেন ইউকুলেলেতে আকাশ দে, বাংলা ঢোলে বাদশা, অক্টোপ্যাডে অমিত সাহা, কিবোর্ডে সুমন দাস, বাঁশিতে ছোটন ঘোষ এবং বেজ গিটারে তন্ময় দত্ত। বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে ধর্মীয় ও লোকজ সংগীতকে নতুন আঙ্গিকে পরিবেশন করে আসছেন তাঁরা।
ব্যান্ডটির যাত্রা শুরু হয় করোনাকালে। ঘরবন্দি জীবনের অবসরে কয়েকজন সমবয়সী সংগীতপ্রেমীর আড্ডা থেকেই গড়ে ওঠে দলটি। সেই আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু ছিল গান। ধীরে ধীরে নিজেদের সংগীতচর্চাকে সংগঠিত করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশনা শুরু করেন সদস্যরা। স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিতি পাওয়ার পর তাঁদের সংগীতচর্চার পরিসরও বাড়তে থাকে।
দলের শুরুর দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করে কণ্ঠশিল্পী বৃষ্টি দে বলেন, ‘আমি চট্টগ্রামের পটিয়ার মেয়ে। আমাদের গানের শুরুটা করোনার সময়। তখন আমরা সবাই ঘরবন্দি। ঠিক সে সময়ই সমবয়সী ভাইদের নিয়ে আড্ডা জমে ওঠে। সে আড্ডার মূল বিষয়ই ছিল গান। গানের আড্ডা থেকেই বিভিন্ন জায়গায় গানের প্রোগ্রাম করি। ব্যান্ডের নামটি আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে তখন থেকেই।’
সংগীতের প্রতি ভালোবাসা এবং নিয়মিত চর্চার মধ্য দিয়েই দলটির পথচলা এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। বৃষ্টি দে বলেন, ‘এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, শুধু সামনের দিকে এগিয়ে চলা। গানকে বিস্তৃত করার জন্য সবাই মিলে টিম বৃষ্টি স্কুল অব মিউজিক নামে একটি গানের স্কুলও গড়ে তুলি। এভাবেই আমাদের চর্চা অব্যাহত রেখেছি আমরা।’
শুধু মঞ্চে গান পরিবেশনেই নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখেনি টিম বৃষ্টি। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সংগীতচর্চার আগ্রহ তৈরি এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘টিম বৃষ্টি স্কুল অব মিউজিক’। সংগীতশিক্ষার এই উদ্যোগ ব্যান্ডটির সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
মঞ্চের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও নিজেদের গান প্রকাশ করছে দলটি। এরই মধ্যে ‘উর্বশী গানের সিঁড়ি’ এবং ‘টিম বৃষ্টি’ ইউটিউব চ্যানেল থেকে বেশ কয়েকটি গান প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘মুখে বেশি কথা কইও না’, ‘কত আপন’, ‘নিজেরে বাসিও ভালো’ এবং ‘মেঘ পাহাড়ে’।
চট্টগ্রামের স্থানীয় সংগীতচর্চা থেকে শুরু করে ভারতের মঞ্চে পরিবেশনার সুযোগ পাওয়া টিম বৃষ্টির জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে। ভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাংলা সংগীতের প্রতি ভালোবাসা দুই দেশের শ্রোতাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের। সেই সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ধারায় নিজেদের পরিবেশনা তুলে ধরতে চান ব্যান্ডটির সদস্যরা।
আসন্ন ভারত সফরকে সংগীতজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখছে টিম বৃষ্টি। প্রথম আন্তর্জাতিক পরিবেশনার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে আশা করছেন তাঁরা। বাংলাদেশের লোকজ ও ধর্মীয় সংগীতের বৈচিত্র্য বিদেশের বাংলা ভাষাভাষী শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন দলটির অন্যতম লক্ষ্য।















