রাগ মিয়া কি সারং । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দরবারে সঙ্গীতসম্রাট মিয়াঁ তানসেনের নাম জড়িয়ে আছে বহু কালজয়ী সৃষ্টির সাথে। তাঁর অনন্য প্রতিভা ও সাধনার ফসল হিসেবে আমরা যেমন পেয়েছি ‘মিয়াঁ কি মল্লার’ কিংবা ‘মিয়াঁ কি টোড়ী’, ঠিক তেমনই এক অসাধারণ এবং রাজকীয় রাগের নাম ‘রাগ মিয়াঁ কি সারং’। দুটি ভিন্ন প্রকৃতির রাগের মেলবন্ধনে তৈরি এই রাগটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এক অনন্য নিদর্শন।

রাগ মিয়াঁ কি সারং

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বোদ্ধা ও সাধারণ শ্রোতা—সবার কাছেই ‘সারং’ অঙ্গের রাগগুলো তাদের চঞ্চল ও মধুর প্রকৃতির জন্য অত্যন্ত প্রিয়। আর যখন এর সাথে যুক্ত হয় তানসেনের নিজস্ব ঘরানা, তখন তার মাধুর্য হয়ে ওঠে অতুলনীয়। কথিত আছে, সঙ্গীতসম্রাট মিয়াঁ তানসেন নিজেই এই রাগটি সৃষ্টি করেছিলেন। এটি মূলত দুটি অত্যন্ত জনপ্রিয় রাগ—‘মিয়াঁ কি মল্লার’ এবং ‘সারং’-এর এক সুনিপুণ ও নান্দনিক মিশ্রণে তৈরি।

সুরের কারুকাজ: কীভাবে মিশেছে মল্লার আর সারং?

এই রাগের চলনে দুই রাগের বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত চমৎকারভাবে ভাগ করা হয়েছে:

  • পূর্বাঙ্গে সারং: রাগের প্রথম অংশে (ণপ, মর, পর) সারং রাগের চেনা রূপটি অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে।
  • উত্তরাঙ্গে মল্লার: রাগের শেষ অংশে অর্থাৎ ওপরের সপ্তকে যাওয়ার সময় (ণ ধ ন র্স) এর মধ্যে মিয়াঁ কি মল্লারের বৃষ্টিভেজা মেঘের গম্ভীর রূপটি প্রকাশ পায়।

স্বরের ক্ষেত্রে এই রাগের আরেকটি বড় বিশেষত্ব হলো, এর আরোহণে শুদ্ধ নিষাদ (ন) এবং অবরোহণে কোমল নিষাদ (ণ) অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যবহার করা হয়।

রাগ মিয়াঁ কি সারং-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী এই রাগের মূল কাঠামোটি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ঠাটের পরিচয় (Thaat): রাগটি উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে কাফি ঠাটের অন্তর্গত এবং এর রাগাঙ্গ হলো সারং।
  • জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো ষাড়ব-ষাড়ব। এর আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই গান্ধার (গা) স্বরটি সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে (৬টি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো ঋষভ (রে)।
  • সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো পঞ্চম (পা)।
  • অঙ্গ (Anga): এটি একটি পূর্বাঙ্গ প্রধান রাগ।
  • পরিবেশনের সময় (Time): রাগ মিয়াঁ কি সারং গাওয়ার বা বাজানোর আদর্শ সময় হলো দিবা দ্বিপ্রহর (দুপুর বেলা)। মধ্যাহ্নের শান্ত পরিবেশে এই রাগের সুর এক অনন্য শান্তি এনে দেয়।

 

আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়

রাগের সেই রাজকীয় গতিপ্রকৃতি ও দুই রাগের মিশ্রণটি বোঝার জন্য এর প্রধান স্বরলিপি নিচে দেওয়া হলো:

আরোহণ: স র ম র, প মপ, ণধনর্স

অবরোহণ: র্স ণপ, ণপ, মর ন্‌স

পকড় (রাগের মূল রূপ): মরপ, মপ, মর স, ণ্‌ধ্ ন্‌স

তথ্যসূত্র

এই রাগের তাত্ত্বিক ও ক্রিয়াত্মক পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণের জন্য প্রখ্যাত সঙ্গীত গবেষক শক্তিপদ ভট্টাচার্য রচিত এবং ১৫ এপ্রিল ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত ‘উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত’ গ্রন্থটির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

রাগ মিয়া কি সারং
রাগ মিয়া কি সারং

রাগ মিয়াঁ কি সারং আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রাচীন পণ্ডিতেরা সুরের মিশ্রণে কতটা পারদর্শী ছিলেন। একদিকে সারং-এর চঞ্চলতা আর অন্যদিকে মল্লারের গম্ভীর আবহের এই মেলবন্ধন দুপুরের অলস সময়কে এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে ফেলে।

মিয়াঁ তানসেনের এই অমর সৃষ্টি নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজনটি আপনার কেমন লাগল, তা আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে সঙ্গীতপ্রেমী বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।