লুকিয়ে ভালোবাসবো তারে – গীতা ঘটক (সুর: গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়)

বাংলা পুরাতনী ও লঘু শাস্ত্রীয় সংগীতের সমৃদ্ধ ধারায় আত্মমর্যাদাপূর্ণ একতরফা প্রেম ও নিভৃত অনুরাগের এক অসাধারণ ধ্রুপদী নিদর্শন “লুকিয়ে ভালোবাসবো তারে”। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও পণ্ডিত গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাগাশ্রয়ী সুষম সুরে এবং রবীন্দ্রসংগীত ও পুরাতনী গানের বিশিষ্ট শিল্পী গীতা ঘটকের দরদি ও পরিশীলিত কণ্ঠে গানটি বাংলা সংগীতের এক অমূল্য রত্ন হিসেবে স্বীকৃত।

প্রেমাস্পদের কাছে কোনো প্রতিদান বা স্বীকৃতির প্রত্যাশা না করে ভালোবাসাকে অন্তরের নিভৃত মন্দিরে পূজা করার যে আত্মসংযম ও নীরব আত্মত্যাগ, তা এই গানে এক অনুপম ও বিরল সৌন্দর্য লাভ করেছে।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
গানের নামলুকিয়ে ভালোবাসবো তারে
মূল কণ্ঠশিল্পীগীতা ঘটক (Gita Ghatak)
সুরকারগোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় (বিষ্ণুপুর ঘরানা)
সংগীতধারাবাংলা পুরাতনী গান / টপ্পা অঙ্গের রাগাশ্রয়ী গান
মূল উপজীব্যনিভৃত অনুরাগ, আত্মমর্যাদাবোধ, একতরফা ভালোবাসা ও নিঃশর্ত সমর্পণ
প্রধান দর্শনপ্রতিদানহীন প্রেম, প্রিয়জনকে ভারমুক্ত রাখা ও অন্তরের পূজারী হওয়া
সুরশৈলীধ্রুপদী ভাবাশ্রয়ী চাল ও সূক্ষ্ম অলংকরণ

লুকিয়ে ভালোবাসবো তারে লিরিক্স

লুকিয়ে ভালোবাসবো তারে
জানতে দিব না ,
জানলে পরে প্রাণ নেবে সে
প্রাণ তো দিবে না ।
সে যদি না করে আদর
করব না তায় অনাদর
চোখে চোখে চাইলে পরে

ফিরে চাইব না ।
লুকিয়ে ভালোবাসব তারে
জানতে দিব না
জানতে দিব না ,
জানতে দিব না
লুকিয়ে ভালোবাসব তারে
জানতে দিব না ।
বসায়ে হৃদি – সিংহাসনে
হাসব কাঁদব আপন মনে ,
ভেসেছি আপনি ভাসি
তায় ভাসাব না ।
লুকিয়ে ভালোবাসব তারে
জানতে দিব না
জানতে দিব না ,
জানতে দিব না
লুকিয়ে ভালোবাসব
তারে জানতে দিব না ।

 

Lukiye Bhalobashbo Tare Lyrics

Lukiye bhalobashbo tare
Jante dibo na,
Janle pore pran nebe se
Pran to dibe na.

Se jodi na kore ador
Korbo na tay anador,
Chokhe chokhe chaile pore
Phire chaibo na.

Lukiye bhalobashbo tare
Jante dibo na,
Jante dibo na,
Jante dibo na.
Lukiye bhalobashbo tare
Jante dibo na.

Bosaye hridi-singhasone
Hashbo kadbo apon mone,
Veshechi apni vashi
Tay vashabo na.

Lukiye bhalobashbo tare
Jante dibo na,
Jante dibo na,
Jante dibo na.
Lukiye bhalobashbo tare
Jante dibo na.

 

গানের মূল ভাব

“লুকিয়ে ভালোবাসবো তারে” গানটির কেন্দ্রীয় দর্শন হলো প্রেমের চরম পবিত্রতা ও আত্মমর্যাদার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। সাধারণ ভালোবাসায় প্রাপ্তি, অধিকারবোধ এবং প্রতিদানের দাবি থাকে; কিন্তু এই গানে ভালোবাসা সম্পূর্ণ স্বার্থহীন ও নিভৃতচারী। প্রেমিক ভালোবেসেও প্রিয়জনকে নিজের অনুরাগের কথা জানতে দিতে চায় না। কারণ সে জানে, এই অসম ভালোবাসার সত্য প্রকাশিত হলে প্রেমাস্পদ তার আত্মিক শান্তি বা ‘প্রাণ’ হরণ করবে ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে ভালোবাসা বা আশ্রয় দেবে না।

গানটিতে এক পরম অহিংস ও নির্লিপ্ত প্রেমের প্রকাশ ঘটেছে। প্রিয়জন যদি আদর বা ভালোবাসা নাও দেয়, তার প্রতি কোনো ক্ষোভ বা অনাদর প্রকাশ করা হবে না। এমনকি চোখে চোখ পড়লেও আত্মসংযম বজায় রেখে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া হবে। প্রিয়জনকে নিজের বেদনার অংশীদার না করে কেবল অন্তরের নিভৃত সিংহাসনে বসিয়ে আজীবন পূজা করে যাওয়ার এই সাধনা গানটিকে উচ্চমার্গীয় আধ্যাত্মিক প্রেমের স্তরে উন্নীত করেছে।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. গোপন অনুরাগ ও মানসিক শঙ্কা

  • “লুকিয়ে ভালোবাসবো তারে জানতে দিব না / জানলে পরে প্রাণ নেবে সে, প্রাণ তো দিবে না…”
    প্রেমের সূচনাতেই তীব্র আত্মসচেতনতা। প্রিয় মানুষটির মনোভাব ও কঠিন স্বভাব সম্পর্কে প্রেমিক অবগত। দুর্বলতা প্রকাশ পেলে তা সম্পর্কের টানাপোড়েন ও উপহাসে রূপ নিতে পারে; তাই নিজের অনুভূতিকে গোপন রাখাই আত্মরক্ষার একমাত্র পথ।

২. অনাদরের বিপরীতে পরম সংযম ও আত্মমর্যাদা

  • “সে যদি না করে আদর করব না তায় অনাদর / চোখে চোখে চাইলে পরে ফিরে চাইব না…”
    প্রেমিকের চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রকাশ। ভালোবাসার মানুষ অবহেলা করলেও তার প্রতি কোনো পাল্টা অশ্রদ্ধা বা তিক্ততা তৈরি হয় না। এমনকি চোখের ভাষার অনিচ্ছাকৃত প্রকাশ রোধ করতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়ার সংযম প্রেমিকের গভীর ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদাকে প্রমাণ করে।

৩. অন্তরের সিংহাসন ও নিঃস্বার্থ আত্মদহন

  • “বসায়ে হৃদি-সিংহাসনে হাসব কাঁদব আপন মনে / ভেসেছি আপনি ভাসি তায় ভাসাব না…”
    গানটির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও দার্শনিক স্তবক। বাইরের জগতের সমস্ত বন্ধনমুক্ত হয়ে প্রেমিক তার হৃদয়-সিংহাসনে প্রিয়জনকে আরাধ্য দেবতার মতো স্থাপন করে। সেখানে সে আপন মনে হাসবে ও কাঁদবে। সবচেয়ে মহৎ কথা হলো—বিরহের অশ্রুনদীতে সে নিজেই ভেসে যাবে, কিন্তু সেই বেদনার স্রোতে প্রিয়জনকে ভাসিয়ে তার জীবনকে ভারাক্রান্ত করবে না।

সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য

  • নিভৃত প্রেমের দর্শন (Platonic & Unrequited Love): মধ্যযুগীয় পদাবলী কিংবা ঊনবিংশ শতকের টপ্পার মতো আত্মবিলোপী প্রেমের গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপ ফুটে উঠেছে।
  • সংযত কাব্যভাষা: কোনো চটুল বা অতি-আবেগঘন শব্দের আশ্রয় না নিয়ে অত্যন্ত ধীর, সংহত ও মার্জিত শব্দচয়নে ভালোবাসার গভীরতাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
  • বিপরীতমুখী আবেগের সংহতি: ‘আদর-অনাদর’ এবং ‘নিজে ভাসা বনাম প্রিয়কে না-ভাসানো’-র মাধ্যমে প্রেমের পরম নৈতিক দায়িত্ববোধ প্রকাশিত হয়েছে।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরবিন্যাস

  • বিষ্ণুপুর ঘরানার ধ্রুপদী প্রভাব: সুরকার গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রখ্যাত বিষ্ণুপুর ঘরানার সাধক ছিলেন। এই গানে তিনি টপ্পা ও রাগাশ্রয়ী ঠুংরির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। সুরের ধীর গতি, পরিমিত তান এবং সূক্ষ্ম মীড়ের ব্যবহার গানটিতে এক ধ্যানমগ্ন আবেশ রচনা করেছে।
  • গীতা ঘটকের গায়কী: শান্তিনিকেতনের আশ্রমে গড়ে ওঠা শিল্পী গীতা ঘটকের কণ্ঠস্বরে ছিল এক অনন্য স্নিগ্ধতা ও গাম্ভীর্য। অতিরিক্ত কারুকাজ পরিহার করে গানের বাণীর ভাবগাম্ভীর্য অক্ষুণ্ণ রেখে তিনি প্রতিটি শব্দকে আত্মিক অনুভূতির সাথে উচ্চারণ করেছেন।

শিল্পী ও সুরকার পরিচিতি

  • গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৮০–১৯৬৩): ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বিষ্ণুপুর ঘরানার কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ, ধ্রুপদ ও খেয়াল শিল্পী এবং সংগীততাত্ত্বিক গবেষক। তিনি দীর্ঘ ২৯ বছর বর্ধমানের মহারাজার সভা-গায়ক হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীত ও পুরাতনী বাংলা গানেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।
  • গীতা ঘটক (১৯৩১–২০০৯): প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সংগীতশিল্পী। বিজ্ঞানী ড. কানাইলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা গীতা ঘটকের শৈশব কাটে জার্মানিতে। পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনের পাঠভবন ও সংগীতভবনে অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি রবীন্দ্রসংগীত ও ধ্রুপদী সংগীতে বুৎপত্তি অর্জন করেন। তাঁর ভগিনী পদ্মভূষণপ্রাপ্ত প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী রীতা গঙ্গোপাধ্যায়।

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

“লুকিয়ে ভালোবাসবো তারে” বাংলা পুরাতনী গানের এমন এক অনবদ্য সৃষ্টি যা প্রেমের ভেতর আত্মসম্মান ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের অনুপম শিক্ষা বহন করে। বর্তমান যুগের ব্যক্তিস্বার্থ ও অধিকারবাদী সম্পর্কের বিপরীতে এই গানটি আত্মিক সমর্পণের এক নীরব প্রতীক হয়ে সংগীতবোদ্ধাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন দখল করে আছে।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. এইচএমভি / সারেগামা বাংলা পুরাতনী ও ক্লাসিক্যাল আর্কাইভ।
  2. বিষ্ণুপুর ঘরানার ইতিহাস ও গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় স্মারক সংকলন।
  3. গীতা ঘটক: নির্বাচিত পুরাতনী ও রবীন্দ্রসংগীত সংগ্রহশালা।

 

 

 

 

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।