বাংলা সঙ্গীতের সুবিশাল আকাশে এমন কিছু নক্ষত্র জ্বলেছেন, যাঁরা আধুনিক প্রচারের আলো বা চাকচিক্য থেকে দূরে থেকে নিঃশব্দে গড়ে তুলেছিলেন সুরের এক মায়াবী ভুবন। যাঁদের দরদি কণ্ঠ ও অমর সৃষ্টি আবহমান কাল ধরে সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে নস্টালজিয়া আর গভীর অনুভূতির জন্ম দেয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অগ্রগণ্য নাম—আনোয়ার উদ্দিন খান। কেবল গায়ক নন; তিনি ছিলেন একাধারে সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার ও সঙ্গীতসাধক।
Table of Contents
শৈশব, পরিবার ও শিক্ষাজীবন
১৯৩৫ সালের ৪ জুন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত বর্তমান রাজবাড়ী জেলায় এক বনেদি পরিবারে আনোয়ার উদ্দিন খান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আকবর আলী খান। শৈশব থেকেই সুর ও শিক্ষার প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তিনি মুসলিম হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সেখান থেকে অর্থনীতি বিভাগে স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।
ব্যাংকিং থেকে সুরের ভুবনে পদার্পণ
অর্থনীতিতে উচ্চতর শিক্ষা শেষ করে ১৯৬১ সালে তিনি পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন এবং একটি ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু প্রথাগত চাকরির গণ্ডি তাঁর সঙ্গীতের প্রতি তীব্র টানকে দমাতে পারেনি। কর্মজীবনের পাশাপাশি তিনি সতেজ মানসিকতা নিয়ে তৎকালীন দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে নিজেকে জড়িয়ে নেন। কালক্রমে তিনি একাধারে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বেসিক রেকর্ড ডিস্ক এবং বাংলা চলচ্চিত্রে একজন কালজয়ী শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
সৃজনশীল যুগলবন্দি ও কালজয়ী গান
গীতিকার ও শিক্ষাবিদ কবি আবু হেনা মোস্তফা কামালের সাথে আনোয়ার উদ্দিন খানের ছিল এক অনন্য সৃজনশীল যুগলবন্দি। তাঁদের যৌথ কাজের মধ্য দিয়ে বাংলা গীতিসাহিত্যে সৃষ্টি হয় নতুন এক নান্দনিক অধ্যায়।
চলচ্চিত্রের জগতে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘অপরাজিতা’ ছবির গানের মাধ্যমে। গায়কীর পাশাপাশি সঙ্গীত পরিচালনায়ও তিনি দেখিয়েছেন অপার মুন্সিয়ানা। ‘বাল্যবন্ধু’ ও ‘মায়ার সংসার’-এর মতো সফল চলচ্চিত্রে তিনি সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া জনপ্রিয় ‘ময়নামতি’ চলচ্চিত্রেও তিনি নেপথ্য গায়ক হিসেবে কণ্ঠ দেন।
তাঁর সৃষ্ট ও গাওয়া অসংখ্য কালজয়ী গানের মধ্যে কয়েকটি গান শ্রোতাদের হৃদয়ে অমর হয়ে আছে:
‘পুরাতন মনটাতে আর সয়না কোনো নতুন জ্বালাতন’
‘লোকে বলে প্রেম’
‘কচি পাতার টিয়া রঙ’
‘জড়োয়া অলংকারে’
ব্যক্তিগত জীবন ও মরণোত্তর একুশে পদক
পারিবারিক জীবনে তিনি সুলতানা আরা বেগম (লিলি)-কে সহধর্মিণী হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁদের একমাত্র কন্যাসন্তানের নাম আরজিনা খান টুম্পা। সঙ্গীতে একনিষ্ঠ সাধনা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০৫ সালে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে, যা বাংলা সংস্কৃতিতে তাঁর অপরিসীম যোগ্যতার এক অনন্য দলিল।
অমর সৃষ্টি ও শ্রদ্ধাঞ্জলি
২০০২ সালের ২ আগস্ট বাংলা গানের এই সুরসাধক ইহলোক ত্যাগ করেন। নশ্বর দেহ ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর মেলোডিয়াস সুর এবং দরদি গায়কী আজও শ্রোতাদের মনে চিরঞ্জীব। প্রয়াণ দিবসে সুরের এই নিভৃত সাধকের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।















