সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৩৩ পিএম

“ইয়ে দুনিয়া, ইয়ে মেহফিল মেরে কাম কি নাহি…” কিংবা “চাহুঙ্গা ম্যায় তুঝে সাঁঝ সাভেরে…”—যে কণ্ঠ একসময় সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে জাদুকরী আবেশে মাতিয়ে রেখেছিল, তা আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে অনুরণিত হয়। সময়ের সীমানা পেড়িয়ে তিনি আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে চির অমর এক নাম। তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি শিল্পী মোহাম্মদ রফি।
১৯২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসর জেলার কোটলা সুলতান সিং গ্রামে এই মহান শিল্পীর জন্ম হয়। তাঁর বাবা হাজী আলী মোহাম্মদ এবং ছয় ভাইবোনের পরিবারে তাঁকে আদর করে ডাকা হতো ‘ফিকো’ নামে। ছোটবেলায় গ্রামের এক ফকিরের ভজন গাওয়ার ভঙ্গি অনুকরণ করতে করতেই মূলত তাঁর অন্তরের সঙ্গীতশিল্পী জেগে ওঠে। সুরের প্রতি এই সুপ্ত টান একসময় তাঁকে নিয়ে যায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কঠোর সাধনার পথে।
চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি তৎকালীন প্রথিতযশা শিক্ষকদের সান্নিধ্যে তালিম নেওয়া শুরু করেন। ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খান, ওস্তাদ আব্দুল ওয়াহিদ খান, পণ্ডিত জীবনলাল মত্তো এবং ফিরোজ নিজামীর মতো সঙ্গীতগুরুদের কাছে তিনি সঙ্গীতের নানা ব্যাকরণ আয়ত্ত করেন। এর আগে মাত্র তেরো বছর বয়সে লাহোরে কিংবদন্তি গায়ক কে. এল. সায়গলের একটি অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে গান গেয়ে তিনি উপস্থিত সবার নজর কেড়েছিলেন।
১৯৪১ সালে শ্যাম সুন্দরের সুরে লাহোরে চলচ্চিত্রের গায়ক হিসেবে তাঁর পেশাদার অভিষেক ঘটে। এরপর মুম্বাইতে স্থায়ীভাবে পাড়ি জমানোর পর তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রে নিয়মিত প্লেব্যাক শুরু করেন। ১৯৪৯ সাল থেকে নওশাদ, শ্যাম সুন্দর, হুসনলাল-ভগতরামসহ সেই সময়ের খ্যাতনামা সুরকারদের হাত ধরে তাঁর অসামান্য উত্থান পর্ব শুরু হয়। পরবর্তী প্রায় চার দশক ধরে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের জগতে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
নওশাদ, ও. পি. নায়ার, শঙ্কর-জয়কিষাণ, শচীন দেব বর্মণ, মদন মোহন, লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলালের মতো কিংবদন্তি সুরকারদের প্রথম পছন্দ ছিলেন তিনি। প্রখ্যাত সুরকার ও. পি. নায়ার একবার আবেগপ্রবণ হয়ে বলেছিলেন, যেখানে মোহাম্মদ রফি নেই, সেখানে ও. পি. নায়ারও নেই। এই একটিমাত্র মন্তব্যই রফির শিল্পীসত্তার অতুলনীয় মহিমা ফুটিয়ে তুলতে যথেষ্ট।
১৯৪৫ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে তিনি হাজার হাজার গান গেয়েছেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, গজল, কাওয়ালী, ভজন, দেশাত্মবোধক গান থেকে শুরু করে প্রেম, বিরহ কিংবা হাস্যরসের গানেও তিনি ছিলেন অনন্য। হিন্দির পাশাপাশি বাংলা, উর্দু, পাঞ্জাবি, মারাঠি, গুজরাটি, তেলেগু, কন্নড়, ওড়িয়া, ভোজপুরি, অসমিয়া, সিন্ধি, ফার্সি, ইংরেজি, ডাচ ও স্প্যানিশসহ বহু ভাষায় গান গেয়ে তিনি নিজেকে বিশ্বসঙ্গীতের অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই মাত্র ৫৫ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী না ফেরার দেশে চলে যান। কিন্তু তাঁর প্রয়াণ কেবল একজন মানুষের বিদায় ছিল না; তাঁর অমিয় কণ্ঠ আজও বেঁচে আছে প্রতিটি সঙ্গীতপ্রেমীর অন্তরে। যতদিন সুরের এই পৃথিবী থাকবে, ততদিন মোহাম্মদ রফি অমর হয়ে থাকবেন।
মন্তব্য