সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুলাই ২০২৬, ১০:২৮ পিএম

বাংলা সংগীতের ইতিহাসে তাঁরা দুজন এক অনন্য রূপকথা। কাকতালীয় হলেও অবিশ্বাস্য সত্য যে তাঁদের জন্ম হয়েছিল একই দিনে। পরবর্তীতে একই সুরের ভুবনে মেলামেশা আর কাজের সূত্রে বাঁধা পড়েছিলেন জীবনসঙ্গীতের এক চিরন্তন বন্ধনে। বাংলা সংগীতের অন্যতম সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী এই দাম্পত্য জুটি হলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুরকার কমল দাশগুপ্ত এবং নজরুলগীতির কিংবদন্তি শিল্পী ফিরোজা বেগম। ২৮ জুলাই ছিল এই গুণী দুই সংগীতসাধকের জন্মবার্ষিকী। ১৯১১ সালের ২৮ জুলাই যশোরে জন্মগ্রহণ করেন কমল দাশগুপ্ত; আর ঠিক একই দিনে, ১৯৩০ সালে ফরিদপুরের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম নেন ফিরোজা বেগম।
অভিভাবক ও সংগীতাঙ্গনের দুই মহীরুহের জন্মদিনে তাঁদের গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করেছেন সুযোগ্য সন্তান ও জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘মাইলস’-এর অন্যতম সদস্য হামিন আহমেদ। এক আবেগঘন বার্তায় তিনি জানান, একই দিনে জন্ম নেওয়া তাঁর বাবা-মা তাঁদের অসামান্য সৃষ্টিশীলতা দিয়ে বাংলা গানের ভাণ্ডারকে চিরঋণী করে গেছেন।
কমল দাশগুপ্ত ছিলেন আধুনিক বাংলা গানের স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান রূপকার। তৎকালীন গ্রামোফোন সংস্কৃতির যুগে এইচএমভি (হিজ মাস্টার্স ভয়েস) ও কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানিতে কাজ করে তিনি গড়েছেন একের পর এক বিস্ময়কর কীর্তি। ১৯৩৫ সালে এইচএমভিতে যোগ দেওয়ার পর মাসে গড়ে ৪৫টি গান সুর করার মতো অবিশ্বাস্য দক্ষতা দেখিয়েছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, এক একক মাসে ৫৩টি গান রেকর্ড করার মতো বিরল দৃষ্টান্তও তিনি স্থাপন করেছিলেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই শিল্পী কবির অসংখ্য গানে সুরারোপ করে সেগুলোকে কালজয়ী করেছেন। ১৯৪৩ সালে প্রখ্যাত গায়িকা যূথিকা রায়কে দিয়ে কমল দাশগুপ্তের সুর করা মীরাবাঈয়ের ভজন শুনে মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী যূথিকাকে ‘মীরাবাঈ’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। এই অনবদ্য সৃষ্টির স্বীকৃতিস্বরূপ বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় কমল দাশগুপ্তকে প্রদান করে সম্মানসূচক ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি।
অন্যদিকে ফিরোজা বেগম কেবল একজন কণ্ঠশিল্পী ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন নজরুলগীতির প্রতিশব্দ। মাত্র ১১ বা ১২ বছর বয়সে এইচএমভির অডিশনে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় ঘটে। কচি কণ্ঠে ‘যদি পরানে না জাগে আকুল পিয়াসা’ গানটি শুনে তরুণী ফিরোজার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন জাতীয় কবি এবং সুরকার কমল দাশগুপ্তকে ডেকে গানটি শোনান। পরবর্তীতে মাত্র ১২ বছর বয়সে চিত্ত রায়ের তত্ত্বাবধানে এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘মরুর বুকে জীবনধারা কে বহাল’। শৈশবে যশোর ও কৈশোরে ভারতের কোচবিহারে কাটার পর পরিবারের সঙ্গে তিনি কলকাতার মানিকতলায় বসবাস শুরু করেন। তাঁদের পুরো পরিবারই সংগীতে পারদর্শী ছিল। ‘মোমের পুতুল’ ও ‘দূর দ্বীপবাসিনী’র মতো অবিস্মরণীয় গান গেয়ে সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে স্থান করে নেন তিনি। বিশ্বজুড়ে ৩৮০টিরও বেশি একক কনসার্ট করা এই শিল্পী ভূষিত হয়েছেন স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে।
১৯৫৬ সালে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন সুরের এই দুই কারিগর। তাঁদের ঘর আলো করে আসে তিন সন্তান—তাহসিন, হামিন ও শাফিন আহমেদ। বাবার সুরের জাদু আর মায়ের গায়কির আবহ থেকে বেড়ে উঠে হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদ বিখ্যাত ব্যান্ড ‘মাইলস’-এর মাধ্যমে বাংলা ব্যান্ড সংগীতকে পৌঁছে দেন অনন্য এক উচ্চতায়। একই দিনে জন্ম নেওয়া এই দুই ধ্রুবতারা সংগীতে যে অমর সৃষ্টি রেখে গেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি সংগীতপ্রেমীদের কাছে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য