১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সবচেয়ে উদ্দীপনামূলক ও অবিস্মরণীয় মুক্তিসংগীতগুলোর অন্যতম “তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর” (বা “তীরহারা এই ঢেউ”)। গানটির কথা ও সুর রচনা করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আপেল মাহমুদ।
একাত্তরের উত্তাল দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যার বিরুদ্ধে লড়াকু তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখতে এবং অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষকে আশার আলো দেখাতে গানটি এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। ব্যক্তিসুখ ও প্রাণের মায়া বিসর্জন দিয়ে অনিশ্চিত ভবিতব্যের মুখে দাঁড়িয়েও স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে আনার যে অদম্য শপথ, গানটিতে তা এক মহাকাব্যিক রূপ পেয়েছে।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| গানের নাম | তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর (তীরহারা এই ঢেউ) |
| গীতিকার ও সুরকার | আপেল মাহমুদ |
| মূল কণ্ঠশিল্পী | আপেল মাহমুদ ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সমবেত কণ্ঠ |
| ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট | ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র) |
| সংগীতধারা | গণসংগীত / মুক্তিসংগীত / দেশাত্মবোধক গান |
| মূল উপজীব্য | মুক্তিযুদ্ধের অনিশ্চয়তা ও সংকট, আত্মত্যাগ, তারুণ্যের অদম্য সংকল্প এবং বিজয়ের প্রত্যাশা |
| প্রধান রূপক | তীরহীন সাগর, নবীন মাঝি, ভাঙা তরী, রুদ্র ঝড় ও ভোরের পাখি |
তীরহারা এই ঢেউ লিরিক্স
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
আমরা ক’জন নবীন মাঝি
হাল ধরেছি,
শক্ত করে রে।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
জীবন কাটে যুদ্ধ করে ,
প্রাণের মায়া সাঙ্গ করে,
জীবনের স্বাদ নাহি পাই।
জীবন কাটে যুদ্ধ করে ,
প্রাণের মায়া সাঙ্গ করে,
জীবনের স্বাদ নাহি পাই।
ঘরবাড়ির ঠিকানা নাই,
দিনরাত্রি জানা নাই,
চলার সীমানা সঠিক নাই।
জানি শুধু চলতে হবে,
এ তরী বাইতে হবে,
আমি যে সাগর মাঝি রে।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
জীবনের রঙে মনকে টানে না,
ফুলের ওই গন্ধ কেমন জানিনা,
জোছনার দৃশ্য চোখে পড়ে না,
তারাও ভুলে কভু ডাকে না।
জীবনের রঙে মনকে টানে না,
ফুলের ওই গন্ধ কেমন জানিনা,
জোছনার দৃশ্য চোখে পড়ে না,
তারাও ভুলে কভু ডাকে না।
বৈশাখের ওই রুদ্র ঝড়ে,
আকাশ যখন ভেঙ্গে পড়ে,
ছেঁড়া পাল আরো ছিঁড়ে যায়।
বৈশাখের ওই রুদ্র ঝড়ে,
আকাশ যখন ভেঙ্গে পড়ে,
ছেঁড়া পাল আরো ছিঁড়ে যায়।
হাতছানি দেয় বিদ্যুৎ আমায়,
হঠাত কে যে শঙ্খ শোনায়,
দেখি ওই ভোরের পাখি গায়।
তবুও তরী বাইতে হবে ,
খেয়া পাড়ি দিতেই হবে।
তবুও তরী বাইতে হবে ,
খেয়া পাড়ি দিতেই হবে।
যতই ঝড় উঠুক সাগরে।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
আমরা ক’জন নবীন মাঝি
হাল ধরেছি,
শক্ত করে রে।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
Tirhara Ei Dheu Lyrics
Tir hara ei dheuyer sagor
Pari debo re.
Tir hara ei dheuyer sagor
Pari debo re.
Amra k’jon nobin majhi
Hal dhorechhi,
Shokto kore re.
Tir hara ei dheuyer sagor
Pari debo re.
Tir hara ei dheuyer sagor
Pari debo re.
Jibon kate juddho kore,
Praner maya sango kore,
Jiboner shad nahi pai.
Jibon kate juddho kore,
Praner maya sango kore,
Jiboner shad nahi pai.
Ghorbarir thikana nai,
Dinratri jana nai,
Cholar simana shothik nai.
Jani shudhu cholte hobe,
E tori baite hobe,
Ami je sagor majhi re.
Tir hara ei dheuyer sagor
Pari debo re.
Tir hara ei dheuyer sagor
Pari debo re.
Jiboner ronge monke tane na,
Fuler oi gondho kemon janina,
Jochhnar drishyo chokhe pore na,
Tarao bhule kobhu dake na.
Jiboner ronge monke tane na,
Fuler oi gondho kemon janina,
Jochhnar drishyo chokhe pore na,
Tarao bhule kobhu dake na.
Boishakher oi rudro jhore,
Akash jokhon bhenge pore,
Chhera pal aro chhire jay.
Boishakher oi rudro jhore,
Akash jokhon bhenge pore,
Chhera pal aro chhire jay.
Hatchhani dey bidyut amay,
Hothat ke je shongkho shonay,
Dekhi oi bhorer pakhi gay.
Tobuo tori baite hobe,
Kheya pari ditei hobe.
Tobuo tori baite hobe,
Kheya pari ditei hobe.
Jotoi jhor uthuk sagore.
Tir hara ei dheuyer sagor
Pari debo re.
Tir hara ei dheuyer sagor
Pari debo re.
Amra k’jon nobin majhi
Hal dhorechhi,
Shokto kore re.
Tir hara ei dheuyer sagor
Pari debo re.
Tir hara ei dheuyer sagor
Pari debo re.
Tir hara ei dheuyer sagor
Pari debo re.
Tir hara ei dheuyer sagor
Pari debo re.
গানের মূল ভাব
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. রূপকযাত্রা ও তারুণ্যের হাল ধরা
- “তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে / আমরা ক’জন নবীন মাঝি হাল ধরেছি, শক্ত করে রে…”এখানে ‘তীর হারা সাগর’ হলো মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল ও ভয়াবহ রণক্ষেত্র। আর ‘নবীন মাঝি’ হলো বাংলার অকুতোভয় তরুণ মুক্তিসেনারা। অভিজ্ঞতাহীন হলেও তাদের সংকল্প অত্যন্ত দৃঢ়; তারা জাতির মুক্তির হাল শক্ত হাতে চেপে ধরেছে।
২. ব্যক্তিসুখ বিসর্জন ও বাস্তুহীন সংগ্রাম
- “জীবন কাটে যুদ্ধ করে, প্রাণের মায়া সাঙ্গ করে, জীবনের স্বাদ নাহি পাই… / ঘরবাড়ির ঠিকানা নাই, দিনরাত্রি জানা নাই, চলার সীমানা সঠিক নাই…”মুক্তিযোদ্ধাদের বাস্তব জীবনের কঠোর বাস্তবতা এখানে প্রতিফলিত। রণাঙ্গনের গেরিলা জীবনে কোনো বিশ্রাম বা ব্যক্তিগত সুখের অবকাশ ছিল না। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁরা পথ চলেছেন কেবল স্বদেশের মুক্তির আশায়।
৩. প্রকৃতি ও প্রেমের সংবেদনহীনতা
- “জীবনের রঙে মনকে টানে না, ফুলের ওই গন্ধ কেমন জানিনা / জোছনার দৃশ্য চোখে পড়ে না, তারাও ভুলে কভু ডাকে না…”যুদ্ধের বিভীষিকা মানুষের রোমান্টিক অনুভূতিকে কীভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে, এটি তার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপ। পার্থিব জগতের সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো সময় ও মানসিকতা যোদ্ধাদের ছিল না; তাঁদের সমস্ত চিন্তা আবদ্ধ ছিল দেশমাতৃকার মুক্তির একমাত্র লক্ষ্যে।
৪. রুদ্র ঝড় ও নবপ্রভাতের আহ্বান
- “বৈশাখের ওই রুদ্র ঝড়ে, আকাশ যখন ভেঙ্গে পড়ে, ছেঁড়া পাল আরো ছিঁড়ে যায়… / হাতছানি দেয় বিদ্যুৎ আমায়, হঠাত কে যে শঙ্খ শোনায়, দেখি ওই ভোরের পাখি গায় / তবুও তরী বাইতে হবে, খেয়া পাড়ি দিতেই হবে…”‘বৈশাখী ঝড়’ হলো শত্রুপক্ষের নগ্ন আক্রমণ ও তাণ্ডব। চরম সংকটে যখন আশা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, তখনই বিদ্যুৎ ও শঙ্খধ্বনির মতো মঙ্গলসংকেত যোদ্ধাদের অন্তরে আশার সঞ্চার করে। অন্ধকার রাতের অবসানে ভোরের পাখির গান বিজয়ের শুভ বার্তারই প্রতীক।
সাহিত্যিক ও রূপকধর্মী বৈশিষ্ট্য
- নদীমাতৃক বাংলার রূপক: আবহমান বাংলার চিরায়ত নদী, মাঝি, তরী, বৈঠা ও পালের উপাদানগুলোকে ব্যবহার করে জাতীয় মুক্তির মতো রাজনৈতিক ও সামরিক সংগ্রামকে সার্বজনীন রূপ দেওয়া হয়েছে।
- মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও সংকল্পের জয়: ব্যক্তিগত জীবনের মায়া-মমতার স্বাভাবিক দুর্বলতাকে স্বীকার করে নিয়েও সবশেষে সম্মিলিত বিজয়ের লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে চেতনা, তা গানটিকে অনন্য সাহিত্যিক গভীরতা দান করেছে।
- ধ্বনিমাধুর্য ও অনুপ্রাস: চরণের গতি ও ছন্দের চলন মাঝির দাঁড় বাওয়া এবং উত্তাল ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও গায়কীর শক্তি
- উত্তাল ও তেজোদৃপ্ত সুরবিন্যাস: গানটিতে এক ধরণের রণোন্মাদনা ও সমুদ্রের গর্জনের মতো ছন্দ রয়েছে। মার্সিং বা এগিয়ে চলার মেজাজে গানটি নির্মিত, যা সমবেত কণ্ঠে গাওয়ার সময় বিপুল শক্তির সঞ্চার করে।
- আপেল মাহমুদের উদাত্ত কণ্ঠ: আপেল মাহমুদের বলিষ্ঠ ও তীক্ষ্ণ স্বরপ্রক্ষেপণ গানের প্রতিটি শব্দে আত্মবিশ্বাসের আগুন জ্বালিয়ে তোলে। একক কণ্ঠ থেকে সমবেত সমাপনীতে উত্তরণ গানের আবেদনকে চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছে দেয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও শিল্পী পরিচিতি
- আপেল মাহমুদ: একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ আপেল মাহমুদ। তিনি ৩ নম্বর সেক্টরে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। তাঁর রচিত ও গাওয়া “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি” এবং “তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর” গান দুটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: একাত্তরে এই বেতার কেন্দ্রটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মিক প্রেরণার অবিচ্ছেদ্য উৎস। “তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর” গানটি সম্প্রচারের সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের মনে বিজয়ের নতুন উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলত। পরবর্তীকালে ‘দলছুট’ সহ বহু আধুনিক ব্যান্ড ও শিল্পী গানটি কভার করে নতুন প্রজন্মের কাছেও এর কালজয়ী আবেদনকে চিরভাস্বর করে রেখেছেন।
উৎস ও তথ্যসূত্র
- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও মুক্তিযুদ্ধের গান, ড. সুকুমার বিশ্বাস।
- একাত্তরের শব্দসৈনিক ও আপেল মাহমুদ স্মারক নথি।
- বাংলাদেশ বেতার ও জাতীয় আর্কাইভ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র অডিও ক্যাটালগ।
সব ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত বাংলা গানের কথা সংগ্রহ করে সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য প্রকাশে কাজ করছে ‘লিরিক ডেস্ক’। আপনার কাঙ্ক্ষিত গানটি আমাদের ওয়েবসাইটে না পেলে জানান; আমরা তা সংগ্রহ করে দ্রুত আপলোড করে দেব।













