হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতপদ্ধতিতে কল্যাণ ঠাটের অন্তর্গত ‘রাগ ইমন কল্যাণ’ (বা ইয়ামন কল্যাণ) অন্যতম প্রধান, সুপরিচিত এবং নন্দনতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত গভীর এক সান্ধ্য রাগ। প্রচলিত বিশুদ্ধ ইমন রাগের সাথে এর মূল তফাত হলো—ইমনে কেবল তীব্র মধ্যম ব্যবহৃত হলেও ইমন কল্যাণে কৌশলগতভাবে উভয় মধ্যম (তীব্র ও শুদ্ধ) ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সঙ্গীতপদ্ধতিতে এই রাগের সমতুল্য রূপটি ‘যমুনা কল্যাণী’ নামে পরিচিত।
ঐতিহাসিক লোকশ্রুতি ও বিবরণ অনুযায়ী, মধ্যযুগে সঙ্গীতনায়ক আমির খসরু পারস্যের ‘ইয়ামন’ অঞ্চলের সুরপ্রবাহের সাথে ভারতীয় আদি ‘কল্যাণ’ রাগের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এই রাগের প্রবর্তন করেছিলেন। তবে প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থাবলীতে বর্ণিত ‘যমুনা কল্যাণী’ থেকে ‘ইমন কল্যাণ’ নামের উৎপত্তি কি না—তা নিয়ে সঙ্গীততাত্ত্বিকদের মধ্যে সামান্য আলোচনা ও মতভেদ রয়েছে।
Table of Contents
শাস্ত্রীয় পরিচয় ও স্বর-কাঠামো
রাগ ইমন কল্যাণকে কল্যাণ ঠাটের অন্তর্ভুক্ত একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ জাতির রাগ হিসেবে গণ্য করা হয়।
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
| ঠাটের নাম | কল্যাণ |
| জাতি | সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ |
| বাদী স্বর | শুদ্ধ গান্ধার (গ) |
| সংবাদী স্বর | শুদ্ধ নিষাদ (ন) [মতান্তরে: শুদ্ধ ধৈবত (ধ)] |
| অঙ্গ | পূর্বাঙ্গ প্রধান |
| গ্রহ স্বর | মন্দ্র নিষাদ (ণ্) / শুদ্ধ ঋষভ (ঋ) |
| ন্যাস স্বর | শুদ্ধ গান্ধার (গ), পঞ্চম (প) ও শুদ্ধ নিষাদ (ন) |
| গায়ন সময় | রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা থেকে রাত্রি ৯টা) |
| রস/প্রকৃতি | শান্ত, শৃঙ্গার, আনন্দঘন ও ভক্তিময় |
| ব্যবহৃত স্বর | উভয় মধ্যম (তীব্র মধ্যম ‘হ্ম’ এবং শুদ্ধ মধ্যম ‘ম’)। বাকি সকল স্বর শুদ্ধ (ঋ, গ, প, ধ, ন)। |
আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়
- আরোহণ: ণ্ ঋ গ হ্ম প ধ ন র্স (বা: ণ্ ঋ গ হ্ম ধ ন র্স)
- অবরোহণ: র্স ন ধ প হ্ম গ ম গ ঋ স
- পকড় (বিশেষ স্বরগুচ্ছ): ণ্ ঋ গ ঋ স, প হ্ম গ ঋ গ ম গ ঋ স
রাগ ইমন ও রাগ ইমন কল্যাণের স্বাতন্ত্র্য: অভিন্নতা ও পার্থক্যের শাস্ত্রীয় বিচার
সাধারণ সঙ্গীতচর্চায় ও লোকমুখে অনেক সময় ‘ইমন’ এবং ‘ইমন কল্যাণ’ নাম দুটিকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যায়। তবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীততত্ত্ব ও রাগশাস্ত্রে (বিশেষ করে পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে প্রবর্তিত রাগব্যবস্থায়) এদের দুটিকে সূক্ষ্ম পার্থক্যযুক্ত পৃথক রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই পার্থক্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো শুদ্ধ মধ্যমের (ম) উপস্থিতি। বিশুদ্ধ রাগ ইমনে কেবল এবং একমাত্র তীব্র মধ্যম (হ্ম) ব্যবহৃত হয়; এতে শুদ্ধ মধ্যমের প্রয়োগ বৈয়াকরণিকভাবে বর্জিত। অন্যদিকে, রাগ ইমন কল্যাণে তীব্র মধ্যমের প্রধান রাজত্ব বজায় থাকলেও অবরোহণকালে গান্ধার ও ঋষভের মধ্যবর্তী স্থানে অত্যন্ত নিখুঁত ও আলংকারিক উপায়ে মীড় বা স্পর্শস্বর হিসেবে শুদ্ধ মধ্যম (যেমন: ‘গ ম গ ঋ স’) যুক্ত করা হয়। সুতরাং, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে উভয় রাগের আবহ কাছাকাছি মনে হলেও, তাত্ত্বিক ও স্বরবিন্যাসের নিরিখে রাগ ইমন এবং রাগ ইমন কল্যাণ দুটি স্বতন্ত্র রাগ রূপ।
স্বর-প্রয়োগের সূক্ষ্মতা ও রাগ রূপতত্ত্ব
১. উভয় মধ্যমের অনন্য প্রয়োগ
রাগ ইমন কল্যাণে উভয় মধ্যমের প্রয়োগই এর প্রধান বৈচিত্র্য। রাগের আরোহণ ও অবরোহণের সর্বত্র প্রধানত তীব্র মধ্যম (হ্ম) প্রাধান্য পায়। কিন্তু অবরোহণকালে গান্ধার ও ঋষভের মধ্যবর্তী স্থানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও আলংকারিক উপায়ে শুদ্ধ মধ্যম (ম) স্পর্শ করা হয় (যেমন: ‘গ ম গ ঋ স’ বা ‘প ম গ ঋ স’)।
২. শুদ্ধ মধ্যমের সীমাবদ্ধতা ও স্থিতি
এই রাগে শুদ্ধ মধ্যমের প্রয়োগ অত্যন্ত কৌশলপূর্ণ। শুদ্ধ মধ্যমের ওপর কখনোই স্থিরতা (ন্যাস) আনা হয় না বা সরাসরি আরোহণে ব্যবহার করা হয় না। এটি মূলত একটি অনুবাদী স্বর বা অলংকার হিসেবে অবরোহী চলনে ক্ষণিক বিরামহীনভাবে অতিক্রান্ত হয়। যদি শুদ্ধ মধ্যমকে জোরালোভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে রাগের ইমন-রূপ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৩. ষড়জ ও পঞ্চমের বক্র প্রয়োগ (আরোহণে)
রাগ ইমনের মতো ইমন কল্যাণেও আরোহণকালে সাধারণত ষড়জ (স) এবং পঞ্চম (প) সরাসরি ব্যবহার না করে কিছুটা এড়িয়ে বা বক্রভাবে প্রয়োগ করা হয়। যেমন: ‘ণ্ ঋ গ’ দিয়ে সুরের সূচনা করা হয় এবং ‘গ হ্ম ধ ন র্স’ স্বরগুচ্ছে তার সপ্তকে আরোহণ করা হয়।
তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থাবলী

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।















