সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জানুয়ারি ২০২৩, ৯:৩৬ পিএম

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভাণ্ডারে এমন কিছু রাগ আছে যাদের চলন সোজা পথে চলে না; আঁকাবাঁকা গতি আর স্বরের লুকোচুরিতে তারা এক অনন্য মায়াজাল তৈরি করে। তেমনই একটি বিশেষ ও চমৎকার রাগ হলো ‘রাগ ভাটিয়ার’। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে এটি একটি ‘বক্র’ প্রকৃতির রাগ হিসেবে পরিচিত। এই রাগের সবচেয়ে বড় ম্যাজিক লুকিয়ে আছে এর ‘মধ্যম’ (মা) স্বরের ব্যবহারে। এই রাগে শুদ্ধ এবং তীব্র—দুটি মধ্যমই পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়। যদিও এতে শুদ্ধ মধ্যমের প্রাধান্যই বেশি, তবুও তীব্র মধ্যমের একটি সূক্ষ্ম ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রয়োগই রাগটিকে তার আসল রূপ ও আভিজাত্য দান করে। আর এই তীব্র মধ্যমের উপস্থিতির কারণেই সঙ্গীতজ্ঞরা একে ‘মারবা’ ঠাটের অন্তর্গত করেছেন।
রাগ ভাটিয়ারের স্বর বিন্যাস বেশ জটিল। এর আরোহণে গান্ধার (গা) স্বরটি বর্জিত থাকে বলে এটি ষাড়ব রূপ নেয়, কিন্তু অবরোহণে সাতটি স্বরই ফিরে আসায় এর পূর্ণাঙ্গ রূপটি প্রকাশ পায়।
এই রাগের আসল রূপটি ফুটে ওঠে যখন ওস্তাদরা ‘স, ধ, প, ধ, ম’—এই বিশেষ স্বরগুচ্ছের ওপর বারবার আলো ফেলেন। এটিই এই রাগের পরিচয়বাহী মূল চলন।
রাগ ভাটিয়ারের আসল রূপ এবং আবেগ টের পাওয়া যায় এর পরিবেশনের সময়ে। এই রাগের জন্য ওস্তাদরা বেছে নেন রাত্রির শেষ প্রহর বা শেষ রাতকে (যা ভোরের ঠিক আগের সময়)।
যখন পৃথিবীর বুক থেকে রাতের অন্ধকার আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসে, ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগের যে নিস্তব্ধতা—ঠিক তখনই তানপুরার জাদুকরী ঝংকারে জেগে ওঠে রাগ ভাটিয়ার। এর বাদীস্বর ‘মধ্যম’-এর গম্ভীর চলন আর দুই মধ্যমের চমৎকার খেলা শ্রোতার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দেয়। এটি একদিকে যেমন রাতের বিদায়ের এক বিষণ্ণ মধুর সুর, ঠিক তেমনি অন্যদিক থেকে নতুন এক ভোরের আবাহন বা আশার আলো। শেষ রাতের সেই আলো-আঁধারির মাঝে ভাটিয়ারের প্রতিটি তান ও মীড় শ্রোতার অন্তরাত্মাকে এক পরম আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও ধ্যানমগ্নতায় ভরিয়ে দেয়।
তথ্যসূত্র:
উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত — শক্তিপদ ভট্টাচার্য। নাথ ব্রাদার্স (২২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭)।
মন্তব্য