সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই মার্চ ২০২২, ১২:৩১ পিএম
![রূপালী নদীরে, রূপ দেইখা তোর [ Rupali Nodi re, Rup dekha ]](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2022/03/রূপালী-নদীরে.jpg)
ভাটি বাংলার নদীমাতৃক রূপ এবং লোকসংগীতের এক অনন্য ও কালজয়ী নিদর্শন হলো ‘রূপালী নদীরে, রূপ দেইখা তোর’। এই অসাধারণ নদীভিত্তিক গানটির আদি ও প্রামাণ্য কণ্ঠশিল্পী হলেন লোকসংগীতের প্রবাদপুরুষ ও কিংবদন্তি শিল্পী আব্দুল আলীম। বাংলার পল্লিপ্রকৃতি, নদীর প্রবহমানতা এবং মানুষের অন্তরের আকুলতাকে আব্দুল আলীম তাঁর কণ্ঠের জাদুকরী তান ও দরদ দিয়ে এক অনন্য সাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা আজও শ্রোতাদের আপ্লুত করে।
এই গানটির মূল শিল্পী আব্দুল আলীমের সংগীত জীবনের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সংগ্রামী ও গৌরবময়। ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের তালিবপুর গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। চরম অর্থনৈতিক অনটনের মাঝে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা বড় কোনো ওস্তাদের সান্নিধ্য ছাড়াই কেবল গ্রামোফোন রেকর্ডে অন্যের গান শুনে শুনে তিনি বাল্যকালে সংগীতচর্চা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি সৈয়দ গোলাম আলীর কাছে সংগীতের প্রাথমিক তালিম নেন এবং মাত্র তেরো বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তাঁর প্রথম গান রেকর্ড হয়। দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা রেডিওর স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগ দেন। বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এবং বিখ্যাত ‘লালন ফকির’ চলচ্চিত্রসহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তিনি গান গেয়েছেন। তাঁর গাওয়া প্রায় পাঁচশত গান বাংলা লোকসংগীতের অমূল্য সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়।
Table of Contents
রূপালী নদীরে, রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল
ও তোর রূপের সোনার নয়ন কোণায়, নামছে রূপের ঢল রে
রূপালী নদীরে, রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল।
বাঁকা গাঁয়ের পথে পথে, রূপালী তোর জলের স্রোতে
উজান ভাটির ধারার সাথে, রূপ করে ঝলমল রে
রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল
রূপালী নদীরে, রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল।
তাই তো তোরে দেখলে বাঁচি, না দেখলে মরি
ত্রিভুবনে তোর মতো আর নাই তো সুন্দরী
রূপালী নদী তুই সুন্দরী, আহা কী রূপ মরি মরি
তোর বুকে আজ ভাসাই তরী, ভাসাই মোর সকল রে
রূপালী নদীরে, রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল।
Rupali nodire, rup dekha tor hoiyachi pagol
O tor ruper sonar noyon konay, namche ruper dhol re
Rupali nodire, rup dekha tor hoiyachi pagol.
Baka gayer pothe pothe, rupali tor joler srote
Ujan bhatir dharar sathe, rup kore jholmol re
Rup dekha tor hoiyachi pagol
Rupali nodire, rup dekha tor hoiyachi pagol.
Tai to tore dekhle baci, na dekhle mori
Tribhubone tor moto ar nai to sundori
Rupali nodi tui sundori, aha ki rup mori mori
Tor buke aj bhasai tori, bhasai mor sokol re
Rupali nodire, rup dekha tor hoiyachi pagol.
গানটির সুরের ধরন মূলত খাঁটি বাংলার ঐতিহ্যবাহী ভাটিয়ালি ও শারি গানের অঙ্গভুক্ত। নদীমাতৃক বাংলাদেশের মাঝিমাল্লাদের জীবনের সুখ-দুঃখ এবং নদীর রূপকে কেন্দ্র করে এই সুরের জন্ম। আব্দুল আলীমের কণ্ঠের সেই চিরন্তন ও আকাশছোঁয়া উদাসী টান গানটির সুরকে এমন এক আবহ তৈরি করে, যা শ্রোতার মনকে ক্ষণিকের জন্য হলেও যান্ত্রিক কোলাহল থেকে দূরে কোনো নিভৃত নদীর তীরে নিয়ে যায়।
গানের মূল ভাব গড়ে উঠেছে চিরসবুজ বাংলার প্রবহমান নদী এবং তার অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের গভীর প্রেম ও মুগ্ধতাকে কেন্দ্র করে। এখানে নদী কেবল একটি জলধারা নয়, বরং এক পরম সুন্দরী নারীর রূপক, যার রূপের জাদুতে কবি বা মাঝির মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। নদীর উজান-ভাটির স্রোত, গ্রামের বাঁকা পথ ঘেঁষে তার বয়ে চলা এবং সেই নদীর বুকে নিজের জীবনতরী ভাসিয়ে দেওয়ার যে পরম আত্মসমর্পণ, তা-ই এই গানের মূল উপজীব্য।
এই গানের প্রধান বিশেষত্ব হলো আব্দুল আলীমের অসাধারণ গায়কী এবং এর সহজ-সরল শব্দচয়ন। গানটির সুরের চড়াই-উতরাই এবং আব্দুল আলীমের ফুসফুসের অবিশ্বাস্য দম শ্রোতাকে মুগ্ধ করে। দোতারা, বাঁশি ও মন্দিরার সহজ বাদ্যে গানটি গ্রামীণ মাটির সোঁদা গন্ধকে পুরোপুরি ধরে রেখেছে। নদী ও মানুষের জীবনের যে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন, তা এই গানের সুর ও বাণীতে চিরন্তন হয়ে উঠেছে।
উৎস (Sources)
এই নিবন্ধের ঐতিহাসিক ও জীবনীসংক্রান্ত তথ্যসমূহ বাংলাদেশ বেতারের সংগীত আর্কাইভ, আব্দুল আলীমের অফিশিয়াল ডিসকোগ্রাফি, লোকসংগীত গবেষকগণের প্রামাণ্য প্রবন্ধ এবং তৎকালীন চলচ্চিত্র ও গ্রামোফোন রেকর্ড লাইনের তথ্যসূত্র থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।
মন্তব্য