সতীনাথ মুখোপাধ্যায় । বাঙালি কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলা সুগম সঙ্গীত (আধুনিক গান, নজরুল গীতি ও ছায়াছবির গান) যে রোমান্টিকতা, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও সুরের লালিত্যে পৌঁছায়, তার নেপথ্যে অন্যতম প্রধান স্থপতি ছিলেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায় (১৯২৩–১৯৯২)। বিশ শতকের চল্লিশের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত তিনি স্বকীয় গায়নশৈলী, সাবলীল গীত রচনা এবং অনন্য সুরসংযোজনের মাধ্যমে বাঙালি শ্রোতার হৃদয়ে এক স্থায়ী আসন তৈরি করে নেন।

তাঁকে বলা হতো ‘বেদনা-মধুর কণ্ঠের জাদুকর’। বিরহ, রোমান্টিকতা এবং জীবনের বিষাদকে শাস্ত্রমূলীয় মাধুর্য দিয়ে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তাঁর তুল্য শিল্পী বাংলা সংগীতে বিরল। একদিকে ওস্তাদি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিখুঁত ব্যাকরণ, অন্যদিকে বাংলা গজলের মৃদু অলঙ্কার এবং হৃদয়ে দোলা দেওয়া সুর—এই তিনের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সৃষ্টিতে।

এক নজরে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
  • জন্ম: ১৯২৩, লখনউ, উত্তর প্রদেশ, ভারত
  • পৈতৃক ভিটা: চুঁচুড়া, হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ
  • মৃত্যু: ১৩ ডিসেম্বর ১৯৯২ (বয়স ৬৯ বছর), পিজি হাসপাতাল (এসএসকেএম), কলকাতা
  • পিতা: তারকদাস মুখোপাধ্যায় | পিতামহ: রামচন্দ্র বেহালাদার
  • সঙ্গীত গুরু: পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ী
  • কর্মজীবন: অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল কার্যালয় (AG Bengal) ও পেশাদার শিল্পী
  • জীবনসঙ্গিনী: গীতশ্রী উৎপলা সেন (বিবাহ: ১৯৬৮)
  • প্রধান পরিচিতি: কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক
  • স্বাক্ষর গান: ‘পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম’, ‘জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারো’, ‘এখনও আকাশে চাঁদ ওই জেগে আছে’, ‘ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো না’

 

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
সতীনাথ মুখোপাধ্যায়

 

Table of Contents

প্রথম জীবন ও পারিবারিক শেকড়

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯২৩ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনউ শহরে। পিতা তারকদাস মুখোপাধ্যায় সরকারি কর্মসূত্রে তখন লখনউতে অবস্থান করছিলেন। উত্তর ভারতের এই ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক শহরে জন্ম হলেও সতীনাথের বাল্য ও কৈশোরের দিনগুলো কাটে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ঐতিহাসিক চুঁচুড়ায়।
[পৈতৃক নিবাস: চুঁচুড়া, হুগলি] ──► [জন্ম: লখনউ (১৯২৩)]
                                       │
                                       ▼
                     [চুঁচুড়ায় বেড়ে ওঠা ও বি.এ. পাশ]
                                       │
                                       ▼
                     [এম.এ. পড়তে কলকাতায় আগমন]
                                       │
                                       ▼
                 [সঙ্গীতে পূর্ণ আত্মনিয়োগ ও পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ীর শিষ্যত্ব]

পারিবারিক সুরমণ্ডল

সতীনাথের পরিবারে ছিল সহজাত সঙ্গীতানুরাগ। তাঁর পিতামহ (দাদু) রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন নিপুণ বেহালাবাদক। পিতা তারকদাস মুখোপাধ্যায়ও ছিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুরাগী ও গায়ক। যদিও তাঁরা কেউই পেশাদার সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন না, তবে বাড়িতে নিয়মিত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিবেশ চর্চিত হতো। এই পারিবারিক আবহই ছোটবেলা থেকেই সতীনাথের ভেতরে সুরের বীজ রোপণ করে দেয়।

শিক্ষাজীবন

চুঁচুড়ার স্থানীয় বিদ্যাপীঠে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি হুগলি মহসিন কলেজ থেকে সাফল্যের সাথে বি.এ. (স্নাতক) ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে তিনি কলকাতায় আসেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. শ্রেণীতে ভর্তি হন। কিন্তু সঙ্গীতের তীব্র আকর্ষণ তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পূর্ণচ্ছেদ টেনে দেয়।
সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ও তার স্ত্রী উৎপলা সেন
সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ও তার স্ত্রী উৎপলা সেন

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম ও কর্মজীবনের প্রারম্ভ

কলকাতায় আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সতীনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পূর্ণভাবে সুরের জগতে ডুব দেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল জন্মগত প্রতিভা দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী শিল্প সৃষ্টি সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন কঠোর শাস্ত্রীয় ভিত্তি।

পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ীর শিষ্যত্ব

সতীনাথ মুখোপাধ্যায় তৎকালীন খ্যাতনামা সঙ্গীত সাধক পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ীর কাছে বিধিবদ্ধভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেওয়া শুরু করেন।
  • ধ্রুপদ ও ধামার: গানের অনমনীয় কাঠামোগত সুরের ওপর দখল অর্জন করেন।
  • টপ্পা ও ঠুমরি: গায়নিতে মেণ্ড, খটকা ও মিহি কাজের সূক্ষ্মতা শেখেন।
  • গজল ও রাগসঙ্গীত: লখনউয়ের জন্মসূত্র এবং পণ্ডিতজীর তালিমের বদৌলতে উত্তর ভারতীয় গজলের মেজাজ ও রাগসঙ্গীতের গভীরতা তাঁর গায়নিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিশে যায়।

সরকারি চাকরি ও সঙ্গীত সাধনার ভারসাম্য

সংসারের তাকিদে ও জীবনযাত্রার স্থায়িত্বের জন্য তিনি কলকাতার সরকারি প্রতিষ্ঠান অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল, বেঙ্গল (AG Bengal) কার্যালয়ে প্রশাসনিক পদে যোগদান করেন। দিনের বেলা এজি বেঙ্গলের ফাইলে হিসাব-নিকাশের কাজ আর সন্ধ্যায় রেওয়াজ ও রেকর্ডিং স্টুডিওতে সুরের আড্ডা—দীর্ঘদিন তিনি এই দুই জগতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছিলেন। এজি বেঙ্গল অফিস তৎকালীন সময়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু বা অন্য অনেক গুণী শিল্পীর মতো সতীনাথের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিভাকেও ধারণ করেছিল।

সঙ্গীত জীবনের সূচনা: নজরুল গীতি ও ঐতিহাসিক ১০ বছরের বিরতি

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের পেশাদার রেকর্ডিং জীবনের সূচনা ঘটেছিল কাজী নজরুল ইসলামের গান দিয়ে। এটি ছিল তাঁর সঙ্গীত জীবনের এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক।

১৯৪২: প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড

১৯৪২ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। রেকর্ডটির এক পিঠে ছিল নজরুল গীতি:
“ভুল করে যদি ভালোবেসে থাকি”
প্রথম রেকর্ড প্রকাশের সাথেই সংগীতপ্রেমীদের নজর কাড়েন এই তরুণ শিল্পী। তাঁর কণ্ঠে যে আবেগ ও পরিশীলিত কারুকাজ ছিল, তা তৎকালীন শ্রোতাদের বিপুলভাবে আলোড়িত করে।
+-----------------------------------------------------------------------------------+
|                        সতীনাথের প্রাথমিক রেকর্ডিং যাত্রা                          |
+-----------------------------------------------------------------------------------+
|  • ১৯৪২: প্রথম প্রকাশ  --> নজরুল গীতি "ভুল করে যদি ভালোবেসে থাকি" (বিপুল সাফল্য)      |
|  • ১৯৪২-১৯৫২: বিরতিকাল --> দীর্ঘ ১০ বছর নীরবতা, নির্জন রেওয়াজ ও সুর সৃষ্টির সাধনা   |
|  • ১৯৫২: মহাসমারোহে প্রত্যাবর্তন --> "আমি চলে গেলে পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম"|
+-----------------------------------------------------------------------------------+

দীর্ঘ ১০ বছরের অন্তর্ধান ও মহাসমারোহে প্রত্যাবর্তন

প্রথম রেকর্ডের সাফল্য সত্ত্বেও অলৌকিক এক নীরবতায় তলিয়ে যান সতীনাথ। ১৯৪২ থেকে ১৯৫২—এই দীর্ঘ দশ বছর তাঁর কোনো নতুন গান রেকর্ড হয়নি। এই সময়টিতে তিনি সুরের পেছনে নিঃশব্দে কাজ করেছেন, নিজেকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন এবং নিজস্ব সুরশৈলী তৈরি করেছেন।

১৯৫২ সালে সেনোলা/এইচএমভি রেকর্ড থেকে যখন তাঁর দ্বিতীয় রেকর্ড প্রকাশিত হলো, তখন বাংলা গান যেন এক নতুন যুগান্তরের সাক্ষী হলো। এই রেকর্ডে ছিল দুটি গান:

১. “আমি চলে গেলে পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম”

২. “এ জীবনে যেন আজ কিছু ভালো লাগে না”

এই দুটি গান মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথে পুরো বাংলায় অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সতীনাথ মুখোপাধ্যায় এক রাতেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যান। ‘পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম’ গানটি বাংলা সুগম সঙ্গীতের ইতিহাসে চিরকালের জন্য এক শ্রেষ্ঠ বিষাদময় প্রেমের গান হিসেবে স্থান করে নেয়।

 

সতীনাথ মুখোপাধ্যায় , হেমন্ত মুখোপাধ্যায় , শ্যামল মিত্র
সতীনাথ মুখোপাধ্যায় , হেমন্ত মুখোপাধ্যায় , শ্যামল মিত্র

 

স্বতঃস্ফূর্ত গীতিকার ও সুরস্রষ্টা: আড্ডার টেবিলে ও সিগারেটের প্যাকেটে গান

সতীনাথ মুখোপাধ্যায় কেবল অন্যের লেখা বা সুরে গান গেয়ে ক্ষান্ত হননি, তিনি ছিলেন এক সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত গীতিকার ও সুরকার। তাঁর গান লেখার শৈলী ছিল রূপকথার মতো বোোহেমিয়ান ও অনানুষ্ঠানিক।

সিগারেটের প্যাকেটে সুর ও বাণী

সতীনাথের মনের ভেতর যখনই কোনো সুর বা কাব্যের পংক্তি ভেসে উঠত, তিনি মুহূর্ত বিলম্ব করতেন না। হাতের কাছে কাগজ না থাকলে পকেটের সিগারেটের প্যাকেট ছিঁড়ে তাতেই চটজলদি খসড়া লিখে ফেলতেন এবং সাথে সাথে তার স্বরলিপি (Notation) তৈরি করে ফেলতেন।
                  +-----------------------------------+
                  |     সতীনাথের স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতা  |
                  +-----------------------------------+
                                    │
         +--------------------------+--------------------------+
         │                                                     │
         ▼                                                     ▼
 [চলন্ত গাড়িতে বা আড্ডায় সুরের আগমন]        [পকেটের সিগারেটের প্যাকেটে গীতিরূপ]
         │                                                     │
         +--------------------------+--------------------------+
                                    │
                                    ▼
              [কালজয়ী গান: 'জীবনে যদি দীপ', 'এখনও আকাশে চাঁদ']
  • জোৎস্না রাতের সৃষ্টি: এক জোৎস্না রাতে গাড়িতে যাওয়ার সময় হুট করেই তাঁর মাথায় সুর ও বাণী খেলে যায়। সাথে সাথে দেশলাই ও সিগারেটের বাক্সের কাগজের ওপর লিখে ফেলেন কালজয়ী গান: “এখনও আকাশে চাঁদ ওই জেগে আছে”।
  • অন্যান্য জনপ্রিয় স্বরচিত গান: “জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারো”, “মরমিয়া তুমি”, “ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো না”—এ জাতীয় অনেক গানের নেপথ্যেই ছিল তাঁর এই তাৎক্ষণিক ও নিখাদ সৃষ্টিশীল মুহূর্ত।

নজরুল গীতি ও বাংলা গজলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী

কাজী নজরুল ইসলামের গানের বাভাবের সাথে সতীনাথের গায়কির এক আত্মিক মেলবন্ধন ছিল। নজরুলের বৈচিত্র্যময় সৃষ্টির মধ্যে রোমান্টিক ও রাগাশ্রয়ী গান এবং গজল পরিবেশনায় সতীনাথ ছিলেন অনন্য।

  • ঐতিহাসিক দাবি: সঙ্গীত বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, নজরুলের বিখ্যাত কালজয়ী গান “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ” প্রথম দিককার পুরুষ শিল্পীদের মধ্যে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠেও রেকর্ড করা হয়েছিল এবং অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
  • বিখ্যাত নজরুল গীতিসমূহ:
    • “তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি”
    • “পরো পরো পারসী পোশাক”
    • “দূর দ্বীপবাসিনী”
    • “কে দূর বনে উদাসী বাঁশী বাজায়”

লখনউয়ের গজলের টান এবং ধ্রুপদী অঙ্গের কাজ থাকার কারণে সতীনাথের কণ্ঠে নজরুল গীতি আলাদা এক মাত্রা পেত। তান বা তাড়া না দিয়ে তিনি মিণ্ড ও অনুভূতির কোমল স্পর্শ দিয়ে গানকে শ্রোতার অন্তরে পৌঁছে দিতেন।

ব্যক্তিগত জীবন: গীতশ্রী উৎপলা সেন ও সুরের দাম্পত্য

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের জীবনের অন্যতম সুন্দর ও আবেগঘন অধ্যায় হলো সুরসম্রাজ্ঞী উৎপলা সেন (১৯২৪–২০০৫)-এর সাথে তাঁর সম্পর্ক ও বিবাহ।
                  +-----------------------------------+
                  |     সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ও উৎপলা সেন   |
                  |     (জীবনের ও সুরের অনন্য যুগলবন্দী)   |
                  +-----------------------------------+
                                    │
         +--------------------------+--------------------------+
         │                                                     │
         ▼                                                     ▼
 [ব্যক্তিগত সঙ্গ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা]          [দ্বৈত গান ও যুগল সুর পরিচালনা]
         │                                                     │
         +--------------------------+--------------------------+
                                    │
                                    ▼
                [কালজয়ী দ্বৈত গান ও যৌথ সঙ্গীত পরিবেশনা]

উৎপলা সেনের সাথে পরিচয় ও প্রেম

উৎপলা সেন ছিলেন সেকালের শীর্ষস্থানীয় মহিলা কণ্ঠশিল্পীদের অন্যতম। তাঁর প্রথম স্বামী বিমল ভূষণের অকালমৃত্যুর পর উৎপলা সেন যখন একাকী ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তখন সতীনাথ মুখোপাধ্যায় তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান। সঙ্গীতচর্চা এবং অনুষ্ঠানসূত্রে তাঁদের মেলবন্ধন গাঢ় হয়।

১৯৬৮ সালের বিবাহ

১৯৬৮ সালে সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ও উৎপলা সেন আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই বিবাহ কেবল দুটি মানুষের আইনি মিলন ছিল না, এটি ছিল বাংলা সঙ্গীত জগতের দুই মহান সাধকের সুসংগত সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন।

যৌথ সঙ্গীত সফর

বিয়ের পর থেকে সতীনাথ ও উৎপলা মঞ্চে এবং স্টুডিওতে অসংখ্য দ্বৈত গান উপহার দেন। সতীনাথের সুরে উৎপলা সেন গেয়েছেন অজস্র কালজয়ী গান। এর মধ্যে “আকাশ এত মেঘলা” গানটির সুরকার হিসেবে সতীনাথের কাজ এবং উৎপলা সেনের পরিবেশনা আজও আধুনিক বাংলা গানের স্বর্ণালী দলিল হয়ে আছে।

বাংলা চলচ্চিত্রে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়: সুর পরিচালনা ও গীতিআলেখ্য

কেবল একক আধুনিক গানেই নয়, বাংলা ছায়াছবির জগতেও সতীনাথ মুখোপাধ্যায় সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রসমূহ

তিনি বেশ কিছু বিখ্যাত চলচ্চিত্রে একক ও যৌথভাবে সঙ্গীত পরিচালনা করেন:
  1. লৌহকপাট (১৯৫৭): জরাসন্ধের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রে তাঁর সঙ্গীত পরিচালনা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
  2. মানময়ী গার্লস স্কুল (১৯৫৮): জনপ্রিয় এই হাসির ছবিতে সুরের হালকা ও মিষ্টি মেজাজ ফুটিয়ে তোলেন।
  3. জাগৃতি (১৯৫৯): সামাজিক পটভূমির এই ছবিতে তাঁর সুরের বৈচিত্র্য দেখা যায়।
  4. মা ও শেষ পরিচয়: আবেগঘন দৃশ্যপট অনুযায়ী ক্লাসিক্যাল ও আধুনিক সুরের মেলবন্ধন ঘটান।

অন্যান্য বিখ্যাত শিল্পীদের সাথে কাজ

সুরকার হিসেবে সতীনাথ কেবল নিজের বা স্ত্রীর জন্য নয়, তৎকালীন প্রথম সারির প্রায় সব শিল্পীকে দিয়েই গান গুইয়েছেন। লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, আরতি মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সাথে তাঁর পেশাদার কাজের সমীকরণ ছিল অত্যন্ত চমৎকার।

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের নির্বাচিত কালজয়ী গানসমূহের তালিকা

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের বহুমুখী সৃষ্টির একটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্যাটালগ নিচে দেওয়া হলো:
গানের শিরোনামভূমিকা / ধারাপ্রধান শিল্পীগীতিকার / সুরকার
পাষাণের বুকে লিখো না আমার নামআধুনিক (বিষাদময়)সতীনাথ মুখোপাধ্যায়শ্যামল গুপ্ত / সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারোআধুনিক রোমান্টিকসতীনাথ মুখোপাধ্যায়সতীনাথ মুখোপাধ্যায় / সতীনাথ
আকাশ এত মেঘলাকালজয়ী আধুনিকউৎপলা সেনপবিত্র মিত্র / সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
এখনও আকাশে চাঁদ ওই জেগে আছেসান্ধ্য আধুনিকসতীনাথ মুখোপাধ্যায়সতীনাথ মুখোপাধ্যায় / সতীনাথ
ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো নাআধুনিক নিবেদনসতীনাথ মুখোপাধ্যায়সতীনাথ মুখোপাধ্যায় / সতীনাথ
মরমিয়া তুমিপ্রেম ও অনুভূতিসতীনাথ মুখোপাধ্যায়সতীনাথ মুখোপাধ্যায় / সতীনাথ
জানি একদিন আমার এ জীবনদার্শনিক আধুনিকসতীনাথ মুখোপাধ্যায়শ্যামল গুপ্ত / সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকিনজরুল গীতিসতীনাথ মুখোপাধ্যায়কাজী নজরুল ইসলাম / কাজী নজরুল
কত না হাজার ফুলআধুনিক গানসতীনাথ মুখোপাধ্যায়শ্যামল গুপ্ত / সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
হায় বরষাঋতুভিত্তিক লঘুসতীনাথ মুখোপাধ্যায়সতীনাথ মুখোপাধ্যায় / সতীনাথ
বন্ধু হয় অনেকেসামাজিক/প্রেমসতীনাথ মুখোপাধ্যায়প্রণেতা নির্দিষ্ট / সতীনাথ
পালাই পালাই পালাই রেআধুনিক লঘুসতীনাথ মুখোপাধ্যায়সতীনাথ মুখোপাধ্যায় / সতীনাথ

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের গায়কি ও সুররীতির বিশ্লেষণ

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীতকলা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কিছু নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত ও নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে:

১. ‘বেদনা-মধুর’ ভয়েস টেক্সচার

সতীনাথের কণ্ঠস্বর প্রথাগত চড়া সুরের (High Pitch) মেলোডি ছিল না; বরং তা ছিল গভীর, মখমল এবং বিষাদময় (Baritone-ish Melancholy)। বিষাদকে কীভাবে কান্নায় রূপ না দিয়ে সুরের সু কান্নায় (Lyrical Sadness) রূপান্তর করা যায়, তা তাঁর কণ্ঠের নমনীয়তা প্রমাণ করে।

২. রাগসঙ্গীতের প্রয়োগ

তিনি তাঁর বেশিরভাগ আধুনিক গানে ভারতীয় শাস্ত্রীয় রাগের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। বিশেষ করে—
  • রাগ পিলু ও খাম্বাজ: রোমান্টিক ও বিরহী গানের জন্য।
  • রাগ শিবরঞ্জনী ও ভৈরবী: আকুলতা ও আধ্যাত্মিক ভাব প্রকাশের জন্য।
  • রাগ ইমন ও ভূপালী: সান্ধ্যকালীন অনুভূতির ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরির জন্য।

৩. শব্দচয়ন ও বাণীর স্পষ্টতা

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম থাকা সত্ত্বেও তিনি গানে অপ্রয়োজনীয় তানের আড়ম্বর করতেন না। প্রতিটি শব্দের উচ্চারণ (Diction) ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, যেন গানটি কেবল একটি সুর নয়, শ্রোতার সাথে একান্তে কথা বলা।
সতীনাথ মুখোপাধ্যায়
সতীনাথ মুখোপাধ্যায়

জীবনাবসান ও চিরায়ত উত্তরাধিকার

দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের জটিলতা ও বক্ষব্যাধিতে (Pulmonary Complications) ভোগার পর, ১৯৯২ সালের ১৩ ডিসেম্বর কলকাতার ঐতিহাসিক পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে এসএসকেএম) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬৯ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সুগম সঙ্গীতের স্বকীয় এক যুগের অবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া গান আজও বাঙালি জীবনের বিষাদগ্রস্ত দুপুর, বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা কিংবা একাকী রাতে সান্ত্বনা হয়ে বাজে।

সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁরা কেবল সুর তৈরি করেননি, বরং সুরের ভেতরে নিজের আত্মাকে সমর্পণ করেছিলেন। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম’ যেন ভুল প্রমাণিত হয়েছে—পাথরে না লেখা হলেও প্রতিটি সুররসিক বাঙালির হৃদয়ে তাঁর নাম চিরদিনের জন্য খোদাই হয়ে গেছে।

রেফারেন্স ও তথ্যসূত্র

১. মুখোপাধ্যায়, উৎপলা (১৯৯৮)। সুরের ভুবনে সতীনাথ ও আমি। প্রকাশ ভবন, কলকাতা।
২. ঘোষ, শঙ্খ (১৯৯৫)। বাংলা গানের স্বর্ণযুগ ও তার স্রষ্টারা। আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৩. আকাশবাণী কলকাতা আর্কাইভ: সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার ও গীতিআলেখ্য রেকর্ডসমূহ (১৯৬০-১৯৮০)।
৪. গ্রামোফোন কোম্পানি অব ইন্ডিয়া (HMV/RPG): সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের গানের অফিশিয়াল ডিসকোগ্রাফি ক্যাটালগ।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।