ভাটি বাংলা—সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কালনী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা উজানধল গ্রাম থেকে যে সুর তরঙ্গায়িত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র বাংলাভাষীর হৃদয়ে, যিনি মাটি ও মানুষের কান্না, প্রেম এবং আত্মদর্শনের শব্দরূপ দিয়েছিলেন, সেই সুরের জাদুকর ও বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমকে নিয়ে ভাবতে গেলে আজ গর্বের চেয়ে অনুশোচনার তীব্রতাই বেশি জাগে। লালন সাঁইজির যে অমর প্রাতিষ্ঠানিক ও দার্শনিক ধারা আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে নতুন প্রাণ দিয়েছিল, আধুনিক যুগে এসে সেই একই প্রজ্ঞার বিস্তার ঘটিয়েছিলেন শাহ আব্দুল করিম। অথচ একজন জাতি হিসেবে আমরা এই বিরল উচ্চতার সাংস্কৃতিক অভিভাবককে যে অবহেলা, উদাসীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখেছি, তার কোনো ক্ষমা হয় না।
আজ যখন আমরা পেছনের দিকে তাকাই, তখন এক গভীর শূন্যতা ও অপরাধবোধ আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। আমরা তাঁর গান গাইতে ভালোবাসি, তাঁর গানের সুরে কনসার্ট মাতিয়ে তুলি, কর্পোরেট ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে তাঁর সুর ব্যবহার করি, ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কোটি কোটি ‘ভিউ’ কুড়াই; কিন্তু তাঁর মেধা, তাঁর জীবনদর্শন, তাঁর জীবনের প্রতিটি বাঁকের স্মৃতি সংরক্ষণের প্রশ্নে আমাদের ভূমিকা শূন্যের কোঠায়।

Table of Contents
১০ ঘণ্টার ভিডিও-ইন্টারভিউও নেই: নথিমুক্ত ইতিহাসের অপূরণীয় ক্ষতি
শাহ আব্দুল করিম কেবল একজন গায়ক বা গীতিকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমাদের গ্রামীণ সমাজের একজন স্বশিক্ষিত সমাজচিন্তক, সাম্যবাদী দার্শনিক এবং কালচারাল আইকন। কিন্তু সারা জীবন ধরে তাঁর রেখে যাওয়া কাজের বিনিময়ে আমরা তাঁর কাছ থেকে কী ধরে রাখতে পেরেছি?
পুরো জীবনকাল তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও শাহ আব্দুল করিমের নিজের গলায় বলা কথা, দীর্ঘ সাক্ষাৎকার কিংবা জীবনের গল্প নিয়ে তৈরি এইচডি (HD) কোয়ালিটির অডিও-ভিডিও নথি হিসাব করলে সব মিলিয়ে ১০ ঘণ্টার একটি আর্কাইভও হয়তো পাওয়া যাবে না! এটি কোনো সাধারণ ব্যর্থতা নয়, এটি একটি সংস্কৃতিমনস্ক বলে দাবি করা জাতির জন্য পরম লজ্জার বিষয়।
আগামী ৫০ বা ১০০ বছর পর যখন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই সুরসাধককে জানার চেষ্টা করবে, তখন তাঁর প্রজ্ঞা, তাঁর সুর সৃষ্টির পেছনের ঘাম ও রক্ত, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের গল্প আর বাউলদর্শনের পেছনের যুক্তিগুলো অনুসন্ধানের জন্য কেবল কয়েকশো লিখিত গান ছাড়া আমরা আর কিছুই রেখে যেতে পারছি না। তাঁর বাচনভঙ্গি, চোখের ভাষা, একতারা হাতে সুরের ঝংকার তোলার নিজস্ব ভঙ্গি কিংবা সুরমা-কালনী অববাহিকার কথ্য উপভাষায় তাঁর জীবনবোধ উচ্চারণের দৃশ্যগুলো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্যামেরায় সঠিকভাবে নথিভুক্তই করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট: বিশ্ব কীভাবে তাঁদের লেজেন্ডদের আগলে রাখে?
উন্নত বিশ্ব তো বটেই, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকালেও বোঝা যায়, সংস্কৃতি ও সুরের ধারকদের কীভাবে একটি জাতি বা তাদের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো হৃদয়ে ও আর্কাইভে জায়গা দেয়। ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক ও বেসরকারি সংরক্ষণ উদ্যোগের সাথে আমাদের এই দৈন্যদশার তুলনা করলে মাথা হেঁট হয়ে যায়:
ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও আন্তর্জাতিক আর্কাইভাল অনুদান (দক্ষিণ এশিয়া)
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘ফোর্ড ফাউন্ডেশন’ (Ford Foundation) আশির দশক থেকে ভারতে লোকসংগীত, বাউলধারা ও মৌখিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছে। তারা ভারতের ‘আর্কাইভস অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার ফর এথনোমিউজিকোলজি’ (ARCE)-কে অর্থায়ন করে হাজার হাজার ঘণ্টার বিরল লোকসংগীত, শিল্পীদের ইন্টারভিউ এবং ফিল্ড রেকর্ডিং ডিজিটাইজড করেছে। রাজস্থানের লেঙ্গা ও মঙ্গলানিয়ার শিল্পীদের সুর সংরক্ষণে কোমল কোঠারি প্রতিষ্ঠিত ‘রূপায়ন সংস্থান’-কেও ফোর্ড ফাউন্ডেশন সহায়তা দিয়েছিল, যার ফলে সেখানকার প্রান্তিক শিল্পীরা আজ বিশ্ব দরবারে সংরক্ষিত। অথচ বাংলাদেশে শাহ আব্দুল করিমের মতো এত বড় উইজার্ড থাকা সত্ত্বেও আমরা ফোর্ড ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক ট্রাস্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাঁর জীবন ও গানকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করার কোনো যৌথ উদ্যোগ নিতে পারিনি।
আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (ITC Sangeet Research Academy – Kolkata)
কোলকাতার ‘আইটিসি এসআরএ’ (ITC SRA) কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) এবং সাংস্কৃতিক সুরক্ষার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সিগারেট ও হোটেল ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আইটিসি (ITC Limited) ১৯৭৭ সালে এই একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে। তারা ভারতের প্রাচীন গুরু-শিষ্য পরম্পরাকে টিকিয়ে রাখতে এবং ওস্তাদ ও গুরুদের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরিতে শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। সেখানে হাজার হাজার ঘণ্টার বিরল রাগ-সংগীত, গুরুদের মাস্টারক্লাস এবং দীর্ঘ ইন-ডেপথ সাক্ষাৎকার লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত। ওস্তাদ বদরুল হাসান বা পণ্ডিত নিগমানন্দের মতো গুণীরা সেখানে কেবল আর্থিক সুরক্ষাই পাননি, তাঁদের প্রতিটি নিঃশ্বাসও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেকর্ড করা হয়েছে।
এআরসিই (ARCE) এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ান স্টাডিজ
ভারতের গুরুগাঁওয়ে অবস্থিত ‘আর্কাইভস অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার ফর এথনোমিউজিকোলজি’ (ARCE)-তে প্রায় ৫০,০০০ ঘণ্টারও বেশি লোকসংগীত ও ঐতিহ্যবাহী পারফর্ম্যান্সের ফিল্ড রেকর্ডিং সংরক্ষিত আছে। সেখানে ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিল্পীদের সাক্ষাৎকার ও গানকে বৈজ্ঞানিক ক্যাটালগ বানিয়ে রাখা হয়েছে, যা বিশ্বের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত।
বব ডিলান সেন্টার ও স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশন (যুক্তরাষ্ট্র)
মার্কিন লোকসংগীত ও রক-গীতিকবি বব ডিলানের জীবনী ও কাজ সংরক্ষণের জন্য আমেরিকার ওকলাহোমার তুলসায় গড়ে তোলা হয়েছে ‘বব ডিলান সেন্টার’ (Bob Dylan Center)। সেখানে ডিলানের এক লাখেরও বেশি দুর্লভ নথিপত্র, তাঁর নিজের হাতে লেখা খসড়া খাতা, স্টুডিওর হাজার ঘণ্টার আনরিলিজড অডিও রেকর্ড, ব্যক্তিগত ড্রাফট এবং দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের শত শত ঘণ্টা সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া আমেরিকার ‘স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশন’ (Smithsonian Institution) সেদেশের প্রতিটা লোকশিল্পীর কণ্ঠ ও জীবনপঞ্জি রাষ্ট্রীয় খরচে নথিভুক্ত করে রেখেছে।
বিবিসি সাউন্ড আর্কাইভ ও লোক ভিরসা (পাকিস্তান)
যুক্তরাজ্যের বিবিসি পারমানেন্ট আর্কাইভ-এ ‘দ্য বিটলস’ (The Beatles) বা জন লেননের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, সাধারণ মহড়ার অডিও, অপেশাদার ইন্টারভিউ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত ‘লোক ভিরসা’ (Lok Virsa) লোকসংগীতের একটি জাতীয় জাদুঘর। সেখানে নুসরাত ফাতেহ আলী খান বা রেশমার মতো শিল্পীদের শত শত ঘণ্টার সাক্ষাৎকার, রিহার্সালের ভিডিও এবং দুর্লভ লাইভ পারফরম্যান্সের মাস্টার টেপ সযত্নে ডিজিটাইজড করে রাখা হয়েছে।
অথচ আমাদের দেশে শাহ আব্দুল করিমের মতো আন্তর্জাতিক মানের একজন সুরের উইজার্ড থাকা সত্ত্বেও, তাঁর নিজস্ব কণ্ঠের ভালো কোনো হাই-ডেফিনিশন মাস্টার টেপ নেই, নেই তাঁর কোনো বিশ্বমানের প্রামাণ্য দীর্ঘ ভিডিও বায়োগ্রাফি বা আর্কাইভ।
বাণিজ্যিক শোষণে করিম, কিন্তু মূল্যায়নে চরম শূন্যতা
শাহ আব্দুল করিমের তৈরি ‘গাড়ি চলে না’, ‘কেন পিরিত বাড়াইলি রে বন্ধু’, ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’ কিংবা ‘বসন্ত বাতাসে’—আজকের আধুনিক ফিউশন ও রক ব্যান্ডের বদৌলতে কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক রসদ জুগিয়েছে। অনেক রিমিক্স শিল্পী এই গানগুলো গেয়ে তারকা হয়েছেন, অর্থ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন, মিডিয়া হাউজগুলো কামিয়েছে কোটি কোটি টাকা।
কিন্তু মূল স্রষ্টা যখন সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে দারিদ্র্য, বয়সের ভার, স্ত্রীর বিচ্ছেদ ও নানা ব্যাধিতে জর্জরিত হচ্ছিলেন, তখন কয়জন স্পন্সর, কর্পোরেট হাউস বা সাংস্কৃতিক অভিভাবক তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন? খুব কম মানুষই আজ বুকে হাত দিয়ে দাবি করতে পারবেন যে, শাহ আব্দুল করিমকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, তাঁর গানগুলোকে স্বরলিপিসহ শুদ্ধভাবে সংরক্ষণের জন্য কিংবা তাঁকে নিয়মিত রয়্যালটি দেওয়ার জন্য কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। জীবিতকালে তিনি পেয়েছেন সামান্য কিছু সরকারি অনুদান কিংবা দু-একজন ভক্তের ব্যক্তিগত সাহায্য, যা একজন আন্তর্জাতিক মানের শিল্পীর জন্য অত্যন্ত করুণ ও অপমানজনক।

‘এপ্রিসিয়েশন’-এর চরম দুর্ভিক্ষ: ভবিষ্যতে আর কোনো লেজেন্ড জন্মাবে না
একটি জাতি যখন তাঁর জীবিত গুণীদের সঠিক মূল্যায়ন ও ‘অ্যাপ্রিসিয়েশন’ দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই জাতির সাংস্কৃতিক পতন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। যে সমাজে একজন শাহ আব্দুল করিম জীবনভর দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করে শেষ বয়সে অবহেলায় দিন কাটান, এবং মৃত্যুর পর তাঁর ১০ ঘণ্টার একটি ইন্টারভিউ বা ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি হয় না—সে সমাজে নতুন প্রজন্ম আর লোকসুর বা দর্শনের সাধনায় জীবন উৎসর্গ করতে উৎসাহিত হবে না।
আমরা এমন এক কৃত্রিম সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে অর্জিত মেধার কোনো মূল্যায়ন নেই, আছে সস্তা জনপ্রিয়তার তোষণ। এপ্রিসিয়েশনের এই তীব্র দুর্ভিক্ষের কারণে আমাদের মাঝ থেকে মৌলিক প্রতিভা হারিয়ে যাচ্ছে। অটোটিউন আর ধার করা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভিড়ে আমরা হয়তো আগামীতে আর কখনো কোনো ‘শাহ আব্দুল করিম’ বা ‘লালন’ খুঁজে পাব না। কারণ, আমরা লেজেন্ডদের জন্ম দেওয়ার মতো উর্বর সাংস্কৃতিক জমি তৈরি করতে পারিনি; বরং যা তৈরি করেছি, তা কেবল অবহেলা আর বিস্মৃতির বন্ধ্যাভূমি।
আমাদের কী করা দরকার
শাহ আব্দুল করিম ২০০৯ সালে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরও আমরা যদি হাত গুটিয়ে বসে থাকি, তবে ইতিহাস আমাদের কখনো ক্ষমা করবে না। আমাদের এই সুগভীর অনুশোচনাকে কেবল শব্দে আটকে না রেখে এখনই কিছু জরুরি প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
‘শাহ আব্দুল করিম জাতীয় ডিজিটাল আর্কাইভ’ গঠন
সরকারি ও বেসরকারি ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে একটি আন্তর্জাতিক মানের উন্মুক্ত ডিজিটাল প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন ব্যক্তি, গবেষক বা টিভি চ্যানেলের কাছে থাকা শাহ আব্দুল করিমের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অডিও-ভিডিও ফুটেজগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে ‘রিস্টোর’ ও ‘আপস্কেল’ করে ডিজিটাইজড করতে হবে।
ফোর্ড ফাউন্ডেশন বা আইটিসি এসআরএ-র মডেলে ট্রাস্ট গঠন
আমাদের দেশের বড় বড় কর্পোরেট গ্রুপগুলোকে (যেমন স্কয়ার, প্রাণ-আরএফএল, ব্র্যাক বা ব্যাংকসমূহ) এগিয়ে আসতে হবে। আইটিসি এসআরএ-র মডেলে একটি স্থায়ী ট্রাস্ট গঠন করে বাউল সংগীতি ও শাহ আব্দুল করিমের দর্শন গবেষণায় ফান্ড বরাদ্দ দিতে হবে।
‘মৌখিক ইতিহাস’ (Oral History) সংগ্রহ অভিযান
উজানধল গ্রাম, দিরাই ও সুনামগঞ্জের যেসব বয়স্ক শিষ্য, সহচর, বাদ্যযন্ত্রী ও প্রবীণ ব্যক্তি এখনও জীবিত আছেন, তাঁদের বক্তব্য হাই-ডেফিনিশন ভিডিওতে রেকর্ড করে শাহ আব্দুল করিমের জীবনালেখ্য নথিবদ্ধ করার কাজ অতি দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ডিজিটাইজেশন ফান্ডিং
ফোর্ড ফাউন্ডেশন, ইউনেস্কো (UNESCO) কিংবা স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে ‘ইন্ট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ অনুদান এনে করিম শাহের সৃষ্টিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার আইনি ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
রয়্যালটি আইন জোরদার ও স্বত্ব সুরক্ষা
তাঁর গানগুলো বাণিজ্যিক ব্যবহারের সময় সুর ও কথার বিকৃতি রোধ করতে হবে এবং গান থেকে অর্জিত রয়্যালটির সুনির্দিষ্ট অংশ তাঁর উত্তরসূরি ও বাউল কল্যাণ তহবিলে পৌঁছানোর আইনি কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

শাহ আব্দুল করিমের প্রতি আমাদের যে ঋণের বোঝা জমেছে, তা শোধ করার সাধ্য আমাদের নেই। আমরা তাঁর গান গেয়ে নিজেদের আত্মাকে তৃপ্ত করেছি, কিন্তু সেই গানের সুরকারকে মর্যাদার আসনে বসাতে পারিনি। বিশ্ব যেখানে তাদের সামান্য লোকশিল্পীদেরও স্বর্ণাক্ষরে ডিজিটাইজড করে রাখে, আমরা সেখানে এক মহাজাদুকরকে অবহেলার আঁধারে হারিয়ে যেতে দিয়েছি।
আসুন, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের এই সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বকে স্বীকার করি। শাহ আব্দুল করিমের গান কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়, এটি আমাদের বাঙালি সত্তা ও বাউল দর্শনের জাতীয় পরিচয়পত্র। যদি আমরা এই মহীরুহকে সংরক্ষিত দলিলে ধরে রাখতে না পারি, তবে ভবিষ্যৎ ইতিহাসবিদরা যখন আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির মূল্যায়ন করবেন, তখন আমাদের এই প্রজন্মকে এক ‘অকৃতজ্ঞ ও অন্ধ জাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করবেন। সেই জাতীয় অভিশাপ থেকে বাঁচতে হলেও আজই আমাদের করিম শাহের স্মৃতি ও সুরকে অমর করে রাখার কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
—
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর














