আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস

বাংলা সংগীতের ইতিহাস সহস্র বছরের পুরোনো। বঙ্গীয় জনপদের প্রকৃতি, নদী, আকাশ ও মানুষের জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে সুরের ধারা প্রবাহিত হয়ে এসেছে, বিংশ শতাব্দীতে এসে তা এক অভূতপূর্ব মানসিক ও বৈপ্লবিক রূপান্তর পরিগ্রহ করে। এই রূপান্তরেরই আধুনিক অভিধা—‘আধুনিক বাংলা গান’। বাংলা সংগীতের বিশাল ক্যানভাসে ১৯৩০-এর দশক থেকে যে নতুন ধারার আত্মপ্রকাশ ঘটে, তা কেবল কোনো বাহ্যিক পরিবর্তন ছিল না; বরং তা ছিল বাঙালির আবেগ, নান্দনিকতাবোধ ও প্রকাশভঙ্গির এক গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর।
‘আধুনিক গান’ শব্দবন্ধটি প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ও লিখিত রূপ পায় ভারতীয় বেতারের মুখপত্র ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকার ১৯৩০ সালের এপ্রিল সংখ্যায়। সেখানে বাংলা গানকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করার চেষ্টা করা হয় এবং প্রথমবার সাধারণ পরিবেশনার বাইরে একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে ‘আধুনিক’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যদিও সেই সময় এই শ্রেণিবিন্যাসের কোনো তাত্ত্বিক সংজ্ঞা প্রদান করা হয়নি, তথাপি শব্দটি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বাংলা গানের একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সূচক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
উনবিংশ শতক পর্যন্ত বাংলা গান ছিল প্রধানত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও রাগাশ্রয়ী রীতির অধীন। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ ছিল ‘বৈঠকী গান’, যা নবাবি দরবার, রাজা কিংবা জমিদার বাড়ির বিলাসবহুল গানের আসরগুলোতে পরিবেশিত হতো। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে পা দিয়ে বাংলা গানের এই ঘরানা বদলে যেতে শুরু করে। গানের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নেয় কাব্যিকতা, ব্যক্তিগত ভাবাবেগ, আধুনিক মনস্তত্ত্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত আত্মপ্রকাশ।
সংগীততত্ত্ববিদ রাজেশ্বর মিত্র তাঁর ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত আকর গ্রন্থ ‘প্রসঙ্গ: বাংলা গান’-এ এই নতুন ধরণকে চিহ্নিত করেছেন ‘কাব্যসঙ্গীত’ হিসেবে। তাঁর মতে, এই নতুন রীতির মূল ভিত্তি ছিল গানের ভাব, ভাষা ও কাব্যের প্রাধান্য; শাস্ত্রীয় সংগীতের জটিল রাগ-তালের কঠিন নিয়মকানুনের শাসন সেখানে গৌণ হয়ে পড়েছিল।
এই নতুন সাহিত্যিক ও সাঙ্গীতিক পরিমিতি নিয়ে তৎকালীন বুদ্ধিজীবী মহলেও ব্যাপক চর্চা শুরু হয়। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত ‘নাচঘর’ পত্রিকার একটি প্রবন্ধে তৎকালীন বাংলা গানের পরিবর্তনকে চিহ্নিত করে লেখা হয়—প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা গানে শব্দের বা বাণীর ভূমিকা ছিল গৌণ বা অপ্রধান। সেই গানগুলোর মূল আকর্ষণ বা শক্তি নির্ভর করত সুরের জটিল অলংকরণ, তান-কর্তব্যের কসরত এবং তাল-মাত্রার মারপ্যাঁচের ওপর। উপরন্তু, নাট্য কিংবা যাত্রাপালার গানগুলো কাহিনীর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে এতটাই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা থাকত যে, নাটকের বাইরে স্বাধীনভাবে সেগুলোর সাহিত্যিক বা নান্দনিক মূল্য উপভোগ করা কঠিন ছিল।
আধুনিক বাংলা গান সেই পরাধীনতা ও সীমাবদ্ধতা থেকে সংগীতকে মুক্ত করে। নাটকের নাট্যমুহূর্ত থেকে বেরিয়ে এসে গান নিজেই একটি স্বতন্ত্র, সার্বভৌম সাহিত্যিক ও সাঙ্গীতিক সত্তা লাভ করে। গানের কথা কেবল ছন্দের খাতিরে বা সুরের পরামোঘ বহর হিসেবে ব্যবহৃত না হয়ে, মানুষের অন্দরমহলের গোপন অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে। ‘নাচঘর’ পত্রিকার পর্যালোচনা অনুযায়ী, আধুনিক বাংলা গানের কথাকে কেবল সুরের ওপর ভর না করেও কবিতার মতো স্বাধীনভাবে পড়ে উপভোগ করা যায়, কারণ তা কোনো সুনির্দিষ্ট রাগ-তালের কঠিন শৃৃঙ্খলে বন্দী নয়।
এই ধারণাকে আরও সুনির্দিষ্ট ও বেগবান করে ১৯৪৭ সালের ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকার একটি সম্পাদকীয় উদ্ধৃতি। সেখানে উল্লেখ করা হয়, আধুনিক গানের সুর ও ছন্দে এমন এক অভিনবত্ব এসেছে যা বিংশ শতাব্দীর আধুনিক মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, জটপাকানো বেদনা ও আনন্দের অবিকল প্রতিফলন। এই ধারায় সুর রচিত হতে থাকে বাণীর আবেগ, কাব্যিক তাৎপর্য ও শব্দের অন্তর্নিহিত ইঙ্গিতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে। ফলে গান হয়ে ওঠে নিবিড় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার এক সুরেলা রূপক—যেখানে শব্দ, সুর, কাব্য ও গায়কি একত্র হয়ে এক চিরন্তন মানসিক অনুভূতির জন্ম দেয়।
আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস

Table of Contents

আদি ও মধ্যযুগের ঐতিহ্য: বাংলা গানের হাজার বছরের ভিত্তিভূমি

আধুনিক বাংলা গানের নান্দনিক ভিত্তিমূল বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে বাংলা গানের সহস্রাব্দের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের দিকে। কারণ, আধুনিকতা আকাশ থেকে পড়ে না; তা অতীতের পলিমাটিতেই নিজের শিকড় প্রসারিত করে। সংগীত গবেষকদের মতে, বাংলা গানের প্রথম প্রামাণ্য রূপ খুঁজে পাওয়া যায় পাল রাজাদের শাসনকালে (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী)।

চর্যাপদ থেকে গীতগোবিন্দ ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তন

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ কেবল সাহিত্য ছিল না, তা ছিল মূলত গীত পদাবলী। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যেরা তাঁদের সাধন-ভজন, যোগদর্শন ও তত্ত্বকথা শিষ্যদের শেখানোর জন্য এই গানগুলো রচনা করেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিটি চর্যাপদের ওপর নির্দিষ্ট রাগের নাম উল্লেখ ছিল—যেমন: পটমঞ্জরী, মল্লারী, দেবক্রী, ভৈরবী, কামোদ ইত্যাদি। অর্থাৎ, বাংলা গানের আদি সূচনা থেকেই রাগের অস্তিত্ব ও সচেতন ব্যবহার ছিল।
একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে সেন রাজাদের আমলে সংস্কৃতির বেশ চর্চা হলেও সাধারণ মানুষ রাজসভার ভাষা থেকে দূরে ছিল। তবে রাজা লক্ষণ সেনের সভাকবি জয়দেব রচিত ‘গীতগোবিন্দম’ গ্রন্থটি বাংলা সংগীতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। জয়দেবের গানগুলোকে বলা হয় ‘প্রবন্ধ সঙ্গীত’। প্রবন্ধ সঙ্গীত এবং চর্যাপদের মধ্য দিয়েই বাংলায় রাগাশ্রয়ী গানের বিস্তার ঘটে।
পরবর্তীকালে চতুর্দশ শতাব্দীতে বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের মাধ্যমে বাংলায় পদাবলী সংগীতের যে উন্মেষ ঘটে, তা বাংলা গানের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়।

শ্রীচৈতন্যদেব, কীর্তন ও রামপ্রসাদী সুর

ষোড়শ শতাব্দীতে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবে বাংলা সংগীতে এক মহাসমুদ্রের জোয়ার আসে। চৈতন্যদেব ধর্মকে রাজপ্রাসাদ ও পণ্ডিতদের চার দেয়াল থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দরজায় নিয়ে আসেন নামকীর্তন ও নগরকীর্তনের মাধ্যমে। বাংলা সংগীতে ‘কীর্তন’ হলো এক অনুপম সৃষ্টি। খণ্ডকীর্তন ও পদাবলী কীর্তনে ভক্ত হৃদয়ের পরম আকুতি ও প্রেম প্রকাশিত হয়। কীর্তনের সুরকাঠামোতে একদিকে যেমন ছিল এক অদ্ভুত সরলতা ও আবেগ, অন্যদিকে ছিল অত্যন্ত শক্ত ও জটিল তালের ব্যবহার। কীর্তনই বঙ্গীয় সংগীতের প্রথম জাতীয় ধারা হিসেবে স্থান করে নেয়।
অষ্টাদশ শতকে ভক্তিসংগীতের জগতে এক নতুন ধারার সূচনা করেন সাধক রামপ্রসাদ সেন। তিনি শ্যামাসংগীতের মাধ্যমে ঈশ্বরকে মা হিসেবে সম্বোধন করে তাঁর সুখ-দুঃখের কথা সহজ-সরল ভাষায় নিবেদন করেন। রামপ্রসাদের গানের সেই নিজস্ব ঢং ও সুর ‘রামপ্রসাদী সুর’ নামে খ্যাতি লাভ করে, যা আজও বঙ্গীয় মানসে প্রবাস করে চলেছে।

আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস

ঊনবিংশ শতকের নগরায়ন ও প্রাক-আধুনিক ধারা

১৮০১ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের পর ইসলামি সংস্কৃতি ও পারস্য প্রভাবের সংমিশ্রণে সংগীতের জগতেও বহুত্ববাদের সূচনা হয়েছিল। যে গান আগে ছিল প্রধানত দেব-দেবীর মন্দিরমুখী, তা সাধারণ মানুষের জাগতিক আনন্দ-বেদনার সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে।
উনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতার নগরায়ন এবং ঔপনিবেশিক আধুনিকতার স্পর্শে বাংলা সংগীতে এক মিশ্র সামাজিক পরিবেশ তৈরি হয়। ধনিক শ্রেণি, নবাবি দরবার ও জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘বৈঠকী গান’ বা উচ্চাঙ্গ সংগীতের চর্চা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি সাধারণ মানুষের বিনোদনের জন্য শহরের অলিতে-গলিতে গড়ে ওঠে নানা লোকায়ত ও আধা-শহুরে গানের ধারা—যেমন পাঁচালি, তরজা, আখড়াই, হাফ-আখড়াই, কবিগান ও যাত্রার গান।
  • পাঁচালি ও কবিগান: দাশরথি রায়ের পাঁচালি, রাম বসুর কবিগান কিংবা গোপাল উড়ের যাত্রাগান তৎকালীন কলকাতার আপামর জনসাধারণকে ব্যাকুল করে রাখত।
  • টপ্পা ও রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু): এই প্রাক-আধুনিক যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাঙ্গীতিক বিপ্লবটি ঘটান রামনিধি গুপ্ত, যিনি ‘নিধুবাবু’ নামে পরিচিত। তিনি শোরী মিঞার পাঞ্জাবি/লখনউই টপ্পা গানকে বাংলায় এনে তাকে এক রাজকীয় ও রোমান্টিক রূপ দেন। নিধুবাবুর হাত ধরেই বাংলা গানে দেব-দেবী বা অবতারদের বাদ দিয়ে প্রথম খাঁটি লৌকিক মানবী-মানবের ব্যক্তিগত প্রেমের গান আত্মপ্রকাশ করে।
নিধুবাবুর টপ্পায় বাগেশ্রী, ভীমপলশ্রী, সাহানা, বসন্ত, মূলতান, জয়জয়ন্তী, পূরবির মতো উত্তর ভারতীয় রাগগুলোর ব্যবহার দেখা যায়। তবে উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সুরের হুবহু অনুকরণ না করে বঙ্গীয় স্বরকাঠামো অনুযায়ী সেগুলোকে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছিল। এতে ব্যবহৃত হতো যৎ, আড়াঠেকা, মধ্যমান, পোস্তা ইত্যাদি তাল।
একই শতাব্দীতে রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রহ্মসংগীত বাংলা ভক্তিসংগীতকে এক বিদগ্ধ ও গম্ভীর রূপ দান করে। পরবর্তীতে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অন্যান্যদের হাতে ব্রহ্মসংগীত আরও পরিশোধিত হয়। অন্যদিকে, গিরীশচন্দ্র ঘোষ ও ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের নাটকে ব্যবহৃত ‘মঞ্চ-গান’ (Theatre Songs) কলকাতার ঘরে ঘরে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস

লোকসংগীত ও মরমি ঐতিহ্য: বাংলা গানের শাশ্বত প্রাণশক্তি

আধুনিক গানের বহিরাঙ্গ যতই চকচকে হোক না কেন, তার ভেতরের রক্ত-মাংস গঠিত হয়েছে বাংলার লোকসংগীত ও মরমি সাধকদের সুরের নির্যাসে। আমাদের দেশ নদীমাতৃক। এখানকার সমতল, ভাটি অঞ্চল, পাহাড় ও হাওরাঞ্চলের প্রকৃতি মানুষকে স্বভাবজাত সুরকার করে তুলেছে। মানুষ কেবল আনন্দের উদযাপনে গান গায়নি; জীবনসংগ্রামের ক্লান্তি, বৈষম্যের যন্ত্রণা, প্রিয়জন হারানোর হাহাকার ও অভাবের ক্লিষ্টতায় সুরকেই আশ্রয় করেছে।

আঞ্চলিক লোকগানের বিচিত্র রূপ

অঞ্চলভেদে বাংলার লোকসংগীতের রূপ ও স্বরকৌশল ভিন্ন।
  • উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়াচটকা মাওতের বা গাড়োয়ালের বিরহ ও জীবনের কথা বলে।
  • ভাটি অঞ্চলের ভাটিয়ালি সুর মাঝির উদাস মনের হাহাকারকে বিস্তৃত আকাশে ছড়িয়ে দেয়।
  • রাঢ় অঞ্চলের টুসু, ভাদু, কিংবা চড়ক পরবের গম্ভীরা, গাজননীলগান লোকজীবনের ধর্মীয় ও সামাজিক আচারকে প্রকাশ করে।
  • এছাড়া ধামাইল গান, ধান কাটার গান, ধান ভাঙার গান, ধর্মমঙ্গলের গান, সারি গান (নৌকা বাইচের গান), জারি গান (কারবালার বিষাদগাথা), ভাসান গান, বনবিবির গান—প্রতিটি ধারাই বাঙালির লোকায়ত জীবনচর্যার এক একটি অমূল্য দলিল।

আলকাপ ও লেটো গান

লোকসংগীতের এক সুপ্রাচীন ও কৌতুকাবহ ধারা হলো আলকাপ গান, যার আদি উৎস চাঁপাই নবাবগঞ্জ অঞ্চল। ‘আল’ অর্থাৎ ছাঁদ বা ঢং এবং ‘কাপ’ অর্থাৎ কৌতুক। সমাজপ্রান্তিক, অবহেলিত কামার, কুমার, তাঁতি ও দিনমজুর মানুষরা তাঁদের প্রতিদিনের লাঞ্ছনা, শোষণ ও দুঃখের গল্পকে হাস্যরসের মোড়কে ফুটিয়ে তুলতেন এই গানে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কৈশোরে এমনই এক ‘লেটো গানের’ দলে যোগ দিয়ে নিজের সৃজনশীলতার সলতে জ্বালিয়েছিলেন।

মরমি ধারা: লালন সাঁই থেকে শাহ আব্দুল করিম

বাংলা সংগীতে আত্মতত্ত্ব ও দেহতত্ত্বের মাধ্যমে সর্বজনীন মানবতাবোধের বার্তা এনে দিয়েছে বাউল ও মরমি গান।
  • ফকির লালন সাঁই (১৭৭৪–১৮৯০): অষ্টাদশ-উনবিংশ শতকের সন্ধিক্ষণে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আখড়া স্থাপন করে বাউল সাধক লালন সাঁই যে সুর ও দর্শনের জন্ম দেন, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। লালন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের গণ্ডিতে নিজেকে বাঁধেননি। তিনি কুসংস্কার, জাতপাত ও অন্ধ ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে গেয়েছিলেন:
    “জাতের কী রূপ দেখলাম না এক নজরে… / মানুষ তত্ত্ব যার সত্য হয় মনে / সে কী অন্য তত্ত্ব মানবে!”
    লালনের গান ছিল কোনো রাজসভা বা ধনীর ড্রয়িংরুমের গান নয়; বটতলা, নদীকূল কিংবা মেঠো পথের সামিয়ানার নিচে বসে তিনি গেয়েছেন ‘আত্মতত্ত্ব জানরে আগে’। লালনের এই মানবতাবাদী সুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
  • মরমি কবি হাসন রাজা ও বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিম: সিলেটের হাসন রাজা তাঁর জমিদারি বিলাসিতা ত্যাগ করে গেয়েছিলেন বৈরাগ্যের গান। আর বিংশ শতাব্দীতে ভাটি বাংলার সুনামগঞ্জ থেকে উদ্ভাসিত হন আধুনিক কালের বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিম। শাহ আব্দুল করিম কেবল অতীত বিরাগী বাউল ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক সাম্যবাদী চেতনায় সমৃদ্ধ একজন আধুনিক বাউল। তাঁর গান—“গাড়ি চলে না চলে না রে”, “আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম”, কিংবা “বন্দে মায়া লাগাইছে”—প্রমাণ করে যে কীভাবে লোকসংগীতের আধুনিক রূপায়ণ ঘটে।

 

আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস

 

পঞ্চকবির যুগ: আধুনিকতার স্বর্ণদ্বার উন্মোচন

বাংলা কাব্যসংগীতকে আধুনিকতার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে ঐতিহাসিক দায়িত্বটি পালন করেছিলেন পাঁচজন মহীরুহ—যাঁদের আমরা একত্রে ‘পঞ্চকবি’ হিসেবে অভিহিত করি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (ডি. এল. রায়), রজনীকান্ত সেন এবং অতুলপ্রসাদ সেন।
                       ┌─────────────────────────┐
                       │   বাংলা কাব্যসংগীতের    │
                       │        পঞ্চকবি          │
                       └────────────┬────────────┘
                                    │
    ┌───────────────┬───────────────┼───────────────┬───────────────┐
    │               │               │               │               │
┌───┴──────────┐┌───┴──────────┐┌───┴──────────┐┌───┴──────────┐┌───┴──────────┐
│  রবীন্দ্রনাথ   ││ কাজী নজরুল  ││দ্বিজেন্দ্রলাল ││  রজনীকান্ত   ││  অতুলপ্রসাদ  │
│    ঠাকুর     ││    ইসলাম     ││    রায়       ││    সেন       ││    সেন       │
└──────────────┘└──────────────┘└──────────────┘└──────────────┘└──────────────┘

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১)

কথায়, ভাবে, আঙ্গিকে, সুরে ও মননে বাংলা গানে প্রথম বিশ্বমানের সর্বাত্মক আধুনিকতা নিয়ে আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের কড়া অনুশাসন ভেঙে তার সঙ্গে বাংলার বাউল, ভাটিয়ালি ও ইউরোপীয় ওয়েস্টার্ন মেলোডির মেলবন্ধন ঘটান। তাঁর পূজো, প্রেম, প্রকৃতি, বিচিত্র ও স্বদেশ পর্যায়ের গানগুলো কেবল গান নয়—তা বাঙালির জীবনের প্রতিটি মানসিক মুহূর্তের সঙ্গী।
পরাধীন ভারতে স্বদেশবোধ জাগাতে তাঁর গান ছিল সবচেয়ে বড় প্রেরণা। বিশ্ব ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথই একমাত্র ব্যক্তিত্ব, যার রচিত দুটি পৃথক গান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের (বাংলাদেশ ও ভারত) জাতীয় সংগীত হিসেবে গীত হয়।

২. কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬)

রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা সংগীতের ধরণকে দ্বিতীয়বারের মতো বিপুল ঝাকুনি দিয়ে আমূল বদলে দেন ‘জাতীয় কবি’ কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক সাম্যবাদী চেতনার মূর্ত প্রতীক। তিনি বাংলা গানে আরবি-ফারসি শব্দের সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়ে ‘বাংলা গজল’ সৃষ্টি করেন, যা আধুনিক গানের এক অতি জনপ্রিয় ধারায় পরিণত হয়।
মার্চিং টিউন বা রণসংগীত, ইসলামী গান, শ্যামাসংগীত এবং রাগভিত্তিক আধুনিক গান—সব মিলিয়ে নজরুল প্রায় সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন। নজরুল গানে সুরের জটিলতা ও গতির যে ঝড় তুলেছিলেন, তা আধুনিক গানের ভীতকে এক ধাক্কায় অনেক দূর এগিয়ে দেয়। নজরুল গেয়েছিলেন:
“হিন্দু না ওরা মুসলিম? ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন? / কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার!”

৩. দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত ও অতুলপ্রসাদ

  • ডি. এল. রায়: পাশ্চাত্য সংগীতের মার্চিং টিউন ও অপেরা স্টাইলকে বাংলা গানে এনে দেশপ্রেমের নতুন সংজ্ঞা দেন। তাঁর “ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা” আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয় দোলায়িত করে।
  • রজনীকান্ত সেন: কান্তকবি রজনীকান্ত তাঁর ভক্তিগীতির পাশাপাশি স্বদেশী আন্দোলনের সময় গেয়েছিলেন ঐতিহাসিক গান—“মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই”
  • অতুলপ্রসাদ সেন: লখনউতে বসে তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সঙ্গে বাংলা গানের এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটান। তাঁর অমর সৃষ্টি—“মোদের গরব মোদের আশা / আ-মরি বাংলা ভাষা” কিংবা “পাগলা মনটারে তুই বাঁধ”—বাংলা গানের অমূল্য সম্পদ।

 

আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস

 

প্রযুক্তির বিপ্লব: গ্রামোফোন, রেডিও, চলচ্চিত্র ও নারী কণ্ঠের নির্মাণ

আধুনিক বাংলা গানের বিস্তার ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়নে প্রযুক্তির ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। প্রযুক্তির আবির্ভাব না ঘটলে গান কেবল সরাসরি আসর বা মঞ্চেই সীমাবদ্ধ থেকে যেত।

গ্রামোফোনের আবিষ্কার ও এইচএমভি (HMV)

১৮৭৭ সালে টমাস এডিসন প্রথম ‘ফোনোগ্রাফ’ ধারণার জন্ম দিলেও, ১৮৮৭ সালে এমিল বারলাইনার চ্যাপ্টা ডিস্কের ‘গ্রামোফোন’ উদ্ভাবন করেন। এর ফলে গান ধারণ ও বাণিজ্যিক বিপণনের দরজা খুলে যায়।
১৯০৮ সালে ভারতে ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ (HMV) কোম্পানি তাদের যাত্রা শুরু করে। গ্রামোফোন রেকর্ড আসার পর গান ধনী ও অভিজাত পরিবারের বৈঠকখানা থেকে সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাতে শুরু করে। প্রথম দিকে চাবি ঘোরানো গ্রামোফোনে সেলুলয়েড ডিস্কের এক পিঠে একটি এবং অপর পিঠে একটি—মোট দুটি গান বাজানো যেত।

রেডিও ও ‘বেতার জগৎ’

১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে রেডিওর বাণিজ্যিক সম্প্রচার শুরু হলে গান শোনার সংস্কৃতিতে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে। রেডিও হয়ে ওঠে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের নিত্যসঙ্গী। গৃহবধূরা ঘরের কাজ করতে করতে কিংবা কাঁথা সেলাই করতে করতে রেডিওতে গান শুনতেন। রেডিওর কল্যাণে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও ধ্রুপদী ও আধুনিক গানের অনুরাগী হয়ে ওঠেন।
[গীত গোবিন্দ ও চর্যাপদ] ──► [কীর্তন ও টপ্পা] ──► [পঞ্চকবির গান] ──► [গ্রামোফোন ও রেডিও] ──► [আধুনিক বাংলা গান]

চলচ্চিত্রে আধুনিক গান ও নারী কণ্ঠের নির্মাণ

১৯৩০-এর দশকে বাংলা সিনেমা ‘সবাক’ (কথা ও গানযুক্ত) রূপ লাভ করলে আধুনিক গানের নতুন বাজার তৈরি হয়। এতদিন যিনি গান লিখতেন, তিনিই সুর দিতেন এবং তিনিই গাইতেন। কিন্তু চলচ্চিত্র ও রেকর্ডিং ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজনে সাঙ্গীতিক কাজের বিভাজন ঘটে—গীতিকার, সুরকার এবং কণ্ঠশিল্পী সম্পূর্ণ আলাদা তিনটি পেশাদারি সত্তায় রূপান্তরিত হন।
সংগীতের ইতিহাসবিদ সুচেতনা ভট্টাচার্য্য তাঁর পিএইচডি গবেষণায় ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ের জনপ্রিয় গানের প্রেক্ষাপটে কণ্ঠশিল্পী ও অভিনেত্রী কানন দেবী-কে কেন্দ্র করে বাংলা সংগীতে ‘নারী কণ্ঠের প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণ ও রূপায়ণ’ বিষয়ে গভীর আলোকপাত করেছেন।
কানন দেবীর আবির্ভাব তৎকালীন সমাজে গৃহবধূ বা সাধারণ নারীদের গান গাওয়ার সামাজিক নিষেধাজ্ঞাকে ভেঙে দেয়। চলচ্চিত্রে ও বেসিক রেকর্ডে কানন দেবীর স্বকীয় কণ্ঠমাধুর্য, আধুনিক উচ্চারণরীতি ও পরিবেশনা শৈলী বাংলা গানে এক নতুন ধরনের ‘আধুনিক নারী কণ্ঠ’-এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে, যা পরবর্তীকালের সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায় কিংবা লতা মঙ্গেশকরের মতো শিল্পীদের পথ সুগম করেছিল।

আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস

বিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে আশির দশক: আধুনিক গানের স্বর্ণযুগ

১৯৫০ থেকে ১৯৮০-এর দশককে আধুনিক বাংলা গানের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়। এই সময়ে গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালকদের এক অভাবনীয় সমন্বয় ঘটেছিল। চলচ্চিত্রে ব্যবহারের পাশাপাশি ‘পূজার গান’ বা বেসিক অডিও রেকর্ড হিসেবে শত শত কালজয়ী আধুনিক গান প্রকাশিত হতে থাকে।

লিজেন্ডারি গীতিকার ও সুরকার

এই যুগের গানগুলোকে অমর করে তোলার পেছনে ছিলেন প্রণব রায়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, শ্যামল গুপ্ত, মুকুল দত্তের মতো কালজয়ী গীতিকারগণ।
সুরকার হিসেবে বাংলা গানকে বিশ্বমানে উন্নীত করেন সলিল চৌধুরী। তিনি ওয়েস্টার্ন সিমফনি, মেঠো সুর ও অর্কেস্ট্রেশনের এমন এক জটিল ও অপূর্ব মিশ্রণ ঘটান যা বাংলা গানকে নতুন আধুনিকতা দেয়। এছাড়া শচীন দেববর্মন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, নচিকেতা ঘোষ, সুধীন দাশগুপ্ত, শ্যামল মিত্র, রবীন চট্টোপাধ্যায়, সালাউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ সংগীত পরিচালক আধুনিক গানকে সুরের বৈচিত্র্যে ভরিয়ে দেন।

সুরের নক্ষত্রপুঞ্জ (কণ্ঠশিল্পী)

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গম্ভীর ও দরদী কণ্ঠ, মান্না দে-র শাস্ত্রীয় সংগীতের দখল ও বৈচিত্র্যময় গায়কি, শচীন দেববর্মন ও রাহুল দেববর্মনের মাটির সুরের টান, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠমাধুর্য বাঙালির হৃদয় জয় করে নেয়।
অন্যদিকে লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, প্রতিভা বসুর মতো নারী শিল্পীদের কণ্ঠে আধুনিক বাংলা গান এক চিরন্তন নান্দনিকতায় পৌঁছায়।

আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস

নতুন মাধ্যম, পপ ও ব্যান্ড সংগীতের রেনেসাঁ (১৯৭০ উত্তর)

ষাট ও সত্তরের দশকে গ্রামোফোন ডিস্কের পাশাপাশি বাজারে আসে ফিফথ-জেনারেশন মেগনেটিক ফিতা বা অডিও ক্যাসেট। এই ক্যাসেটের সুলভ মূল্য ও ক্যাসটে প্লেয়ারের সহজলভ্যতা অডিও বাণিজ্যকে এক তুঙ্গে নিয়ে যায়।
[গ্রামোফোন রেকর্ড (HMV)] ──► [অডিও ক্যাসেট (Tape)] ──► [কম্প্যাক্ট ডিস্ক (CD)] ──► [ডিজিটাল ও স্ট্রিম (Streaming)]

বাংলাদেশের স্বাধীনতাত্তোর গান ও ব্যান্ড আন্দোলন

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ঐতিহ্যবাহী আধুনিক গানের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের রক, পপ ও ব্লুজ সুরের মিশ্রণে শুরু হয় ‘বাংলা ব্যান্ড সংগীত’ বা পপ আন্দোলন।
  • আজম খান: স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের মুক্তিযোদ্ধা আজম খানকে বলা হয় ‘বাংলা পপ সংগীতের গুরু’। তিনি সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষায় “এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে” কিংবা “রেললাইনের ঐ বস্তিতে” গেয়ে যুবসমাজকে উথাল-পাথাল করে দেন।
  • ফকির আলমগীর ও পিলু মমতাজ: গণসংগীত ও পপের মিশ্রণে নতুন জোয়ার আনেন।
  • ব্যান্ড বিপ্লব: আশির ও নব্বইয়ের দশকে হ্যাপি আকন্দ ও লকি আকন্দের সুরের ধারা ধরে গড়ে ওঠে ‘মাইলস’, ‘এলআরবি’ (আইয়ুব বাচ্চু), ‘নগর বাউল’ (জেমস), ‘সোলেস’ (পার্থ বড়ুয়া), ‘রেনেসাঁ’ (নকীব খান), ‘ফিডব্যাক’ (মাকসুদ)-এর মতো কিংবদন্তি সব ব্যান্ড। জেমসের সাইকেডেলিক বাউল-রক কিংবা আইয়ুব বাচ্চুর ব্লুজ-রক গীটার আধুনিক বাংলা গানের পরিধিকে আন্তর্জাতিক মাত্রায় নিয়ে যায়।

 

পশ্চিমবঙ্গের ‘জীবনমুখী গান’

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গে সুমান চট্টোপাধ্যায় (কবীর সুমন), নচিকেতা চক্রবর্তী এবং অঞ্জন দত্তের হাত ধরে শুরু হয় ‘জীবনমুখী গান’। প্রেম-বিরহের প্রচলিত চর্বিতচর্বন ছক থেকে বেরিয়ে এসে শহরের দৈনন্দিন নাগরিক সমস্যা, রাজনীতি, বেকারত্ব ও মধ্যবিত্তের ভণ্ডামিকে তীক্ষ্ণ কটাক্ষ করে লেখা এই গানগুলো তরুণ সমাজকে পুনরায় শব্দ ও বাণীর প্রতি আকৃষ্ট করে। পরবর্তীতে ‘চন্দ্রবিন্দু’, ‘ফসিলস’ (রূপম ইসলাম), ‘ক্যাকটাস’-এর মতো ব্যান্ড এই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস
আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস

গানের মূল চার উপাদান ও ‘আধুনিকায়নে’র বিভ্রান্তি: একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ

সংগীতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো সার্থক ও কালোত্তীর্ণ গানের প্রধানত চারটি মূল উপাদান থাকে:
┌────────────────────────────────────────────────────────┐
│                   সংগীতের মূল ৪ উপাদান                   │
└───────────────────────────┬────────────────────────────┘
                            │
     ┌──────────────────────┼──────────────────────┐
     │                      │                      │
┌────┴─────────┐     ┌──────┴──────┐        ┌──────┴──────┐        ┌───────────┐
│ ১. কথা / বাণী │     │  ২. সুর     │        │  ৩. গায়কি   │        │ ৪. যন্ত্র  │
└──────────────┘     └─────────────┘        └─────────────┘        └───────────┘
বর্তমান আধুনিক প্রেক্ষাপটে এর সঙ্গে পঞ্চম উপাদান হিসেবে যোগ হয়েছে ‘দৃশ্যমানতা’ (Visuals/Music Video)। প্রযুক্তির উন্নয়নে মানুষ এখন কেবল গান শোনে না, মিউজিক ভিডিওতে গান দেখেও আনন্দ পায়। কিন্তু সংগীতে যদি প্রথম চারটি মূল উপাদানের উৎকর্ষ না থাকে, তবে কেবল চোখ ধাঁধানো দৃশ্যপট, কস্টিউম বা কোরিওগ্রাফি দিয়ে কোনো গানকে শেষ পর্যন্ত উতরে নেওয়া সম্ভব নয়।
সম্প্রতি বাংলা সংগীতে ‘আধুনিকায়ন’-এর নামে কিছু অসাধু ও মেধাহীন বাণিজ্যিক প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা সংসংগীতের সুদূরপ্রসারী মানের চরম অবনমন ঘটাচ্ছে। নিচে চার উপাদানের নিরিখে এই সংকটের একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো:

১. কথা বা বাণী (Lyrics)

গানের বাণী মূলত একটি সংহত কবিতা বা সাহিত্যকর্ম। অতীতের গীতিকাররা কেবল সুরের দাস ছিলেন না, তারা ছিলেন উঁচুমানের কবি। একটি গান দীর্ঘকাল বেঁচে থাকে তার কাব্যগুণ ও বিষয়বৈচিত্র্যের কারণে।
কিন্তু বর্তমানে তথাকথিত আধুনিকায়নের নামে বাণীতে কাব্যহীনতা ও চরম চটুলতা দেখা যাচ্ছে। অনেকে মনে করেন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পর বাংলা গান আটকে গেছে, তাই তারা আধুনিকায়নের দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, তাদের গানে নতুনত্ব বলতে কেবল অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি শব্দের প্রক্ষেপণ কিংবা চটুল বাক্যের ব্যবহার।
ইদানীংকালে সর্বনাম পাল্টানোর এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—‘তুমি’র স্থানে স্রেফ ‘তুই’ ব্যবহার করেই দাবি করা হচ্ছে গান নাকি অতি-আধুনিক হয়ে গেছে! অথচ স্থান-কাল- পাত্রভেদে ‘আপনি’, ‘তুমি’ বা ‘তুই’ সব শব্দই সংগীতে ব্যবহারে বাধা নেই; মূল বিষয় হলো বাণীর কাব্যিক গভীরতা ও বিষয়ের নতুনত্ব। ঈশ্বর বন্দনা, দেশপ্রেম ও মানব-মানবীর গতানুগতিক প্রেমের বাইরে আমাদের জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক জীবনের কথা সংগীতে উঠে না এলে কেবল শব্দ পাল্টে আধুনিকায়ন করা অসম্ভব।

২. সুর (Tune/Composition)

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ভারতীয় রাগসঙ্গীতের ব্যাকরণ ভেঙে ও আত্মস্থ করে নতুন নতুন সুর ও তালের জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে নতুন আসা অনেক সুরকারেরই মৌলিক সুর, স্কেল ও রাগের ওপর বিন্দুমাত্র প্রাথমিক জ্ঞান বা সাধনা নেই। ফলে সুরের মৌলিক নিয়মকানুন লঙ্ঘিত হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে একঘেয়ে ও পুনরাবৃত্তিমূলক সুর।
এর চেয়েও মারাত্মক অনৈতিক পন্থা হলো—বিদেশি গানের সুর হুবহু চুরি করে আধুনিক গান হিসেবে চালিয়ে দেওয়া। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের বিদেশি সুর গ্রহণের উদাহরণের দোহাই যারা দেন, তারা ভুলে যান যে এই মনীষীরা বিদেশি সুরকে নিজেদের অসাধারণ মেধা দিয়ে আত্মস্থ করে সম্পূর্ণ নতুন এক বঙ্গীয় আবহে পুনর্জন্ম দিতেন। নকল করা আর সার্থক আত্মীকরণ এক জিনিস নয়।

৩. গায়কি (Singing/Gayaki)

গায়কি হলো একটি গানের প্রাণ। একজন দক্ষ কণ্ঠশিল্পী তাঁর সুরের জাদু ও বাচনিক দক্ষতা দিয়ে গানকে শ্রোতার হৃদয়ে গেঁথে দেন। এর জন্য প্রয়োজন বছরের পর বছর নিরবচ্ছিন্ন রিয়াজ ও সাধনা।
অথচ আজ সা রে গা মা পা-র প্রাতিষ্ঠানিক তালিম ছাড়াই বাদ্যযন্ত্রের তুমুল শব্দের অন্তরালে নিজের কণ্ঠের দুর্বলতা ঢেকে রাতারাতি তারকাশিল্পী হওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। নিজ কণ্ঠের পরিসর ও সুরের অভাব ঢাকতে অহেতুক ফিসফিসানি কণ্ঠে (Husky Voice) গাওয়ার এক কৃত্রিম ফ্যাশন তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন রিয়েলিটি শো রাতারাতি তারকা তৈরি করলেও, সাধনার অভাবের কারণে এরা দ্রুতই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছেন। কণ্ঠের কাজ বাদ দিয়ে কেবল দৃশ্যভিত্তিক পরিবেশনার চমক দিয়ে ক্ষণিকের জন্য বাজার মাতানো গেলেও, তা কালোত্তীর্ণ গান তৈরি করতে পারে না।

৪. যন্ত্রাণুষঙ্গ (Arrangement/Instrumentation)

যন্ত্রাণুষঙ্গ হলো গানের অলংকার। ভালো গান মানুষ বাদ্যযন্ত্র ছাড়াও খালি গলায় কেবল মেধার জোরে গেয়ে মানুষের মনে দাগ কাটতে পারে। কিন্তু বর্তমানে মূল গান ও গায়কিকে খাটো করে প্রচুর উচ্চকিত ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ধুমধাড়াক্কা শব্দে গানের আসল মাধুর্যকে হত্যা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—নতুন মৌলিক গান তৈরির মেধা ও সাহস না থাকায় অনেকেই অতীত দিনের কালজয়ী ও মহীরুহদের তৈরি পুরোনো জনপ্রিয় গানগুলোকে (যেমন রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত বা লোকগান) “নতুন সংগীতায়োজন” বা “ফিউশন”-এর চটকদার ট্যাগ লাগিয়ে বিকৃত করছেন। রবীন্দ্রসংগীত বা লোকগানে আধুনিক বিশ্বমানের যন্ত্র ব্যবহার ব্যবহারে কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু তা করতে হবে সাঙ্গীতিক মেধা ও শ্রদ্ধাবোধ রেখে। কেবল বাণিজ্যিক বাজার দখলের উদ্দেশ্যে সুরের বুনিয়াদ নষ্ট করে দেওয়া কোনো আধুনিকায়ন নয়, বরং তা ঐতিহ্য ধ্বংসের নামান্তর।

কালোত্তীর্ণ সংগীতের ভবিষ্যৎ ও সাধনার প্রয়োজনীয়তা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সত্যই বলেছিলেন:
“বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারে রত্ন যাহা কিছু পাওয়া যায়, তাহা গান।”
বাংলা সংগীতের ইতিহাস কেবল কিছু সুর বা পদের সমাহার নয়; এটি বঙ্গীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল, অনুভূতিপ্রবণ ও প্রানবন্ত দর্পণ। প্রাচীন চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যদের রূঢ় সাধন-সঙ্গীত থেকে শুরু করে সেন আমলের গীতগোবিন্দ, মধ্যযুগের কীর্তন, রামপ্রসাদী, নিধুবাবুর টপ্পা, বাউল-ভাটিয়ালির মেঠো সুর, পঞ্চকবির কাব্যসঙ্গীত, গ্রামোফোন-রেডিও-সিনেমার স্বর্ণযুগ এবং পরবর্তীকালের ব্যান্ড ও জীবনমুখী আন্দোলন—প্রতিটি ধাপেই বাংলা গান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে পুনর্নির্মাণ করেছে।
এই সুদীর্ঘ বিবর্তন প্রমাণ করে যে, প্রকৃত ‘আধুনিকতা’ কখনো বাসী বা পুরোনো হয় না। যা শত বছর পরও মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে, তা আজও সমানভাবে আধুনিক। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের গান আজ একশত বছর পর দাঁড়িয়েও যেকোনো নতুন সুরের চেয়ে বহুগুণ বেশি আধুনিক ও প্রাসঙ্গিক।
আধুনিকায়নের নামে চমক সৃষ্টি করা আর প্রকৃত সাঙ্গীতিক সৃজনশীলতা এক কথা নয়। স্বল্প পরিশ্রমে, চটুল কৌশল অবলম্বন করে কিংবা অতি-প্রযুক্তির আড়ালে ক্ষণিকের জনপ্রিয়তা পাওয়া গেলেও, তা সংগীতে কোনো স্থায়ী আসন তৈরি করতে পারে না। আমাদের প্রয়োজন ব্যবসায়িক মানসিকতার পরিবর্তে সংগীতের প্রতি নিবেদিত সাধকের, যিনি সংগীতের চার উপাদান—বাণী, সুর, গায়কি ও যন্ত্রাণুষঙ্গ-এর প্রতি নিষ্ঠাবান থেকে কাজ করবেন।
সংগীতের পথটি সাধনার পথ, সহজ উপায়ে তারকা হওয়ার পথ নয়। বাংলা সংগীতের এই হাজার বছরের গৌরবময় ব্যাটনকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে অক্ষত ও সমৃদ্ধভাবে তুলে দিতে হলে আমাদের পুনরায় মেধা, সাধনা, জ্ঞান ও সততার চর্চায় ফিরে যেতে হবে। তবেই বাংলা গান তাঁর আবহমানকালের রাজকীয় মর্যাদা রক্ষা করে অনন্তকাল বিশ্বমঞ্চে স্বমহিমায় প্রজ্জ্বলিত থাকবে।
Tags :

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।

https://sufifaruq.com/

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।