বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের অন্যতম জনপ্রিয়, প্রাণবন্ত ও কালজয়ী রোমান্টিক-কৌতুকধর্মী লোকজ গান “আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে”। ‘আঁখি মিলন’ চলচ্চিত্রের জন্য নির্মিত এই অবিস্মরণীয় গানটির কথা ও সুরের রূপকার ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। প্লেব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোর এবং মিষ্টি কণ্ঠের সামিনা চৌধুরীর চটুল গায়কীতে গানটি গ্রামীণ বাংলার নবদম্পতির খুনসুটি, কৃত্রিম মান-অভিমান এবং চিরচেনা বিবাহ-সংস্কৃতিকে অত্যন্ত হাস্যরসাত্মক ও ছন্দময় রূপ দিয়েছে।
পর্দায় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ও চিত্রনায়িকা সুচরিতার অনবদ্য অভিব্যক্তি ও রসায়নে গানটি তৎকালীন সময়ে দর্শক-শ্রোতাদের মাঝে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| গানের নাম | আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে |
| চলচ্চিত্র | আঁখি মিলন |
| কণ্ঠশিল্পী | এন্ড্রু কিশোর ও সামিনা চৌধুরী |
| গীতিকার ও সুরকার | আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল |
| পরিচালনা | মোস্তফা আনোয়ার |
| অভিনয়ে | ইলিয়াস কাঞ্চন ও সুচরিতা |
| সংগীতধারা | বাংলা চলচ্চিত্র রোমান্টিক-কমেডি ডুয়েট / ফোক-পপ মেলোডি |
| মূল উপজীব্য | গ্রামীণ নবদম্পতির মিষ্টি মান-অভিমান, খুনসুটি ও বিবাহের আবহ |
| উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ | গরুর গাড়ি, সানাইয়ের বোল, বেনারসী শাড়ি, সোনার গয়না ও ইন্দ্রপুর |
আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে লিরিক্স
আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে
ধুত্তুর ধুত্তুর ধুত্তুর ধু সানাই বাজিয়ে
যাবো তোমায় শ্বশুর বাড়ি নিয়ে
(যা যা…)
তোমার ভাঙা গাড়িতে আমি যাবো না
কারো ঘরের ঘরণী আমি হবো না
করবো না তো কোনো দিনও বিয়ে
এ হে, যাবো তোমায় শ্বশুর বাড়ি নিয়ে
আলতা দেবো তিকলি দেবো, দেবো সোনার চুড়ি
(না না না না না না…)
আরে, শহর থেকে আনবো কিনে বেনারসী শাড়ি
(আরে, না না না না না…)
গয়না-গাটি চাইনা আমি চাইনা শাড়ি চুড়ি
(হেই হেই হেই হেই হেই হেই…)
সবই আমার বাপের বাড়ি আছে ভুরিভুরি
(আরে, হেই হেই হেই হেই হেই হেই…)
ভরবেনা মন কোনো কিছু দিয়ে
হে, যাবো তোমায় শ্বশুর বাড়ি নিয়ে
আদর দেবো সোহাগ দেবো, দেবো ভালোবাসা
(না না না না না না…)
আরে, জীবন দিয়ে করবো পূরণ তোমার সকল আশা
(না না না না না না…)
ইন্দ্রপুরে মনের ঘরে দিও নাকো হানা
(হেই হেই হেই হেই হেই হেই…)
এই সব কথা শোনা পাপ গুরুজনের মানা
(আরে, হেই হেই হেই হেই হেই হেই…)
এই, পায়ে ধরি চল বাড়ি নিয়ে
যাবো তোমায় শ্বশুর বাড়ি নিয়ে
Amar Gorur Garite lyrics
Amar gorur garite bou sajiye
dhuttur dhuttur dhuttur dhu sanai bajiye.
jabo tomay shoshour bari niye
(Ja ja…)
tomar vanga garite ami jabo na
karo ghorer ghoroni ami hobo na
korbo na to kono din o biye
E he, jabo tomay shoshur bari niye
Alta debo tikli debo, debo sonar churi
(na na na na na na…)
aare, sohor theke anbo kine benaroshi shari
(Aare, na na na na na)
goyna-gati chai na ami chai na shari churi
(hei hei hei hei hei hei…)
vorbena mon kono kishu diye
He, jabo tomay shoshur bari niye
Ador debo sohag debo, debo valobasha
(na na na na na na…)
aare, jibon diye korbo puron tomar sokol asha
(na na na na na na…)
Indropure moner ghore dio nako hana
(hei hei hei hei hei hei…)
ei sob kotha shona pap gurujoner mana
(aare, hei hei hei hei hei hei…)
ei, paye dhori cholo bari niye
Jabo tomay shoshur bari niye
গানের মূল ভাব
“আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে” গানটির মূল নির্যাস হলো নবদম্পতির মধ্যকার সরল, চপল ও মিষ্টি প্রেমের দ্বন্দ্ব। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে বিয়ের পর নতুন বধূকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাওয়ার চিরায়ত লোকজ বাহন ছিল গরুর গাড়ি। সেই আবহে বর যখন অপরিসীম আনন্দ ও ভালোবাসায় কনেকে সাজিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, নববধূ তখন কৃত্রিম অভিমান ও গাম্ভীর্য দেখিয়ে সবকিছু প্রত্যাখ্যান করে।
নায়ক আলতা, টিকলি, সোনার চুড়ি, বেনারসী শাড়ির মতো পার্থিব উপহার এবং সবশেষে অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রস্তাব দেয়। বিপরীতে নায়িকা বাপের বাড়ির প্রাচুর্য ও গুরুজনের নিষেধাজ্ঞার অজুহাত তুলে নাকচ করতে থাকে। কিন্তু এই বাহ্যিক অস্বীকৃতির আড়ালে যে খাঁটি অনুরাগ ও লজ্জার এক মিষ্টি টানাপোড়েন লুকিয়ে থাকে, তা গানটির শেষ পর্যায়ে চমৎকারভাবে উন্মোচিত হয়।
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. গরুর গাড়ি ও সানাইয়ের আগমনী সুর
- “আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে / ধুত্তুর ধুত্তুর ধুত্তুর ধু সানাই বাজিয়ে / যাবো তোমায় শ্বশুর বাড়ি নিয়ে…”সানাইয়ের মুখে উচ্চারিত লোকজ বোল (“ধুত্তুর ধুত্তুর ধু”) এবং গরুর গাড়ির মতো আবহমান গ্রামীণ অনুষঙ্গের মাধ্যমে গানটির শুরুতেই একটি উৎসবমুখর বিয়ের আমেজ তৈরি হয়। প্রেমাস্পদকে নিজের ঘরে বরণ করে নেওয়ার গর্ব ও আনন্দ এখানে প্রস্ফুটিত।
২. কৃত্রিম অভিমান ও প্রত্যখ্যান
- “তোমার ভাঙা গাড়িতে আমি যাবো না / কারো ঘরের ঘরণী আমি হবো না / করবো না তো কোনো দিনও বিয়ে…”নববধূর লাজুক প্রতিরোধ ও চঞ্চলতার প্রকাশ। সরাসরি প্রেমিকের দাবি মেনে না নিয়ে তাকে একটু জ্বালানো এবং নিজের মান বাড়ানোর যে চিরচেনা নারীসুলভ মনস্তত্ত্ব, তা এই পদগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে।
৩. উপহারের প্রলোভন বনাম বাপের বাড়ির প্রাচুর্য
- “আলতা দেবো তিকলি দেবো, দেবো সোনার চুড়ি… শহর থেকে আনবো কিনে বেনারসী শাড়ি / গয়না-গাটি চাইনা আমি… সবই আমার বাপের বাড়ি আছে ভুরিভুরি…”প্রেমিক বধূকে খুশি করতে শহরের আধুনিক শৌখিন সামগ্রীর প্রস্তাব দেয়। কিন্তু প্রেমিকা নিজের ব্যক্তিত্ব ও বাপের বাড়ির আভিজাত্যের কথা বলে তা ফিরিয়ে দেয়, যা মূলত তাদের মধ্যকার খুনসুটিকে আরও জমিয়ে তোলে।
৪. ভালোবাসার চূড়ান্ত নিবেদন ও আত্মসমর্পণ
- “আদর দেবো সোহাগ দেবো, দেবো ভালোবাসা… ইন্দ্রপুরে মনের ঘরে দিও নাকো হানা / এই সব কথা শোনা পাপ গুরুজনের মানা…”পার্থিব উপহার ছেড়ে যখন আন্তরিক সোহাগ ও জীবন দিয়ে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার করা হয়, তখন প্রেমিকার প্রতিরোধের দেয়াল ভেঙে পড়ে। যদিও মুখে সে গুরুজনের শাসন ও লোকলজ্জার কথা বলে, শেষ পর্যন্ত পায়ে ধরে হলেও ঘরে নিয়ে যাওয়ার মিষ্টি আকুলতায় সম্পর্কের পূর্ণ মিলন ঘটে।
সাহিত্যিক ও লোকজ বৈশিষ্ট্য
- লোকজ ছড়ার আদলে রচনা: আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল গ্রামীণ ছড়া ও মুখের কথার ছন্দে গানটি বেঁধেছেন। ‘ধুত্তুর ধুত্তুর ধু’, ‘ঘরণী’, ‘ইন্দ্রপুর’-এর মতো শব্দের ব্যবহারে মাটি ও মানুষের সৌরভ স্পষ্ট।
- প্রশ্নোত্তর ও সংলাপধর্মী আঙ্গিক (Call-and-Response): গানটি একটি পরিপূর্ণ নাট্যসংলাপের মতো। একপক্ষের প্রস্তাব ও অপরপক্ষের কৌতুকপূর্ণ প্রত্যাখ্যান গানটিকে অত্যন্ত গতিশীল ও উপভোগ্য করে তুলেছে।
- গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী চিত্রকল্প: মাটির পথ, গরুর গাড়ি, লাল টুকটুকে শাড়ি ও সানাইয়ের সুর মিলিয়ে একটি হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ রূপকথাকে গানের ভাষায় ধরে রাখা হয়েছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও গায়কীর রসায়ন
- এন্ড্রু কিশোর ও সামিনা চৌধুরীর দ্বৈত চমক: এন্ড্রু কিশোরের উচ্ছল, চটুল ও আত্মবিশ্বাসী গায়কী এবং সামিনা চৌধুরীর তীক্ষ্ণ, মিষ্টি ও মান-অভিমানভরা স্বরপ্রক্ষেপণ চরিত্র দুটির রসায়নকে জীবন্ত করে তোলে। হাসির মৃদু ছোঁয়া ও বিভিন্ন আঞ্চলিক টানের সঠিক প্রয়োগ গানটিকে অনন্য করেছে।
- আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরবিন্যাস: আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আধুনিক অর্কেস্ট্রেশন ও লোকজ বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণে সুরের এমন এক রিদম তৈরি করেছেন যা শ্রোতার পা দোলাতে বাধ্য করে। ঢোল, তবলা, বাঁশি এবং অ্যাকর্ডিয়নের ছন্দময় সমন্বয় গানটিতে সার্বক্ষণিক প্রাণচাঞ্চল্য বজায় রাখে।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল (১৯৫৬–২০১৯): একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত এবং দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী এই সংগীত মহীরুহ বাংলা আধুনিক, দেশাত্মবোধক ও চলচ্চিত্র সংগীতে অসামান্য বিপ্লব এনেছিলেন। তাঁর সৃষ্টিতে একই সাথে দেশপ্রেম ও মাটির গন্ধ মিশে থাকত।
- এন্ড্রু কিশোর (১৯৫৫–২০২০): বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অবিসংবাদিত ‘প্লেব্যাক সম্রাট’। আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই কিংবদন্তি শিল্পী দীর্ঘ চার দশক ধরে রূপালী পর্দায় সুরের ইন্দ্রজাল বিস্তার করেছিলেন।
- সামিনা চৌধুরী: বিশিষ্ট সংগীত পরিবারের সন্তান ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত কণ্ঠশিল্পী সামিনা চৌধুরীর কণ্ঠের কোমলতা ও এক্সপ্রেশন এই দ্বৈত গানটিকে এক বিশেষ মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিল।
চলচ্চিত্রপ্রেক্ষিত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
উৎস ও তথ্যসূত্র
- আঁখি মিলন, মূল মোশন পিকচার সাউন্ডট্র্যাক আর্কাইভ।
- আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল: সুর ও সাধনা, সংগীত গবেষণা সেল।
- বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও অডিও প্রযোজনা সংস্থা (অনুপম রেকর্ডিং মিডিয়া) ক্যাটালগ।
সব ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত বাংলা গানের কথা সংগ্রহ করে সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য প্রকাশে কাজ করছে ‘লিরিক ডেস্ক’। আপনার কাঙ্ক্ষিত গানটি আমাদের ওয়েবসাইটে না পেলে জানান; আমরা তা সংগ্রহ করে দ্রুত আপলোড করে দেব।







![আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে লিরিক্স [ Amar Gorur Garite lyrics ] - এন্ড্রু কিশোর ও শামিনা চৌধুরী [ Andrew Kishore & Shamina ] 1 আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2022/06/আমার-গরুর-গাড়িতে-বউ-সাজিয়ে.png)
![তুমি না থাকলে লিরিক্স [ Tumi Na Thakle Song Lyrics ] । অঞ্জন দত্ত ও ঊষা উথুপ । Anjan Dutta And Usha Uthup 3 অঞ্জন দত্ত](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2022/06/অঞ্জন-দত্ত.png)





