সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জানুয়ারি ২০২৬, ৫:৩ এএম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতার সংগীত জগতের অন্যতম পরিচিত মুখ, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী অনিতা ঘোষের (৬৫) রহস্যজনক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোটা বেহালা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গত সোমবার (১৯ জানুয়ারি, ২০২৬) দক্ষিণ কলকাতার পর্ণশ্রী এলাকার নিজ বাসভবন থেকে তাঁর রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এক সময়ের আকাশবাণী ও দূরদর্শনের এই নিয়মিত সংগীতশিল্পীর নিজ গৃহকর্মীর হাতে এমন করুণ মৃত্যু নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
Table of Contents
বেহালার পর্ণশ্রী থানাধীন বেচারাম চ্যাটার্জি রোডের ‘প্রিয়দর্শিনী অ্যাপার্টমেন্ট’-এর একটি ফ্ল্যাটে স্বামী অরূপ ঘোষের সঙ্গে থাকতেন অনিতা ঘোষ। স্বামী অরূপ ঘোষ দীর্ঘদিন ধরে ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রম) রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁকে দেখাশোনার জন্য এবং ঘরকন্যার কাজের জন্য একাধিক গৃহকর্মী নিয়োজিত ছিল। সোমবার বিকেলে শিল্পীর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সন্দেহ হলে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে ঘর থেকে তাঁর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, তাঁর মুখ, পেট ও শরীরের বিভিন্ন অংশে ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ওই বাড়িতে কর্মরত দুইজন গৃহকর্মী এবং একজন রাঁধুনিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সঞ্জু সরকার নামের এক গৃহকর্মী হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বকেয়া মজুরির দাবি নিয়ে অনিতা ঘোষের সঙ্গে সঞ্জুর বিবাদ শুরু হয়। বিবাদের এক পর্যায়ে সঞ্জু ক্ষিপ্ত হয়ে ধারালো ছুরি দিয়ে গায়িকাকে নৃশংসভাবে আঘাত করতে থাকে। অনিতা ঘোষ নিস্তেজ হয়ে পড়লে ঘাতক সঞ্জু তাঁর শরীর থেকে সোনার গয়না খুলে নেয় এবং ঘরের আলমারি লুট করে নগদ টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
অনিতা ঘোষ হত্যাকাণ্ডের মূল তথ্যচিত্র:
| বিষয়ের শিরোনাম | ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ |
| নিহত ব্যক্তি | অনিতা ঘোষ (৬৫), বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী। |
| হত্যাকাণ্ডের স্থান | প্রিয়দর্শিনী অ্যাপার্টমেন্ট, বেহালা, কলকাতা। |
| হত্যাকাণ্ডের সময় | ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ (সোমবার)। |
| প্রধান ঘাতক | সঞ্জু সরকার (নিজ গৃহকর্মী)। |
| হত্যার ধরন | একাধিক ছুরিকাঘাত ও লুণ্ঠন। |
| নিহতের ক্যারিয়ার | আকাশবাণী ও দূরদর্শনের নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী। |
| পারিবারিক অবস্থা | স্বামী অসুস্থ, ছেলে আলাদা ফ্ল্যাটে থাকতেন। |
অনিতা ঘোষের একমাত্র ছেলে বেহালার অন্য একটি ফ্ল্যাটে সপরিবারে বসবাস করেন। ফলে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে এই ফ্ল্যাটে অনিতা কার্যত গৃহকর্মীদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এটি কেবল বকেয়া টাকার বিবাদ নয়, বরং পরিকল্পিত লুণ্ঠন। ঘাতক সঞ্জু জানত যে অনিতার স্বামী অসুস্থ এবং বাড়িতে বাধা দেওয়ার মতো আর কেউ নেই। পুলিশ জানিয়েছে, লুট হওয়া স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ উদ্ধারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অনিতা ঘোষের মৃত্যুতে কলকাতার সাংস্কৃতিক মহলে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। রবীন্দ্রসংগীত ও আধুনিক গানে তাঁর দক্ষতা ছিল সর্বজনবিদিত। দূরদর্শন ও আকাশবাণীর মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাঁর সহকর্মীরা জানিয়েছেন, অনিতা ঘোষ ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত এবং ধীরস্থির প্রকৃতির মানুষ। তাঁর মতো একজন গুণী মানুষের এমন পরিণতি মেনে নেওয়া কঠিন।
কলকাতা পুলিশ অভিযুক্ত সঞ্জু সরকারকে রিমান্ডে নিয়ে আরও গভীর তদন্ত শুরু করেছে। বাড়িতে কাজ করতে আসা ব্যক্তিদের অতীত রেকর্ড যাচাই (Police Verification) না করার পরিণাম যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই হত্যাকাণ্ড আবারও তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। গায়িকার মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মন্তব্য