ভারতের বর্ষীয়ান রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বিভা সেনগুপ্ত আর নেই। মঙ্গলবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯৪ বছর বয়সে মারা গেছেন তিনি। দীর্ঘ সংগীতজীবনে রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা, পরিবেশন এবং শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন এই শিল্পী। তার প্রয়াণে সংগীতাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের আবহ।
বেশ কিছুদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বিভা সেনগুপ্ত। বয়সজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন সংগীতশিল্পী শ্রাবণী সেন। তিনি জানান, বিভা সেনগুপ্ত সাধারণত সুস্থ-সবলই থাকতেন। তবে মাঝেমধ্যে তার রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হতো। সম্ভবত হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম থাকার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও বিভা সেনগুপ্তকে তার বাড়িতে গিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ‘লোকভারতী’ নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে তার বাসভবনে এই আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংগীতশিল্পী অলক রায়চৌধুরী। শিল্পীর জীবনের শেষদিকের এই সাক্ষাৎ এখন তার কাছে হয়ে উঠেছে এক আবেগঘন স্মৃতি।
অলক রায়চৌধুরী স্মৃতিচারণ করে বলেন, সেদিন তিনি লোকভারতীর পক্ষ থেকে বিভা সেনগুপ্তকে সংবর্ধনা জানাতে তার বাড়িতে গিয়েছিলেন। তখন তাকে বেশ প্রাণবন্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়েছিল। অনেকক্ষণ গল্পও হয়েছিল। কয়েক দিনের ব্যবধানে তার মৃত্যুর খবর তাই পরিচিতজনদের জন্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে বিভা সেনগুপ্তের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। তবে সংগীতের জগতে থেকেও তিনি বরাবরই ছিলেন অনেকটা নিভৃতচারী। প্রচারের আলোয় থাকার চেয়ে গান শেখানো এবং সংগীতচর্চাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। জীবনের শেষ ১০ থেকে ১২ বছরে তার পরিচিতি কিছুটা বাড়লেও খ্যাতি বা প্রচার নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ ছিল না বলে জানিয়েছেন ঘনিষ্ঠজনেরা।
অলক রায়চৌধুরীর ভাষ্য, শেষ জীবনে মানুষ বিভা সেনগুপ্তকে বেশি করে চিনতে শুরু করলেও এসব নিয়ে তিনি খুব একটা মাথা ঘামাতেন না। বরং যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের গান শেখাতেন। রবীন্দ্রসংগীতের চর্চাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার এই শিক্ষকসুলভ ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তার সংগীতজীবনে গুরু দেবব্রত বিশ্বাসের প্রভাবও ছিল উল্লেখযোগ্য। দেবব্রত বিশ্বাসের জন্মদিন তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন। গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা এবং সংগীতের প্রতি একাগ্রতা তার দীর্ঘ পথচলায় বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে।
জন্মসূত্রে ত্রিপুরার বাসিন্দা ছিলেন বিভা সেনগুপ্ত। ১৯৫৯ সালে তিনি কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সংগীতের জগতে তার হাতেখড়ি হয় মায়া সেনের কাছে। পরে একটি সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গান শেখানোর কাজও করেন তিনি।
দীর্ঘ সময় ধরে রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা ও শিক্ষাদানের মাধ্যমে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন বিভা সেনগুপ্ত। তার সংগীতজীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে নীরবে, প্রচারের বাইরে থেকে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা এবং রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি নিষ্ঠা তাকে সংগীতপ্রেমীদের কাছে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়।
মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও সংবর্ধনা গ্রহণের সময় তাকে প্রাণবন্ত দেখা গিয়েছিল। সেই স্মৃতিই এখন তার সহকর্মী ও পরিচিতজনদের কাছে শেষদিকের উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
৯৪ বছরের জীবনে বিভা সেনগুপ্ত সংগীতকে শুধু নিজের শিল্পচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে এর ধারাবাহিকতাও ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তার চলে যাওয়ায় রবীন্দ্রসংগীতের পরিমণ্ডলে তৈরি হলো এক শূন্যতা। দীর্ঘ সংগীতসাধনা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি তার নিষ্ঠা শ্রোতা ও সংগীতসংশ্লিষ্ট মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে।














