সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই অক্টোবর ২০২২, ১:৯ পিএম

বাংলাদেশের বিনোদন সাংবাদিকতা আর অডিও ইন্ডাস্ট্রির মেলবন্ধনে যে কজন মানুষ নিজেদের একাধারে লেখক ও সুরস্রষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তানভীর তারেক তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কেবল একজন নামী সাংবাদিক বা টেলিভিশন সঞ্চালকই নন, একাধারে তুখোড় সুরকার, গীতিকার ও সঙ্গীতশিল্পী। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একদিকে যেমন বিনোদন সাংবাদিক হিসেবে তারকাদের সুখ-দুঃখের গল্প তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে সাউন্ড ডেস্কে বসে সৃষ্টি করেছেন মায়াবী সব সুর। আর তাঁর এই সুরেরই সর্বোচ্চ স্বীকৃতি মেলে যখন তিনি শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে লাভ করেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’।
Table of Contents

১৯৮০ সালের ৫ আগস্ট পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতে জন্মগ্রহণ করেন তানভীর তারেক। মফস্বল থেকে উঠে আসা এই তরুণের ভেতরে ছিল লেখার এক অদম্য শক্তি। সেই তাগিদ থেকেই আশির দশকের শেষে বা নব্বইয়ের শুরুতে তিনি ঢাকায় পাড়ি জমান এবং দেশের বিখ্যাত দৈনিক ‘ভোরের কাগজ’ পত্রিকায় বিনোদন সাংবাদিক হিসেবে তাঁর পেশাজীবন শুরু করেন।
পরবর্তীতে তিনি দৈনিক ইত্তেফাক, যুগান্তর, প্রথম আলো এবং আমার দেশ-এর মতো দেশের প্রথম সারির মূলধারার সব জাতীয় দৈনিকগুলোতে অত্যন্ত সুনামের সাথে সাংবাদিকতা করেছেন। তাঁর ক্ষুরধার লেখনী ও বিনোদন জগতের খবরাখবর প্রকাশের অভিনব ঢং তাঁকে শোবিজের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি ২০০৩ সাল থেকেই তানভীর তারেক পুরোদমে গান রচনা ও সুরারোজনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। সাংবাদিক তানভীরের আড়ালে যে এক চমৎকার সুরকার লুকিয়ে আছে, তা প্রথম বড় আকারে জানাজানি হয় ২০০৮ সালে। সে বছর তাঁর লেখা, সুর ও সঙ্গীতায়োজনে বাংলা ব্যান্ডের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু এবং ফাহমিদা নবী দ্বৈতভাবে কণ্ঠ দেন “তোমার জন্য ভালোবাসা” গানটিতে। গানটি সে সময় তুমুল শ্রোতাপ্রিয়তা লাভ করে।
ঠিক ১০ বছর পর, ২০১৮ সালে তৌসিফের এই জনপ্রিয় গানটির প্রতি শ্রোতাদের নস্টালজিয়া মাথায় রেখে তানভীর তারেক নিজে এবং নাজু আখন্দ গানটির কিছুটা পরিবর্তিত সুরে আবার কণ্ঠ দেন। আনজাম মাসুদের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘পরিবর্তন’-এর জন্য ‘সেলিব্রেটি সাউন্ডল্যাব’ স্টুডিওতে গানটি নতুন করে রেকর্ড করা হয়েছিল।
এরপর ২০১৩ সালে তাঁর সুর ও সঙ্গীতায়োজনে শামীমা জামানের লেখা “তোমাকে ভাবতে পারি বলে” গানটিতে কণ্ঠ দেন দিপু ও ঝিলিক, যা শ্রোতামহলে বেশ প্রশংসিত হয়। তাঁর সুরের আরেকটি মস্ত বড় আবেগি অধ্যায় হলো ২০২০ সালের মে মাস। কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীর প্রয়াণের পর, তাঁর গাওয়া প্রথম মরণোত্তর গান “দূরের মানুষ” তানভীর তারেকের সুরেই মুক্তি পায়। কবির বকুলের লেখা এই গানটি সুবীর নন্দীর ভক্তদের চোখ সজল করে দিয়েছিল।
তানভীর তারেকের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মাইলফলক আসে মাসুদ পথিক পরিচালিত ‘মায়া: দ্য লস্ট মাদার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এই সিনেমার “আমার মায়ের আঁচল” গানটির অসাধারণ সুর ও সঙ্গীতায়োজনের জন্য তিনি দেশজুড়ে বিপুল প্রশংসিত হন এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে শ্রেষ্ঠ সুরকারের মুকুটটি নিজের মাথায় তোলেন।
সুরকার হিসেবে নিজের জাত চেনানোর পর তিনি যুক্ত হন দেশবরেণ্য নির্মাতা ও অভিনেতা আফজাল হোসেনের বহুল আলোচিত সিনেমা ‘মানিকের লালকাঁকড়া’-র সাথে। এই চলচ্চিত্রের পুরো সঙ্গীত পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তানভীর তারেক তাঁর ভক্তদের এক মস্ত বড় চমক দেন। চলচ্চিত্রের গানে এবং দৃশ্যায়নে খোদ একজন মিউজিশিয়ানের চরিত্রেই রূপালী পর্দায় অভিনয় করেন তিনি।
শুধু পর্দার পেছনের মানুষ নন তানভীর তারেক। তাঁর চমৎকার বাচনভঙ্গি আর আড্ডার ছলের কারণে তিনি আরজে এবং টিভি প্রেজেন্টার হিসেবেও দারুণ সফল। এটিএন নিউজের মধ্যরাতের ভীষণ জনপ্রিয় লাইভ শো ‘ইয়াং নাইট লাভবক্স’ উপস্থাপনা করে তিনি রাতজাগা তরুণ দর্শকদের মাঝে এক মস্ত বড় ক্রেজ তৈরি করেছিলেন।
বহুমাত্রিক এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তানভীর তারেক তাঁর ঝুলিতে পুরেছেন বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার:

এক হাতে কলম আর অন্য হাতে গিটার নিয়ে তানভীর তারেক বাংলাদেশের শোবিজে নিজের এক সম্পূর্ণ রাজকীয় ও স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। সাংবাদিক ও মিউজিশিয়ান—এই দুই বিপরীত সত্তাকে যেভাবে তিনি পরম যত্নে বছরের পর বছর সামলেছেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। একজন মেধারী সুরকার হিসেবে আগামী দিনেও বাংলা সিনেমা ও অডিও ইন্ডাস্ট্রিকে তিনি আরও অনেক কালজয়ী সুর উপহার দেবেন, এটাই তাঁর কোটি শ্রোতার প্রত্যাশা।
মন্তব্য