সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই অক্টোবর ২০২২, ২:১৬ পিএম

বাংলা গানের চেনা খোলনলচে বদলে দিয়ে সত্তর দশকে কলকাতায় যে ব্যান্ডটি প্রথম বিপ্লব ঘটিয়েছিল, তার নাম ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রথাগত মেলোডির বাইরে গিয়ে জীবনমুখী জ্যাজ, ফোক আর রকের যে মেলবন্ধন তাঁরা ঘটিয়েছিলেন, তা ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। আর এই দূরদর্শী ও প্রভাবশালী আভা-গার্দ (Avant-garde) সঙ্গীতদলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিলেন তাপস দাস, যাঁকে সঙ্গীত দুনিয়া এবং তাঁর ভক্তরা পরম ভালোবাসায় ‘বাপি দাস’ বা ‘বাপিদা’ বলে ডাকতেন। ব্যান্ডের প্রথম দিককার সদস্য হওয়ায় এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মহীনের আদর্শকে বুকে আগলে রাখায় তাঁকে শ্রদ্ধাভরে ‘মহীনের আদি ঘোড়া’ সম্বোধন করা হয়ে থাকে।
Table of Contents

১৯৫৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর কলকাতার এক সাধারণ বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তাপস দাস। পিতা নারায়ণ চন্দ্র দাস এবং মা জ্যোৎস্না দাসের কোল আলো করে আসা চার ভাইয়ের মধ্যে বাপি ছিলেন চতুর্থ।
বাপির সঙ্গীত জীবনের পথচলাটা শুরু হয়েছিল একদম ছোটবেলা থেকেই, আর সুরের দুনিয়ায় তাঁর পছন্দের কোনো সীমানা ছিল না—যেকোনো ভালো সুরই তাঁকে টানত। তিনি সবসময় তাঁর মা জ্যোৎস্না দাসকেই তাঁর জীবনের প্রথম গুরু বা সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করতেন। মজার ব্যাপার হলো, গিটার বাজানোর জন্য বাপি কোনো প্রথাগত ওস্তাদের কাছে যাননি। কলেজ জীবনে গিয়ে নিজের চেষ্টায়, স্রেফ কান তৈরি করে এই ছয় তারের যন্ত্রটির সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন তিনি। এই স্ব-শিক্ষিত গিটারিস্টের আঙুলের ছোঁয়াই পরবর্তীতে বাংলা রকের অন্যতম সিগনেচার সাউন্ড হয়ে উঠেছিল।
১৯৭৪ সালের শেষের দিকে কলকাতার একঝাঁক ক্ষ্যাপাটে ও প্রতিভাবান তরুণকে সাথে নিয়ে কিংবদন্তি গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের (মনিদা) নেতৃত্বে একটি দল গঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে সেই দলে সদস্য ছিলেন সাত জন, তাই শুরুর দিকে ব্যান্ডটির নাম রাখা হয়েছিল ‘সপ্তর্ষি’।
পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে গৌতম চট্টোপাধ্যায়, প্রদীপ চ্যাটার্জি, রঞ্জন ঘোষাল, বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায়, এব্রাহাম মজুমদার এবং তপেশ বন্দোপাধ্যায়ের সাথে তাপস বাপি দাস কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তোলেন প্রথম বাংলা রক ব্যান্ড ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’। বাপিদা তাঁর গিটারের কর্ড আর ব্যাকস্টেজ মেন্টরিং দিয়ে ব্যান্ডের প্রতিটি সৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। সত্তরের দশকে চরম অবহেলা আর সমালোচনার শিকার হলেও, নব্বইয়ের দশকের পর এই সাত জন সদস্যের দলটি ব্যাপকভাবে ভারতীয় রক মিউজিকের কিংবদন্তি এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পথিকৃৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
মহীনের ঘোড়াগুলির মূল লাইন-আপ থেকে যে কটি ঐতিহাসিক অ্যালবাম প্রকাশ পেয়েছিল, তার প্রতিটিতেই বাপি দাসের অবদান ছিল অনস্বীকার্য:
গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর মহীনের মূল লাইন-আপের কার্যক্রম একপ্রকার থমকে গেলেও, বাপি দাস মহীনের সেই দ্রোহ আর দর্শনের আগুনকে নিভতে দেননি। নতুন প্রজন্মের স্বাধীন সঙ্গীতশিল্পীদের পথ দেখাতে এবং মহীনের গানগুলোকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখতে ২০১৫ সালে তিনি গঠন করেন একটি নতুন বাংলা ব্যান্ড—‘মহীন এখন ও বন্ধুরা’।
একই বছরের ৬ অক্টোবর লগ্নজিতা চক্রবর্তী, মালবিকা ব্রহ্মা এবং তিতাস ভ্রমর সেনের মতো নতুন প্রজন্মের শক্তিশালী গায়িকাদের সাথে নিয়ে তিনি প্রকাশ করেন ‘মহীন এখন ও বন্ধুরা’ নামের একটি বিশেষ ইপি (EP) অ্যালবাম। এই অ্যালবামে পাঁচটি গান স্থান পেয়েছিল, যা মূলত মহীনের ঘোড়াগুলির প্রতি এক অনন্য ডিজিটাল শ্রদ্ধাঞ্জলি। ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির সাথে লড়াই করার সময়েও এই বাপিদাকে দেখা গেছে গালভরা হাসি নিয়ে তরুণদের সাথে গিটার হাতে স্টেজে পারফর্ম করতে।

বাপি দাস কেবল একজন গিটারিস্ট বা গায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা স্বাধীন গানের একজন অভিভাবক। মহীনের বাকি ঘোড়ারা যখন একে একে আড়ালে চলে যাচ্ছিলেন বা পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিচ্ছিলেন, বাপিদা তখনো গিটার পিঠে করে এক শহর থেকে অন্য শহরে মহীনের গান ফেরি করে বেড়িয়েছেন। ২০২৩ সালের ২৫ জুন এই আদি ঘোড়া চিরতরে গালভরা হাসি আর গিটার ফেলে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু মহীনের সেই অবিনশ্বর দর্শন আর বাপিদার গিটারের ঝঙ্কার কোটি তরুণের গিটারের কর্ডে কর্ডে প্রতিধ্বনিত হবে আজীবন।
মন্তব্য