দুর্বিন শাহের গানে আজও বেঁচে আছে আত্মার চিরন্তন অনুসন্ধান

বাংলার লোকসংগীতের সমৃদ্ধ ভুবনে এমন কিছু সাধক ও গীতিকবি রয়েছেন, যাঁদের সৃষ্টি নিছক গান নয়, বরং মানুষের জীবন, আত্মা, প্রেম, বিরহ ও আধ্যাত্মিকতার গভীর দর্শন। তাঁদের গানের প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে মিশে থাকে মানবিক অনুভূতি, স্রষ্টার প্রতি নিবেদন এবং জীবনের অন্তর্নিহিত রহস্য অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা। তেমনই একজন অসামান্য মরমি গীতিকবি, বাউলসাধক ও বাংলা লোকসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার দুর্বিন শাহ।

তাঁর গান মানুষের অন্তর্জগতের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। কখনো স্রষ্টার প্রতি নিবেদিত আত্মার আকুতি, কখনো মানবপ্রেমের চিরন্তন বাণী, কখনো বিরহের হাহাকার, আবার কখনো জীবন ও মৃত্যুর রহস্য নিয়ে দার্শনিক ভাবনা উঠে এসেছে তাঁর সৃষ্টিতে। সহজ-সরল লোকজ ভাষার মধ্য দিয়ে গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি প্রকাশের অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে বাংলা মরমি সংগীতের ইতিহাসে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

দুর্বিন শাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালের ২ নভেম্বর (১৩২৭ বঙ্গাব্দের ১৫ কার্তিক), তৎকালীন সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ মহকুমার ছাতক থানার সুরমা নদীর উত্তর পারে নোয়ারাই গ্রামের তারামনি টিলায়। পরবর্তী সময়ে তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে সেই টিলা ‘দুর্বিন টিলা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

তাঁর পুরো নাম মাখদুমজাদা শাহ সৈয়দ কলিম আহমেদ দুর্বিন শাহ বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁর বাবা সফাত আলি শাহ ছিলেন একজন সুফি সাধক এবং মা হাসিনা বানু ছিলেন পিরানী। ফলে আধ্যাত্মিক সাধনা, সুফিবাদ ও ধর্মীয় ভাবধারার এক সমৃদ্ধ পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা। শৈশব থেকেই পারিবারিক সাধন-ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর চিন্তা, মনন ও সংগীতচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলে।

মাত্র সাত বছর বয়সে বাবাকে হারান দুর্বিন শাহ। শৈশবের এই ব্যক্তিগত শোক তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে পারিবারিক আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রভাব তাঁর চিন্তাজগতে অটুট ছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর গানে আত্মজিজ্ঞাসা, স্রষ্টার অনুসন্ধান ও জীবনদর্শনের যে গভীর প্রকাশ দেখা যায়, তার সঙ্গে এই পরিবেশের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

১৯৪৬ সালে তিনি সুরফা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

সাধনা ও সংগীতের বহুমাত্রিক জগৎ

দুর্বিন শাহের গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সুফিবাদ, মরমিবাদ ও আধ্যাত্মিক দর্শনের গভীর প্রকাশ। তবে তাঁর সৃষ্টির পরিধি কেবল সুফি কিংবা মরমি সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রেম-বিরহ, মানবিক সম্পর্ক, লোকজ সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুষঙ্গ এবং সমাজজীবনের নানা বিষয়ও তাঁর গানে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

বিষয় ও আঙ্গিকের বিচারে তাঁর রচনাসম্ভার ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। বাউল, বিচ্ছেদ, আঞ্চলিক, গণসংগীত, মালজোড়া, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, গোষ্ঠ, মিলন এবং রাধা-কৃষ্ণবিষয়ক পদাবলির মতো বিভিন্ন ধারায় তিনি গান রচনা করেছেন। পাশাপাশি হামদ-নাত, মারফতি, পির-মুর্শিদ স্মরণ, নবী ও ওলি স্মরণ, ভক্তিগীতি এবং মনঃশিক্ষামূলক গানও রয়েছে তাঁর সৃষ্টিতে।

তাঁর গানে সুফিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, কামতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, পারঘাটাতত্ত্ব ও দেশাত্মবোধক ভাবনারও প্রকাশ ঘটেছে। মানুষের দেহ, মন, আত্মা, জন্ম-মৃত্যু এবং পরম সত্তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিল তাঁর সংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তাঁর সৃষ্টির বিশেষত্ব হলো, সাধারণ মানুষের পরিচিত শব্দ, উপমা ও লোকজ চিত্রকল্প ব্যবহার করে জটিল দার্শনিক ভাবনা তুলে ধরা। তাঁর গানের ভাষা সহজবোধ্য হলেও অন্তর্নিহিত অর্থ অনেক গভীর। শ্রোতা প্রথমে সুর ও কথার আবেগে আকৃষ্ট হন, পরে গানের ভাবার্থ তাঁকে নিজের অস্তিত্ব, আত্মপরিচয় ও জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।

দুর্বিন শাহের বহুল পরিচিত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—

‘নির্জন যমুনার কূলে বসিয়া কদম্বতলে’

‘আমার অন্তরায় আমার কলিজায়’

‘বন্ধু যদি হইতো নদীর জল’

‘অচেনা এক জংলা পাখি থাকে মাটির পিঞ্জিরায়’

‘আমায় আমি চিনতে গেলে বাজে বড় গণ্ডগোল’

‘কি ঘর বানাইলারে মালিক ও মেস্তরি’

এসব গানের প্রতিটিতে রয়েছে স্বতন্ত্র অনুভূতি ও জীবনদর্শন। কোথাও প্রেমের আকুলতা, কোথাও বিচ্ছেদের বেদনা, আবার কোথাও নিজের অস্তিত্বকে জানার এক গভীর আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।

বিশেষ করে ‘অচেনা এক জংলা পাখি থাকে মাটির পিঞ্জিরায়’ গানের চিত্রকল্পে মরমি সংগীতের পরিচিত দার্শনিক ভাবনা ফুটে ওঠে। মাটির পিঞ্জিরায় বন্দি অচেনা পাখিকে মানুষের দেহের ভেতরে অবস্থান করা আত্মার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। এ ধরনের রূপকের মাধ্যমে তিনি দৃশ্যমান জগতের বাইরে গিয়ে মানুষের অন্তর্জগৎ ও আত্মিক পরিচয় নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছেন।

গ্রন্থ ও রচনাসম্ভার

দুর্বিন শাহের সংগীত ও সাহিত্যকর্ম সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁর ‘প্রেমসাগর পল্লীগীতি’ গ্রন্থমালা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. প্রেমসাগর পল্লীগীতি—প্রথম খণ্ড (১৯৫০)।

২. প্রেমসাগর পল্লীগীতি—দ্বিতীয় খণ্ড (১৯৫০)।

৩. প্রেমসাগর পল্লীগীতি—তৃতীয় খণ্ড (১৯৬৮)।

৪. প্রেমসাগর পল্লীগীতি—চতুর্থ খণ্ড (১৯৬৮)।

৫. পাক বঙ্গ ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ গীতি (১৯৭০)।

৬. প্রেমসাগর পল্লীগীতি—পঞ্চম খণ্ড (১৯৭৩)।

এসব প্রকাশনার মাধ্যমে তাঁর গান লিখিত আকারে সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলা লোকসংগীতের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। ফলে লিখিত সংকলন না থাকলে অনেক গান হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। দুর্বিন শাহের প্রকাশিত গ্রন্থগুলো তাঁর সৃষ্টিকে সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তাঁর রচনাসম্ভার সংকলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল লোকসাহিত্য গবেষক সুমনকুমার দাশের সম্পাদনায় ২০১০ সালে প্রকাশিত ‘দুর্বিন শাহ সমগ্র’। ২০১৪ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংস্করণে আরও কিছু অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত গান যুক্ত করা হয়। ওই সংস্করণে সংকলিত গানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫৫।

এই সংকলন তাঁর সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে গবেষণা, পাঠ ও মূল্যায়নের সুযোগ আরও বিস্তৃত করেছে। একই সঙ্গে বাংলা লোকসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ এই সম্পদ সংরক্ষণেও ভূমিকা রেখেছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি

দুর্বিন শাহের সংগীত প্রতিভা শুধু দেশের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাংলাদেশের বাইরে প্রবাসী বাঙালি ও সংগীতপ্রেমীদের কাছেও তাঁর গান সমাদৃত হয়েছিল।

১৯৬৭ সালে প্রবাসী বাঙালিদের আমন্ত্রণে তিনি ইংল্যান্ড সফর করেন। এই সফরে তাঁর অন্যতম সঙ্গী ছিলেন বাংলা লোকসংগীতের আরেক কিংবদন্তি বাউলসাধক শাহ আবদুল করিম।

ইংল্যান্ডে তাঁর গানের কথা, সুর, কণ্ঠের দরদ এবং মরমি দর্শনে মুগ্ধ হন প্রবাসী বাঙালি ও সংগীতপ্রেমীরা। তাঁর সংগীতের গভীরতা, আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং লোকজ জ্ঞানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘জ্ঞানের সাগর’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

এই উপাধি কেবল তাঁর পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি ছিল না; বরং সংগীত, লোকজ সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগেরও স্বীকৃতি বহন করে। বিদেশের মাটিতে তাঁর সংগীত পরিবেশনা বাংলা লোকজ ঐতিহ্যের পরিচিতি বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

মৃত্যু ও সংগীতের উত্তরাধিকার

বাংলার লোকসংগীতের এই প্রবাদপ্রতিম সাধক ১৯৭৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি (১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ৩ ফাল্গুন) নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ অনুযায়ী মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।

জীবনের পরিসর তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও বাংলা লোকসংগীতে তিনি রেখে গেছেন বিপুল ও বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিসম্ভার। তাঁর গান কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের চিরন্তন অনুভূতি, আত্মিক আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, বিরহ ও জীবনদর্শনকে ধারণ করায় বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে তাঁর সৃষ্টি আবেদন তৈরি করেছে।

দুর্বিন শাহ কেবল একজন বাউল কবি কিংবা মরমি গীতিকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলার লোকজ জীবন, সুফি দর্শন ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক অসাধারণ শিল্পী-ব্যাখ্যাতা। তাঁর গান মানুষকে নিজের ভেতরে ফিরে তাকাতে শেখায়, আত্মপরিচয়ের সন্ধান দেয় এবং প্রেম ও মানবতার কথা বলে।

বাংলার মরমি সংগীতের ঐতিহ্যে তাঁর অবস্থান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর সৃষ্টিতে একদিকে যেমন গ্রামীণ জীবনের পরিচিত অনুষঙ্গ রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে মানুষের অস্তিত্ব ও পরম সত্তাকে ঘিরে গভীর প্রশ্ন। এই দুইয়ের মেলবন্ধন তাঁর গানকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

সময় বদলায়, প্রজন্মের রুচি ও সংগীতের ধরন পাল্টায়। কিন্তু প্রকৃত সাধকের সৃষ্টি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। দুর্বিন শাহের গানও তেমনই এক অমূল্য সম্পদ, যা বাংলার লোকজ সংস্কৃতির শেকড়কে সমৃদ্ধ করেছে এবং সংগীতপ্রেমীদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।

মাটির পিঞ্জিরায় বন্দি অচেনা পাখির মতো মানুষের আত্মার যে চিরন্তন অনুসন্ধান, দুর্বিন শাহ তাঁর গানে সেই অনুসন্ধানকে দিয়েছেন অনন্য ভাষা, দর্শন ও সুর। তাঁর সংগীতের মধ্য দিয়ে মানুষ আজও খুঁজে ফেরে নিজের পরিচয়, জীবনের অর্থ এবং পরম সত্তার সন্ধান।

বাংলার মরমি সংগীতের এই অমর সাধকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণতি।

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।