বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গান নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান ‘সংস অব নজরুল’। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের বাইরে বাংলা সংগীতের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এই আয়োজনে মেতে ওঠেন উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা। শিল্পীদের পরিবেশনায় নজরুলের জনপ্রিয় গানগুলো নতুন করে প্রাণ পায়। প্রবাসেও যে নজরুলসংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ রয়েছে, দর্শকদের উপস্থিতি ও তাঁদের উচ্ছ্বাসে তার প্রতিফলন দেখা গেছে।
গত ২৪ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার সন্ধ্যায় সিডনির হার্স্টভিলি সিভিক সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় অনুষ্ঠানটি। সিডনি মিউজিক ক্লাব ও ক্যানবেরার জলসার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সংগীতসন্ধ্যায় বিপুলসংখ্যক দর্শক-শ্রোতার সমাগম ঘটে। নজরুলের গানকে কেন্দ্র করে এমন আয়োজন প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে সাংস্কৃতিক চর্চা ও সংগীতের প্রতি ভালোবাসা ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী নিজাম উদ্দিন উজ্জ্বল ও ডোমিনিক রবিন গুদা। তাঁদের কণ্ঠে একে একে পরিবেশিত হয় ‘অরুণকান্তি কে গো’, ‘পিয়া পিয়া পাপিয়া’, ‘বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে’ এবং ‘আমার কোন কূলে আজ’সহ নজরুলের বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গান। শিল্পীদের পরিবেশনায় গানের সুর, কথা ও আবেগের সমন্বয় শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁরা মনোযোগ দিয়ে পরিবেশনা উপভোগ করেন।
কাজী নজরুল ইসলামের সংগীত বাংলা সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর গানে প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, মানবিকতা ও জীবনবোধের নানা অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। ধ্রুপদি রাগসংগীতের প্রভাবের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সুরধারার সংমিশ্রণ তাঁর সংগীতকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। গজল, রাগপ্রধান গান, ভক্তিমূলক সংগীত ও প্রেমের গানের মতো বিভিন্ন ধারায় তাঁর সৃষ্টির বিস্তৃতি রয়েছে। এই বৈচিত্র্যের কারণেই নজরুলের গান দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বয়স ও রুচির শ্রোতাদের আকৃষ্ট করে আসছে।
সিডনির অনুষ্ঠানেও নজরুলের গানের সেই বৈচিত্র্যময় আবেদন ফুটে ওঠে। কণ্ঠশিল্পীদের পাশাপাশি যন্ত্রশিল্পীদের দক্ষ সংগত পরিবেশনাগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করে। বাঁশি, তবলা ও গিটারের সমন্বয়ে তৈরি হয় মনোরম সংগীতের আবহ। যন্ত্রসংগীতের সুনিপুণ ব্যবহার গানের সুর ও আবেগকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। পুরো আয়োজনেই শিল্পী ও যন্ত্রশিল্পীদের পারস্পরিক সমন্বয় ছিল উল্লেখযোগ্য।
অনুষ্ঠান শেষে দর্শক-শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়ায় উঠে আসে আয়োজনটির বিশেষ তাৎপর্য। উপস্থিত এক শ্রোতা বলেন, প্রবাসে নজরুলসংগীতের মতো ধ্রুপদি সংগীতধারাকে কেন্দ্র করে পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠান আয়োজন করা যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয়। কারণ, এ ধরনের আয়োজনের পেছনে সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা, শিল্পীদের সাধনা এবং আয়োজকদের আন্তরিকতা প্রয়োজন।
অন্য এক দর্শক শিল্পী নিজাম উদ্দিন উজ্জ্বল ও ডোমিনিক রবিন গুদার পরিবেশনার প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, শিল্পীদের নিষ্ঠা ও দীর্ঘদিনের সাধনার পাশাপাশি যন্ত্রশিল্পীদের নিবেদন সিডনিতে বাংলা সংস্কৃতির শিকড়কে আরও শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখছে।
প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা ধরে রাখতে সংগীতানুষ্ঠানের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মের অনেকেই জন্ম ও বেড়ে ওঠার কারণে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে দূরে থাকে। তাদের কাছে বাংলা গান, সাহিত্য ও ঐতিহ্যের পরিচয় তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় করার সুযোগও তৈরি হয়।
‘সংস অব নজরুল’ আয়োজনটি সেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টারই অংশ। সিডনির মঞ্চে নজরুলের কালজয়ী গান ঘিরে দর্শক-শ্রোতাদের আগ্রহ দেখিয়েছে, বাংলা সংগীতের আবেদন দেশের সীমানায় আটকে নেই। প্রবাসের নতুন পরিবেশেও নজরুলের সুর বাঙালির আবেগ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।















